আপেক্ষিকতার মজার জগৎ

গতি কি আপেক্ষিক? একটু ভেবে তুমি হয়তো বলবে, ‘অবশ্যই আপেক্ষিক!’

ধরো, একটা ট্রেন ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে উত্তর দিকে ছুটছে। সেই ট্রেনের ভেতরে এক লোক ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার বেগে দক্ষিণ দিকে হাঁটছে। এখন প্রশ্ন হলো, লোকটি আসলে কোন দিকে এবং কত বেগে হাঁটছে? একটু ভাবলেই বুঝবে, কোনো প্রসঙ্গ কাঠামো ছাড়া এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া অসম্ভব। ট্রেনের সাপেক্ষে লোকটি ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার বেগে দক্ষিণ দিকে হাঁটছে। কিন্তু মাটির সাপেক্ষে সে ঘণ্টায় ১০০ - ৪ = ৯৬ কিলোমিটার বেগে উত্তর দিকে এগোচ্ছে।

তাহলে কি আমরা বলতে পারি, লোকটির মাটির সাপেক্ষে বেগ ঘণ্টায় ৯৬ কিলোমিটার? এই বেগই কি তার আসল বা পরম বেগ? না! কারণ, এর চেয়েও বড় অনেক প্রসঙ্গ কাঠামো আছে। পৃথিবী নিজেও ঘুরছে। পৃথিবীর ঘোরাটা অনেকটা লাটিমের মতো। খেয়াল করলে দেখবে, লাটিম নিজে তো ঘোরেই, আবার একটা বৃত্তের মতো ঘোরে। পৃথিবীও তেমনি নিজের অক্ষে ঘুরছে, আবার সূর্যের চারদিকেও চক্কর দিচ্ছে। সূর্য তার গ্রহদের নিয়ে গ্যালাক্সির ভেতর দিয়ে ছুটছে। আবার আমাদের গ্যালাক্সি অন্য গ্যালাক্সিদের সাপেক্ষে ঘুরছে এবং ছুটছে। গ্যালাক্সিগুলো মিলে তৈরি করেছে গ্যালাক্টিক ক্লাস্টার। সেগুলোও আবার একে অপরের সাপেক্ষে ছুটছে। এই গতির চেইন আসলে কত দূর পর্যন্ত বিস্তৃত, তা কেউ জানে না। কোনো কিছুর পরম গতি মাপার কোনো দৃশ্যমান উপায় নেই। অর্থাৎ এমন কোনো স্থির বা চূড়ান্ত প্রসঙ্গ কাঠামো নেই, যার সাপেক্ষে সব গতি মাপা যায়। বড়-ছোট, ধীর-দ্রুত, ওপর-নিচ কিংবা ডান-বাঁয়ের মতোই গতি এবং স্থিতিও মনে হয় পুরোপুরি আপেক্ষিক। অন্য কোনো বস্তুর গতির সঙ্গে তুলনা না করে কোনো বস্তুর গতি মাপার কোনো উপায় নেই।

আসলে বিষয়টা এত সহজ নয়! গতির আপেক্ষিকতা নিয়ে যদি এতটুকুই বলার থাকত, তবে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব তৈরি করার কোনো দরকারই হতো না। পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে তো এই তত্ত্ব আগে থেকেই থাকত!

বিষয়টি সহজ না হওয়ার কারণ, পরম গতি মাপার খুব সহজ দুটি উপায় আছে বলে মনে হয়। প্রথম উপায়টিতে আলোর বেগ ব্যবহার করা হয়। দ্বিতীয়টিতে কোনো চলন্ত বস্তু যখন বেগ বদলায়, তখন তৈরি হওয়া নানা ধরনের জড়তা ব্যবহার করা হয়। আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব প্রথমটি নিয়ে কাজ করে এবং সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্ব কাজ করে দ্বিতীয়টি নিয়ে। তবে বিস্তারিত বিষয়ে এখানে আলোচনা করব না, পরে পরম গতি মাপার প্রথম পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা যাবে।

