হিগাশিনোর প্রতি আমার ডিভোশন

কেইগো হিগাশিনোছবি: এএফপি

আমি কেইগো হিগাশিনো প্রথম পড়ি ২০১১ সালে। বইয়ের নাম ‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স’। লেখকের নাম আগে কখনো শুনি নাই। ইন্টারনেট থেকে এলোমেলো বই নামানোর বাতিক শুরু হয়েছে তখন। বইয়ের এরকম উদ্ভট নাম আমাকে টেনেছিল।

ইন্টারনেট থেকে বই নামানোর বাতিক যাদের আছে, তাঁরা জানেন, বই নামানোর সঙ্গে বই পড়ার কোনো যোগ নাই। নামানোটাই মুখ্য। স্তুপের পর স্তুর বই জমতে থাকে। খুব কম বইপত্রই আসলে পড়া হয়। হলেও দু-চার পাতা। সেই খোলা ফাইলে আর ফেরত আসা হয় না। জমিদার নন্দনের সকালের নাস্তার মতো। টেবিলভরা নাস্তা। কিন্তু জমিদারপুত্র একটা আপেল মুখে দিয়ে বেরিয়ে যায়।

‘ডিভোশন’ বইটা আমার পড়া হলো। দুটি দৈবের কারণে। প্রথমত ওই সময় আমি একটা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস কিনেছি, যেটাতে বই পড়া যায়। কিন্ডল বা সে ধরনের কোনো ই-বুক রিডার না। এটা মোবাইল ফোনের চেয়ে ছোট একটা যন্ত্র। ছোট একটা সাদাকালো স্ক্রিন। একই সঙ্গে গান শোনা যায় এবং বইও পড়া যায়। খুব সস্তা। আমি মূলত বই পড়ার জন্যেই কিনেছি। দ্বিতীয় কারণ দীর্ঘ অফিসযাত্রা। তখন মোহাম্মদপুরে থাকি এবং ‘সকাল-সন্ধ্যা’ নামে একটা বাসে চেপে মৌচাকে অফিসে যাই। বাসের নামের সঙ্গে এর যাত্রারও মিল ছিল। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা লাগত অফিসে পৌঁছাতে। সকালে উঠলে দুপুরে নামতাম, আরকি।

আরও পড়ুন

এই দীর্ঘ যাত্রা আমার জন্যে বিরক্তিকর কিছু ছিল না। আমি বাসে উঠে সবচেয়ে পেছনের আসনে বসে ‘চলছে গাড়ি যাত্রাবাড়ি’ মুডে আমার নতুন কেনা যন্ত্রে বই পড়তে শুরু করে দিতাম। বাস কোথায় কোন রাস্তায় উঠল, কোন সিগনালে বসে আছে, আমার মাথাব্যথা ছিল না।

এইভাবে আমার অচেনা এক জাপানি লেখকের এক রহস্যোপন্যাস পড়া হয়ে যায়। পুরোটাই অফিস যাত্রার ফাঁকে, বাসের ভিড়ে। পড়া হতো না, যদি না প্রথম দুই-তিন পাতার মধ্যেই হিগাশিনো অমন গেঁথে ফেলতে পারতেন। বইটা শেষ করলাম এবং থ হয়ে গেলাম। পুরো কাহিনি আসলে দুই সহপাঠী প্রতিভাধর গণিতবিদের বুদ্ধির প্রতিযোগিতা। মার্ডার মিস্ট্রি। কিন্তু যেটাকে ‘হু-ডান-ইট’ বলে, অর্থাৎ খুনির পরিচয় সনাক্ত করার কারবার, সে ধারার না। খুনটা এখানে শুরুতেই দেখিয়ে দেওয়া হয়। এবার পুরো প্লট ঘুরবে লাশটা কীভাবে গুম করে দেওয়া হবে, তাকে ঘিরে।

