ছোটদের কি চা–কফি পান করা উচিত
সকালবেলায় যখন রান্নাঘর থেকে চা বা কফির হালকা ঘ্রাণ আসে, মনে হয়, বড়দের দিনটা বুঝি এখান থেকেই শুরু। কেউ কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজ খোলেন। কেউবা সন্তানের স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দেন। তখন ছোটরাও হাত বাড়ায়—একটু চা, একটু কফি।
চা ও কফি নিষিদ্ধ পানীয় নয়। আবার শরীরের জন্য অতি প্রয়োজনীয়ও নয়। বাংলাদেশের ঘরে চা মানে আতিথেয়তা। অতিথি এলে চাভর্তি কাপ এগিয়ে দেওয়া রীতি। তাই ঘরের শিশু-কিশোরেরাও তাড়াতাড়ি এই অভ্যাসে ঢুকে পড়ে।
চা–কফিতে থাকে ক্যাফেইন। এটা গাছের পাতা আর বীজে প্রাকৃতিকভাবে থাকে। শরীরে ঢুকলে কিছুক্ষণ জেগে থাকার অনুভূতি হয়। ঘুম কাটিয়ে চোখ খোলে। কথা বলতে ইচ্ছা করে।
কিন্তু এটা কোনো খাবারের উপাদান নয়। ক্যালসিয়াম বা আয়রনের মতো শরীর এটা চায় না। বড়দের জন্যও একটা সীমা আছে। সুস্থ–সবল প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে দিনে ৪০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত সাধারণত সহনীয় ধরা হয়। ছোটদের শরীর হালকা। মস্তিষ্ক এখনো গড়ে উঠছে। তাই চা–কফির একই কাপ ছোটদের ওপর বেশি চাপ ফেলে।
কানাডার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বয়স অনুযায়ী একটা হিসাব দিয়েছে। চার থেকে ছয় বছরের শিশুদের দিনে ৪৫ মিলিগ্রামের বেশি ক্যাফেইন ‘না’। সাত থেকে নয় বছরে ৬২ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। আর বয়স ১০ থেকে ১২–এর মধ্যে হলে তা দিনে ৮৫ মিলিগ্রাম।
১৩ বছরের পরের হিসাবটা ওজনের সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রতি কেজিতে আড়াই মিলিগ্রামের কাছাকাছি। ৫০ কেজি ওজনের একজন কিশোরের জন্য দিনে মোটামুটি ১২৫ মিলিগ্রাম। মোটেও এর বেশি নয়।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের এই সীমা আরও কড়া। তাদের পরামর্শ, বাচ্চাদের ক্যাফেইন একেবারে না দেওয়া ভালো। ইউরোপের খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাও শিশু-কিশোরদের জন্য দিনে প্রতি কেজিতে ক্যাফেইন তিন মিলিগ্রামের নিচে রাখতে বলেছে।
এ সংখ্যা কাপের ভাষায় কেমন হয়? এক কাপ দুধ–চায়ে ক্যাফেইন থাকতে পারে ৩০ থেকে ৫০ মিলিগ্রাম। কালো চায়ে একটু বেশি। ছোট এক কাপ কফিতে ৮০ থেকে ১২০ মিলিগ্রাম। বড় মগে কিংবা কোল্ড কফিতে তার চেয়ে অনেক বেশি।
এনার্জি ড্রিংকের একেকটি ক্যানে ৮০ থেকে ২০০ মিলিগ্রামের বেশি থাকতে পারে। মানে এক বোতল এনার্জি ড্রিংক অনেক কিশোরের সারা দিনের সীমা এক চুমুকেই পেরিয়ে যায়। চকলেট, কোলা, এমনকি কিছু সর্দি-কাশির ওষুধেও ক্যাফেইন থাকে। সব মিলিয়ে হিসাব রাখতে হয়।
অতিরিক্ত পান করলে কী কী হয়, সেটা পরীক্ষার সপ্তাহে অনেকেই টের পায়। হাত কাঁপে, বুক ধড়ফড় করে, পেট খারাপ হয়, মেজাজ চড়া হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি ঘুমের। ক্যাফেইন শরীরে আট ঘণ্টার বেশি থাকতে পারে। বিকেলের এক কাপ চা রাতের ঘুম হালকা করে দেয়। ঘুম কম হলে পরের দিন ক্লাসে মন বসে না। খেলতে গেলে পা চলে না। মেজাজও বিগড়ে যায়।
তখন আবার চা পান করে জেগে থাকার চেষ্টা। এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন। পরীক্ষার আগের রাতে কফি পান করা মানে পরের দিনের জন্য মনকে ক্লান্ত করে তোলা।
চা পান করলে উচ্চতা বাড়ে না, এমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু এটা ঠিক যে আরামের ঘুম নষ্ট হলে বাড়ন্ত শরীরের কাজ আটকে যায়। হৃদ্রোগ আছে এমন শিশুর জন্য ক্যাফেইন একেবারেই উচিত না।
মজার চা, মিষ্টি কফি, বোতলজাত কোল্ড কফি—এগুলোতে চিনি থাকে প্রচুর। দাঁত, ওজন আর ডায়াবেটিসের ঝুঁকি আলাদা হিসাব। এনার্জি ড্রিংক কিশোরদের জন্য সুপারিশ করেন না শিশুবিশেষজ্ঞরা। খেলার মাঠে পানির বদলে এটা নেওয়ার অভ্যাস বিপজ্জনক। বিজ্ঞাপনে যতই শক্তি দেখাক, খেলাধুলার আগে-পরে সুপেয় পানি যথেষ্ট।
তাহলে কী করা যায়? ১২ বছরের নিচে চা ও কফি না দেওয়াই নিরাপদ। কিশোরেরা চাইলে সকালে ছোট এক কাপ দুধ–চা—এটুকু অনেক বাড়িতে চলে। বিকেলে বা রাতে নয়। কফি নিয়মিত অভ্যাস না করাই ভালো।
পুদিনা, লেবু, ক্যামোমাইলের মতো ভেষজ চায়ে সাধারণত ক্যাফেইন থাকে না; তবু লেবেল পড়ে নিতে হয়। তেষ্টা মেটাতে পানি, দুধ আর ডাবের পানি খুব উপাদেয়। ঘুম আসছে না বলে চা খাওয়া নয়—ঘুমের সময় ঠিক রাখাই আসল কৌশল।
মনে রাখা জরুরি, বড়দের চা–কফির কাপে হাত বাড়ানো মানে বড় হয়ে যাওয়া নয়। ঘুম, পড়া আর খেলা—এ তিনটা জিনিস ঠিক থাকলে সকালের চায়ের গন্ধ শুধু গন্ধ হয়েই থাকুক, ক্ষতি নেই।
এআইয়ের সহায়তা নেওয়া হয়েছে