উনিশ শতকে, অর্থাৎ আইনস্টাইনেরও আগে, পদার্থবিজ্ঞানীরা মনে করতেন—মহাকাশে ইথার নামে একধরনের স্থির ও অদৃশ্য পদার্থ আছে। একে বলা হতো লুমিনিফেরাস ইথার। অর্থাৎ এটি আলোর তরঙ্গ বহন করে। সহজভাবে বললে, আলো যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যায়, তা এই ইথারে ভর করেই। আগে বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, পুরো মহাবিশ্বজুড়েই হয়তো ইথার ছড়িয়ে আছে। সব বস্তুর ভেতর দিয়ে এই ইথার অনায়াসে ঢুকে যেতে পারে। একটি কাচের বয়াম থেকে যদি সব বাতাস বের করে নেওয়া হয়, তবু সেটি ইথার দিয়ে ভরা থাকবে। তা না হলে আলো কীভাবে শূন্যস্থানের ভেতর দিয়ে চলাচল করে? আলো তো একটা তরঙ্গ; এই তরঙ্গ বহন করার জন্য তো কিছু একটা থাকতে হবে!

আরও পড়ুন

বিজ্ঞানীরা ভাবতেন, ইথার নিজে হয়তো কাঁপে, কিন্তু অন্য বস্তুর সাপেক্ষে এটি খুব কমই কাঁপে, অথবা কাঁপেই না। বরং ইথারের সাপেক্ষে অন্য সব বস্তুই চলাচল করে। তখনকার বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত ছিলেন, কোনো নক্ষত্র, গ্রহ বা যেকোনো বস্তুর পরম গতি মানে স্থির, অদৃশ্য ইথারের সাপেক্ষে এর গতি।

কিন্তু তুমি হয়তো ভাবছ, ইথার যদি অদৃশ্য এবং এমন এক পদার্থ হয় যাকে দেখা যায় না, শোনা যায় না, ছোঁয়া যায় না, গন্ধ বা স্বাদও নেই; তবে এর সাপেক্ষে পৃথিবীর মতো কোনো কিছুর গতি মাপা হবে কীভাবে? এর উত্তর খুব সহজ। পৃথিবীর গতি ও আলোর গতি তুলনা করে এই মাপজোখ করা যেতে পারে।

এটা বোঝার জন্য আগে আলোর ধরনটা একটু বুঝতে হবে। আলো হলো ইলেকট্রোম্যাগনেটিক বা তড়িৎ–চৌম্বকীয় বিকিরণের বিশাল বর্ণালির খুব ছোট্ট একটা অংশ, যা আমরা দেখতে পাই। এই বর্ণালির মধ্যে আরও আছে রেডিও তরঙ্গ, রাডার তরঙ্গ, অবলোহিত আলো, অতিবেগুনি আলো ও গামা রশ্মি।

এ লেখায় আলো নিয়ে যা যা বলা হবে, তা যেকোনো ধরনের তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গের জন্যই সমানভাবে সত্যি। শুধু তড়িৎ–চৌম্বকীয় তরঙ্গ বলার চেয়ে ‘আলো’ বলা সহজ। তাই একে আমরা এখন থেকে আলোই বলব।

আলো একধরনের তরঙ্গ। পানি ছাড়া পানির তরঙ্গের কথা ভাবা যেমন বোকামি, তখনকার বিজ্ঞানীদের কাছে ইথার ছাড়া আলোর তরঙ্গের কথা ভাবাও তেমনি বোকামি মনে হতো।

একটি চলন্ত জেট প্লেনের সামনে থেকে যদি একটি গুলি ছোড়া হয়, তবে মাটির সাপেক্ষে সেই গুলির বেগ, মাটিতে দাঁড়িয়ে ছোড়া গুলির বেগের চেয়ে বেশি হবে। প্লেন থেকে ছোড়া গুলির বেগ বের করতে হলে প্লেনের বেগের সঙ্গে গুলির বেগ যোগ করতে হবে। কিন্তু আলোর বেলায় ব্যাপারটা অন্য রকম। যে বস্তু থেকে আলো বের হচ্ছে, তার গতির ওপর আলোর গতি নির্ভর করে না। উনিশ শতকের শেষের দিকে এবং বিশ শতকের শুরুর দিকের পরীক্ষাগুলো থেকে এর জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। পরে নিউট্রাল পাই মেসনের ভাঙন৯ নিয়ে করা পরীক্ষাও এটি প্রমাণ করেছে।