ডিটেকটিভ কাহিনির আতুরঘর হলো ইউরোপ-আমেরিকা। গত দেড়-দু শ বছরের চর্চায় সেখানে রহস্য কাহিনির বিচিত্র ধারা নানা দিকে ডালপালা মেলেছে। বিচিত্র রকমের পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়ে গেছে। নতুন কিছুর জন্ম দেওয়া কঠিন। কিন্তু হিগাশিনোর এই কাহিনির রহস্য এমন অপ্রত্যাশিতভাবে উন্মোচন হয়, এটাকে রহস্যকাহিনির প্রচলিত কোনো খোপের মধ্যে আঁটানো মুশকিল হয়ে পড়ে। এটা না ‘হাউ-ডান-ইট’, না ‘হোয়াই-ডান-ইট’ আর না ‘হাউক্যাচেম’ (অপরাধীকে কীভাবে পাকড়াও করা হবে)।

‘দ্য ডিভোশন অব সাসপেক্ট এক্স' বইয়ের প্র্রচ্ছদ

মনে আছে, বই শেষ করে বাস থেকে নেমেই আমি জনে-জনে হিগাশিনোর বইয়ের প্রচার শুরু করি। আমার প্রধান বক্তব্য ছিল, একমাত্র জাপানের মতো একটি অ-পশ্চিমা দেশে বসবাসকারী লেখকের পক্ষে সম্ভব এরকম অদ্ভুত এক প্লট ফেঁদে বসা। এ ধরনের কাহিনির কোনো ইকুইভ্যালেন্ট বা তুল্যমূল্য পুরো পশ্চিমা দুনিয়ায় নাই। সম্ভবও না। কারণ দুই গোলার্ধের মানুষের মগজটাই আলাদা। সন্দেহ নাই, আমি একটু বেশিই বলে ফেলতাম।

এটা স্বীকার করতে হবে, হিগাশিনো আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরা দিয়েছিল। ‘ডিভোশন’ তখন কেবল বেরিয়েছে। এর বাইরে তখনও হিগাশিনোর বই ইংরাজিতে তেমন অনুবাদ হয়নি। সম্ভবত আর একখানা হয়েছিল। পুরো পশ্চিমা দুনিয়া তখন কেবল হিগাশিনোকে চিনতে শুরু করেছে তার ‘ডিভোশন’ বইয়ের মধ্য দিয়ে। তারপর ২০১৫-১৬ সালের দিকে তো একপ্রকার বিস্ফোরণ হলো। চারিদিকে হিগাশিনো। বাংলাদেশে হিগাশিনো এখন মুরাকামির মতো অতি পরিচিত নাম। তিনি লিখছিলেনও দুই হাতে। চার দশকেরও বেশি লেখকজীবনে তিনি ১০৬টি বই লিখেছেন। শুধু জাপানেই বিক্রি হয়েছে ১০ কোটির বেশি কপি। তাঁর বই অনূদিত হয়েছে চল্লিশেরও বেশি দেশ ও অঞ্চলে।

অবশেষে হিগাশিনোর বিজয়রথ থেমেছে। ৬৮ বছর বয়সে কোলোরেক্টাল ক্যানসারে মারা গেলেন তিনি।

আরও পড়ুন

হিগাশিনোকে কেবল জনপ্রিয় রহস্য-লেখক বললে তাঁর গুরুত্ব কমিয়ে বলা হয়। জাপানে রহস্য কাহিনি লেখার একটা শক্তিশালী ধারা বরাবর আছে। অনেক লম্বা তালিকা জাপানি রহস্য লেখকদের। হিগাশিনোকে যুক্তিনির্ভর ক্লাসিক্যাল ডিটেকটিভ ফিকশনের ধারারই লেখক বলতে হবে। জাপানে এ ধারাটিকে বলে হোনকাকু। তবে তিনি যে হোনকাকুকে ভিন্ন এক স্তরে নিয়ে গেছেন, সেটা স্বীকার করতেই হবে। অনেকে মনে করেন এদোগাওয়া রাম্পো কিংবা সেইশি ইয়োকোমিজোর উত্তরাধিকার তার মধ্যে আছে। তবে তিনি রহস্যের ধাঁধাকে মানুষের নৈতিক সংকটের সঙ্গে এমনভাবে মিলিয়েছেন, যা আধুনিক রহস্যসাহিত্যে খুব কম দেখা যায়।

