কখনো নিজের ওপর আস্থা হারাবে না

প্রিয় মনোবন্ধু,

আমি ছোটবেলায় অনেক বুদ্ধিমান ছিলাম, চঞ্চলও। যেমন সমঝদার, তেমন দুরন্ত ছিলাম আমি। কিন্তু আমার শৈশব সোনালি হয়ে উঠতে পারেনি। একটি রাত তাতে বাধা দিয়েছিল, যে রাতে আমার মা–বাবার মধ্যে ভাঙন তীব্র হয়ে উঠেছিল। হ্যাঁ, সে রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি আর সেই ঘুম এখনো ধরে না। বুঝতে সময় লাগেনি যে আমার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেছে। তবু আমার মা চেয়েছিল ব্যাপারটি যেন তার দুই ছেলে না বোঝে যদিও তার ছোট ছেলে সবই বুঝত। তাই তো আর্থিক চাপ দেখা দেবে বলে যেনতেনভাবে বড় হয়েছি। বোন ছিল না, বোনের আশা তো ছিলই, তবে তা আরও ভঙ্গ হয়েছে, যখন জানতে পারি ‘আরেক ঘরে না তোর বাপের মেয়ে আছে’। বুঝতাম, আমার মায়ের মতো একজন প্রাইমারি শিক্ষকের পক্ষে সব সামলানো অসম্ভব আর দু্ই বছর আগে তো আমার মায়ের ক্যানসারের মতো কঠিন রোগ ধরা পড়েছে। এই বছর দশম শ্রেণিতে উঠেছি। যতই দিন যাচ্ছে, ততই চাপ প্রখর হয়ে উঠছে। এত কিছু আর সহ্য হচ্ছে না। জানি না কীভাবে এখনো টিকে আছি। সবই তো চোখের সামনে হচ্ছে। মা–বাবার মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়নি। তবে বাবার সঙ্গ হাতছাড়া করার পর্যায়ে। বাবার পরিচয় দিতে পারব না দেখে আমার মা-ও সহ্য করছে। কিশোর আলোর মনোবন্ধু পাতা দেখে বুঝতে সমস্যা হয় না যে আমার আর আমার মায়ের কতটুক মানসিক সমস্যা হচ্ছে। IAD (Internet Addiction Disorder) থেকে মুক্তি পাওয়ার পর স্মার্টফোন, কম্পিউটার—এসব ভালো লাগে না। ‘আনন্দ’কে সংজ্ঞায়িত করার সামর্থ্য নেই। পরিবারের বয়স্কদের সঙ্গে বেড়ে ওঠায় ধার্মিক কিছু কিছু নিয়মকানুন মানি। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রেখেই কখনো আত্মহুতির চেষ্টা থেকে ফিরে এসেছি। অনেক কিছুই লিখিনি। জীবনের ১৪ বছরের সময়কে তো আর দেড় পৃষ্ঠায় মোড়ানো সম্ভব নয়। দেশকে ভালোবাসি, দেশের জন্য কিছু করার ইচ্ছা আছে। আবার গণিতেও ভালো বলেই হয়তো গণিত অলিম্পিয়াডে জাতীয় পর্যায়ে এসেছি। নিজেকে খুব ভালোভাবে চিনি। কীভাবে সুস্থ হতে পারি? ধন্যবাদ।

(লেখাটি ছাপানোর অনুরোধ রইল। আামি না পারলেও আমার মতো শিকাররা হয়তো দেখতে পারবে। আবারও ধন্যবাদ)  

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, রংপুর

উত্তর: তুমি যে একটি তীব্র মানসিক চাপ আর উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে যাচ্ছ, তা আমরা বুঝতে পারছি। আশপাশে ঘটে যাওয়া অনেক কিছু তোমার মনের মধ্যে প্রভাব ফেলছে। তারপরও তোমাকে অভিনন্দন যে তুমি গণিত অলিম্পিয়াডের জাতীয় পর্যায়ে উন্নীত হয়েছ! এতে প্রমাণ করে যে তোমার মধ্যে অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মেধা রয়েছে। পারিপার্শ্বিক নেতিবাচক ঘটনা যেন তোমার সেই অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মেধাকে ম্লান করতে না পারে। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছ, তোমার সক্ষমতা অনেক। প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে এই সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে তুমি যখন একজন সফল ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, তখন তোমার এই নেতিবাচক ঘটনাগুলো ম্লান হবেই। তোমাকে নিজের জীবনের লক্ষ্য স্থির করতে হবে, দেশের জন্য কিছু করার জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। মনে রাখবে, আত্মহনন কোনো সমাধান নয়, মহৎ তো নয়ই। তাই তোমার প্রথম কাজ হবে নিজের ক্যারিয়ার তৈরি করা, মন দিয়ে পড়ালেখা করা। আর প্রতিকূলতা মানুষের সক্ষমতাকে বাড়িয়ে তোলে। তাই প্রতিকূলতাকে আশীর্বাদ মনে করে নিজেকে গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হও। মায়ের পাশে থাকো। প্রয়োজনে রংপুর মেডিকেল কলেজের মানসিক রোগ বিভাগে সাক্ষাৎ করে প্রযোজনীয় পরামর্শ নিতে পারো।

যখনই মন খারাপ করবে তখন বেশি করে বই পড়বে, গান শুনবে। পৃথিবীর সফল মানুষের জীবনী পড়বে। দেখবে শত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করেই তাঁরা জগদ্বিখ্যাত হয়েছিলেন। কখনো নিজের ওপর আস্থা হারাবে না।