আরও পড়ুন

১৯৫৫ সালে রুশ জ্যোতির্বিদেরা ঘুরন্ত সূর্যের দুই প্রান্ত থেকে আসা আলো নিয়ে একটি পরীক্ষা করেছিলেন। সূর্যের এক প্রান্ত সব সময় আমাদের দিকে আসছে, অন্য প্রান্ত দূরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু দেখা গেল, দুই প্রান্ত থেকেই আলো পৃথিবীতে একই বেগে পৌঁছায়। এর আগে একে অপরের চারদিকে ঘুরতে থাকা জোড়া নক্ষত্র থেকে আসা আলো নিয়েও একই ধরনের পরীক্ষা করা হয়েছিল। উৎস যেভাবেই ছুটুক না কেন, শূন্যস্থানে আলোর বেগ সব সময় একই থাকে—সেকেন্ডে প্রায় ২ লাখ ৯৯ হাজার ৮০০ কিলোমিটার বা ১ লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ মাইল। এটাকেই সহজে বুঝতে আমরা সেকেন্ডে আলোর বেগ ৩ লাখ কিলোমিটার বলি।

বুঝতে পারছ, এই ব্যাপারটা ব্যবহার করে একজন বিজ্ঞানী (আমরা তাঁকে পর্যবেক্ষক বলব) কীভাবে নিজের পরম গতি মাপতে পারেন? আলো যদি একটি স্থির ইথারের ভেতর দিয়ে একটি নির্দিষ্ট বেগে চলে (c বেগে) এবং এই বেগ যদি উৎসের গতির ওপর নির্ভর না করে, তবে পর্যবেক্ষক তাঁর পরম গতি মাপার জন্য আলোর বেগকে একটা মাপকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন।

যে পর্যবেক্ষক আলোর সঙ্গে একই দিকে ছুটছেন, তাঁর কাছে মনে হওয়া উচিত, আলো c-এর চেয়ে কম বেগে তাঁকে পেরিয়ে যাচ্ছে। আবার যে পর্যবেক্ষক আলোর উল্টো দিকে, অর্থাৎ আলোর দিকে ছুটছেন, তাঁর কাছে মনে হওয়া উচিত আলো c-এর চেয়ে বেশি বেগে তাঁর দিকে ধেয়ে আসছে। সহজ কথায়, আলোর সাপেক্ষে পর্যবেক্ষক কীভাবে চলছেন, তার ওপর নির্ভর করে আলোর বেগ আলাদা হওয়ার কথা। এই পার্থক্যই ইথারের ভেতর দিয়ে ওই পর্যবেক্ষকের আসল বা পরম গতি বুঝিয়ে দেবে।

পদার্থবিজ্ঞানীরা প্রায়ই এই ব্যাপারকে ইথার উইন্ড বলে ডাকেন। বাংলায় একে আমরা ইথার বায়ু বলতে পারি। এটা বুঝতে হলে আবার সেই চলন্ত ট্রেনের কথা ভাবতে হবে। আমরা দেখেছি, একজন মানুষ ট্রেনের ভেতর দিয়ে ইঞ্জিনের দিকে হাঁটুক বা পেছনের দিকে, ট্রেনের সাপেক্ষে তার হাঁটার বেগ সব সময় একই থাকে (ঘণ্টায় ৪ কিলোমিটার)। আগের পর্বে এটা দেখিয়েছিলাম। একটি বন্ধ গাড়ির ভেতর শব্দের বেগের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। শব্দ হলো বাতাসের অণু দিয়ে বয়ে চলা একধরনের তরঙ্গ। যেহেতু গাড়ির ভেতরের বাতাস গাড়ির সঙ্গেই ছুটছে, তাই গাড়ির সাপেক্ষে শব্দ উত্তর দিকে যে বেগে যাবে, দক্ষিণ দিকেও একই বেগে যাবে।

কিন্তু আমরা যদি একটি বন্ধ বগি থেকে খোলা মালবাহী ট্রেনের বগিতে যাই, তবে পরিস্থিতি বদলে যাবে। বাতাস আর বগির ভেতর আটকে নেই। ট্রেন যদি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে ছোটে, তবে খোলা বগির ওপর দিয়ে ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে উল্টো দিকে বাতাস বইবে। এই বাতাসের কারণে ট্রেনের পেছন থেকে সামনের দিকে শব্দের বেগ স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যাবে। আবার সামনে থেকে পেছনের দিকে শব্দের বেগ বেড়ে যাবে স্বাভাবিকের চেয়ে।

আরও পড়ুন