রাতে বা ছুটির দিনে অফিশিয়াল ই–মেইল পাঠানো কি অভদ্রতা
রাত বাজে ১১টা। তুমি হয়তো আরাম করে বিছানায় শুয়ে তোমার প্রিয় কমিক বইটা পড়ছ কিংবা হাতে মুঠোফোন নিয়ে শুয়ে শুয়ে রিলস দেখছ। হঠাৎ তোমার ফোনটা বেজে উঠল! তুমি ভাবলে, নিশ্চয়ই কোনো বন্ধু মজার মিম পাঠিয়েছে। কিন্তু ফোন হাতে নিয়ে দেখলে, সেটা তোমার ক্লাসের ক্যাপ্টেনের মেসেজ, ‘কালকের প্রজেক্টের ওই কাজ কি শেষ করেছ?’
বলো তো, ওই মুহূর্তে তোমার কেমন লাগবে? নিশ্চয়ই মনে হবে, ‘আরে ভাই, এখন তো আমার ঘুমানোর সময়! এই অসময়ে এসব কী?’ ঠিক এভাবেই বড়দের দুনিয়ায়ও ছুটির দিনে বা অনেক রাতে কাজের ই–মেইল বা মেসেজ পাঠানো নিয়ে একটা বিশাল বিতর্ক আছে। কেউ ভাবে, এটা একদম ঠিক আছে। আবার কেউ ভাবে, এটা রীতিমতো অপরাধ! চলো, একটু খতিয়ে দেখা যাক বিষয়টা।
বড়দের অফিসে অনেক মানুষই আছেন, যাঁরা রাতে বা ছুটির দিনে ই–মেইল পাঠাতে খুব ভালোবাসেন। তাঁদের যুক্তিটা বেশ মজার। তাঁরা বলেন, ‘ই–মেইল তো আর ফোনকল নয় যে সঙ্গে সঙ্গেই ধরতে হবে। আমি আমার সুবিধামতো সময়ে পাঠিয়ে রাখলাম, তুমি তোমার সুবিধামতো সময়ে দেখে নিয়ো।’ এই যুক্তিটাকে বলা যায়, অ্যাসিঙ্ক অ্যালিবাই। বাংলায় বলা যায়, অসময়ের অজুহাত।
মাইক্রোসফটের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক মানুষ রাত ১০টার পর বা সকাল ছয়টার দিকে ই–মেইল চেক করেন। যাঁরা নিজেদের মতো করে কাজ করতে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য হয়তো রাত বেশ শান্ত ও প্রোডাক্টিভ একটা সময়। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য জায়গায়।
যিনি রাতে ই–মেইল পাঠালেন, তিনি হয়তো শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়লেন। কিন্তু যাঁর কাছে ই–মেইল গেল, তাঁর তো ঘুম হারাম! গবেষকেরা বলছেন, মানুষ যখন অসময়ে কাজের ই–মেইল পায়, তখন তারা মনে মনে ভাবে, ‘নিশ্চয়ই আমাকে এখনই এটার উত্তর দিতে হবে!’ এটাকে বলা হয়, ই–মেইল আর্জেন্সি বায়াস।
এমনকি কোনো ই–মেইল না এলেও ‘এই বুঝি একটা ই–মেইল এল’, এমন একটা চিন্তাও মানুষকে মানসিক শান্তিতে থাকতে দেয় না। একে বলা হয়, অ্যান্টিসিপেটরি স্ট্রেস। ধরো, তোমার স্কুল বন্ধ, কিন্তু তুমি সারাক্ষণ ভাবছ, ‘এই বুঝি স্যার ফোন দিয়ে কোনো হোমওয়ার্ক দিয়ে দিলেন!’
তাহলে কি রাতে ই–মেইল পাঠানো একদমই উচিত নয়
এই প্রশ্নের উত্তর অনেকগুলো বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তুমি কে, কাকে ই–মেইল পাঠাচ্ছ ও কী লিখছ, তার ওপর নির্ভর করে রাতে ই–মেইল পাঠাবে কি না।
তুমি যদি ক্লাসের সাধারণ একজন ছাত্র হয়ে আরেকজন বন্ধুকে রাতে মেসেজ দাও, তবে হয়তো সে তেমন কিছু মনে করবে না। কিন্তু তোমার টিচার যদি রাতে মেসেজ দেন, তবে কিন্তু সবাই ভয় পেয়ে যাবে! ঠিক তেমনি অফিসের বসরা যখন রাতে ই–মেইল করেন, তখন সেটা সাধারণ ই–মেইল থাকে না, সেটা একটা অলিখিত নিয়ম বা চাপ হয়ে দাঁড়ায়।
রাতে শুধু একটা সাধারণ প্রশ্ন করা যেতেই পারে। কিন্তু কাউকে কোনো কাজ করতে বলা বা বকা দেওয়া একদমই ঠিক নয়। আর মেসেজে যদি লেখা থাকে, ‘কাল সকালে তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।’ তাহলে তো প্রাপকের ওই রাতের ঘুমই হারাম হয়ে যাবে!
তবে যদি সত্যিই এমন কোনো বিপদ হয় যে এখনই কাউকে দরকার, তবে ই–মেইল না করে সরাসরি ফোন করাই ভালো।
কীভাবে এই সমস্যার সমাধান করা যায়
এটা একটা জাদুর বোতামের মতো! তুমি রাতে ই–মেইল লিখে এই বোতাম চেপে সময় ঠিক করে দিতে পারো। ই–মেইলটা ঠিক পরের দিন সকালে অর্থাৎ অফিসে যাওয়ার সময়ে গিয়ে প্রাপকের কাছে পৌঁছাবে। আর যদি সত্যিই রাতে ই–মেইল পাঠাতেই হয়, তবে শেষে শুধু একটা লাইন লিখে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। লাইনটা হলো, ‘অমুক দিনের আগে বা সকালের আগে উত্তর দেওয়ার দরকার নেই।’ এতে প্রাপক শান্তিতে ঘুমাতে পারবেন। আবার তুমি নিজেও কিন্তু ঠিক করে নিতে পারো যে রাত আটটার পর তুমি আর কোনো মেসেজ বা ই–মেইল চেক করবে না। অস্ট্রেলিয়ার মতো কিছু দেশে তো আইনই আছে যে, কাজের সময়ের বাইরে তুমি চাইলে অফিসের মেসেজ বা ই–মেইল এড়িয়ে চলতে পারো!
কাজেই রাতে ই–মেইল পাঠানো মোটেও অনেক বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং একটু অসতর্ক হলেই অন্যজনের ঘুমের বারোটা বেজে যেতে পারে! তাই অসময়ে কাউকে মেসেজ বা ই–মেইল পাঠানোর আগে একটু ভেবে দেখো, তোমার এই ছোট্ট মেসেজ অন্য কারও জন্য বিপদ হয়ে যাচ্ছে না তো!
সূত্র: রিডার্স ডাইজেস্ট