'স্যালভেশন অব আ সেইন্ট' বইয়ের প্র্রচ্ছদ

রহস্য কাহিনিতে রহস্যের জট এতো বড় স্থান জুড়ে থাকে যে চরিত্রগুলো ওই প্লটকে ঘিরে ঘুরতে থাকা পুতুলে পরিণত হয়। হিগাশিনোর ক্ষেত্রে সেটা ঘটে না। তার চরিত্রগুলো এমন এক নৈতিক দোনাটায় দুলতে থাকে যে প্লটকে তখন অমোঘ মনে হয় না। মনে হয় চরিত্রের ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়ে অর্গানিকভাবে প্লটের ভেতরে জট তৈরি হচ্ছে। হিগাশিনোর রহস্যের কেন্দ্রে অপরাধ থাকে না। থাকে মানুষ। আর এখানেই হিগাশিনো আলাদা। তিনি রহস্যের জট তৈরি করেন, কিন্তু জটের ভেতরে মানুষের ট্র্যাজেডি লুকিয়ে রাখেন। তাঁর উপন্যাস শেষ হওয়ার পর পাঠক শুধু বিস্মিত হয় না, এক ধরনের বিষণ্নতাও বহন করে।

আমি যখন হিগাশিনোকে আবিষ্কার করছি, বা বলা যায়, গোটা দুনিয়া যখন তাঁকে চিনছে, জাপানের এক সীমিত পরিসর ডিঙিয়ে তিনি বাইরে পা রাখছেন, তখন বিশ্বজুড়ে নর্ডিক নোয়ারের জোয়ার। স্টিগ লারসন, হেনিং মানকেল, জো নেসবো কিংবা আর্নালদুর ইন্দ্রিদাসনের বই বিশ্ববাজার দখল করে রেখেছে। সে কাহিনিগুলো এক অন্ধকার সামাজিক বাস্তবতাকে তুলে আনে। বরফশীতল ল্যান্ডস্কেপের পটভূমিতে একটা দুর্নীতিগ্রস্ত রাষ্ট্র, এক ভেঙে যাওয়া পরিবার। আর থানায় বসে থাকা এক বিষণ্ন গোয়েন্দা, যার কোনো পারিবারিক ট্রাজিডি ঘটে গেছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তার স্ত্রী অথবা বান্ধবী তাকে ছেড়ে চলে গেছে।

শিবব্রত বর্মন
ছবি: আব্দুল ইলা

হিগাশিনো সম্পূর্ণ ভিন্ন রাস্তা নিয়েছেন। তাঁর জাপান বরফে ঢাকা স্ক্যান্ডিনেভিয়া নয়। জাপানের নগরজীবনই তাঁর পটভূমি। সেখানে অপরাধের উৎস রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নয়, বরং মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ঈর্ষা, নিঃসঙ্গতা কিংবা অন্ধের মতো ভালোবাসা। তাঁর গোয়েন্দারা নর্ডিক নোয়ারের ক্লান্ত, মদ্যপ, ভাঙাচোরা নায়ক নন। তারা অনেক বেশি সংযত এবং বুদ্ধিমান। তারা প্রায় গণিতজ্ঞের মতো সমস্যার সমাধান করেন। ফলে নর্ডিক নোয়ারের অন্ধকারের বিপরীতে হিগাশিনো যেন তৈরি করেছেন এক ধরনের নৈতিক সাসপেন্স। এটাই হিগাশিনোকে অনন্য করে তুলেছে। এ কারণে বিশ্বের রহস্যসাহিত্যের মানচিত্রে তিনি একটি স্বতন্ত্র মহাদেশ।