স্কুলের দিনগুলি

নাম প্রেজেন্ট খাতা

‘রোল নম্বর সেভেনটি ওয়ান’

‘ইয়েস স্যার।’

‘সেভেনটি টু।’

‘ইয়েস স্যার।’

‘আজকের মতো নাম প্রেজেন্ট করা শেষ হলো।’ সবার পরিচিত ও প্রিয় খাতা এটি। আর যা-ই হোক, সবার প্রত্যাশা থাকে স্কুলে এসে এই খাতায় নামটা প্রেজেন্ট করা। একবার নাম প্রেজেন্ট হয়ে গেলে আর কী লাগে! এবার শহীদ মিনারের পাশের দেয়ালের ওপর দিয়ে কিংবা মন্দিরের দেয়ালের নিচ দিয়ে স্কুল পালালেও পরের দিন শাস্তি নেই! খাতায় নাম প্রেজেন্ট আছে তো! সবার পরিচিত এই খাতায় হয়তো আর নাম প্রেজেন্ট করা হবে না। হয়তো এর স্থান হবে আলমারির ধুলোবালি জমা কোনো এক কোনায়। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করতে আরও অনেক বছর লেগে যাবে। কিন্তু তত দিনে আমরা আর এই ‘আমরা’ থাকব না। কিন্তু ‘প্রকৃত আমরা’, এই খাতায় আজন্ম বন্দী ছিলাম, আছি, থাকব। সেই খাতা, যার ওপর ধুলো জমে আছে, আমরা আজও হেসে বেড়াই, খেলে বেড়াই সোনালি অতীতে, সেই ‘ছোট্ট আমরা’ হয়ে। আমরা কি কেউ খোঁজ রাখি সেই খাতাটার? কেউ না, কেউ না।

এসব কথা মনে হচ্ছিল। যখন স্কুলজীবনের সর্বশেষ ক্লাস করছিলাম। কোনো দিন আমাদের ক্লাসে ৬০ জনের বেশি ছাত্রছাত্রী আসেনি। কী আশ্চর্য! এই দিন ৭২ জনের ৭২ জনই এসেছিল ক্লাসে।

আকিব আল আসাদ

একাদশ শ্রেণি, ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ, পার্বতীপুর।

আমি আর আমরা

স্কুলজীবনে সবারই কিছু না কিছু সুন্দর মুহূর্ত থাকে। বিশেষ করে ক্লাস ওয়ান, টু, থ্রির স্মৃতি। কিন্তু  এত ছোট ক্লাসের সুন্দর কোনো মুহূর্ত নেই আমার।  সবাই যখন ক্লাসে কথা বলা বা দুষ্টামিতে ব্যস্ত, আমি তখন হয়তো কোনো একটা বই খুলে পড়তাম বা গালে হাত দিয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতাম জানালা দিয়ে। পাশের আমগাছে কাকের বাসার কাকের বাচ্চাগুলো দেখতাম। ক্লাস থ্রি পর্যন্ত সিদ্ধেশ্বরী উচ্চবালিকা বিদ্যালয়ে পড়েছি আমি। বাসা থেকে স্কুল অনেক দূরে ছিল। ভ্যানে যাওয়া-আসা করতাম। ভ্যানে বসেও কোনো কথা বলতাম না। হয় বই পড়তাম, না হয় গালে হাত দিয়ে রাস্তার মানুষগুলোকে দেখতাম। ক্লাস ফোরে ওঠার পর আমাকে শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিল আম্মু। স্কুলটি খুব সুন্দর। এখানে এসে একটি মেয়ের সঙ্গে প্রথম বন্ধুত্ব হলো। ও ছিল আমার জীবনের প্রথম বন্ধু। ওর নাম তানহা। তানহার সঙ্গে বন্ধুত্ব হওয়ায় আমি কিছুটা দুষ্টুমি শুরু করি। কিন্তু ক্লাস সিক্সে ও শেরেবাংলা স্কুল ছেড়ে দিয়ে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়। খুব মন খারাপ হয়। কয়েক দিন একা একাই ছিলাম। কী করব, কী বলব কিছুই বুঝতাম না। এই সময় আমাকে সবচেয়ে সময় দিত সুপ্রীতি আর তিশা। কিন্তু আমার ভাগ্য! সুপ্রীতিও ক্লাস সেভেনে অন্য স্কুলে ভর্তি হয়। কিন্তু এরপর শুরু হয় আসল মজা। আমাদের ছয়জনের একটা দল তৈরি হয়। আমি, তিশা, সুহানা, সারা, রাফা, রুহিতা। এই ছয়জন মিলে ক্লাস এইট পর্যন্ত প্রচুর মজা করেছি। আমাদের টিচাররা আমাদের ওপর মহা বিরক্ত ছিলেন। কারণ, আমাদের পড়াশোনা বাদে বাকি সবকিছুতে আগ্রহ একটু বেশিই ছিল। কিন্তু ক্লাস নাইনে ওঠার পর রাফা ও রুহিনা বিজ্ঞান বিভাগে চলে গেল আর আমি, তিশা, সুহানা সারা চারজন চলে গেলাম ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে। আমরা চারজন ছিলাম ক্লাসে সবার মধ্যমণি। আমাদের সবাই খুব ভালোবাসত। কিন্তু টিচাররা সব সময় ক্লাসের সময় চারজনে চারটি বেঞ্চে বসাতেন। এটি ছিল খুবই দুঃখজনক। ক্লাস নাইন-টেন এভাবেই খুব মজা করে কাটালাম। এখন আমরা এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছি। এখন ওই দিনগুলোর কথা ভাবলে খুব অবাক লাগে। আর কখনো ওইভাবে মজা করা হবে না। আমরা সবাই হয়তো আবার একত্র হব। কোথাও দেখা করব, সবাই সবার বাসায় বেড়াতে যাব। কিন্তু স্কুলের মতো মজা আর কখনো করা হবে না। কারণ, স্কুলজীবনটা শেষ। এটা ফিরবে না। এখন শুধু এগুলো চিন্তা করব, আর ভাবব কত পাগল ছিলাম আমরা। আমার স্কুলজীবনের শুরুটা খুব বেশি সুন্দর না হলেও শেষটা হয়েছে খুবই সুন্দরভাবে। শেষের দুই বছর এত সুন্দর ছিল যে সেটা কোনোভাবেই বোঝানো সম্ভব নয়। যখন থুত্থুরে বুড়ো হয়ে যাব, তখন এই মুহূর্তগুলো মনে করেই আমরা হাসব। আমরা সবাই জানি যে জীবন সুন্দর। কিন্তু স্কুলজীবন সবচেয়ে সুন্দর। এটাই আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি।

সিরাজুম মুনিরা

এসএসসি পরীক্ষার্থী, শেরেবাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়, ঢাকা