ভূতের সঙ্গে অঙ্কের খেলা: তুষারঝড়ের মধ্যে জ্যামিতি
অধ্যায় দশ
রোহান তার ব্যাকপ্যাকের ওপর বরফের মধ্যে বসে ছিল। সে জানে না কোথায় আছে, তবে জায়গাটা মনে হচ্ছে উত্তর মেরু। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা বাতাস তার হাত ও পায়ে ঢুকে যাচ্ছে। তুষারপাত থামার কোনো লক্ষণই নেই। সত্যি বলতে, রীতিমতো তুষারঝড় চলছে! কোথাও আলো নেই, বাড়িঘর নেই। যত দূর চোখ যায় কোনো মানুষ নেই। আবার রাতও নেমে আসছে। খুব দ্রুত কিছু না ঘটলে আজ তার কপাল খারাপ আছে।
জমে নীল হয়ে যাওয়া হাত দুটো ঘষে গরম করার চেষ্টা করছে রোহান। সে ঠান্ডায় জমে মরতে চায় না! হঠাৎ সে দেখল, আরেকজন রোহান একটা আর্মচেয়ারে বসে তাকে কাঁপতে দেখছে। রোহান ভাবল, সে স্বপ্নে নিজেকেই স্বপ্ন দেখছে।
ধীরে ধীরে জমে যাওয়া বরফগুলো রোহানের মুখের সামনে ঘুরতে লাগল। ওগুলো আকারে আরও বড় হচ্ছে। যে রোহান আরাম করে আর্মচেয়ারে বসে ছিল, সে খেয়াল করল, কোনো তুষারকণাই একটার সঙ্গে আরেকটা হুবহু মেলে না। প্রতিটি তুষারকণা আলাদা। তবে বেশির ভাগের ছয়টা করে কোণ আছে। রোহান যখন আরও কাছে গিয়ে দেখল, সে বুঝল নির্দিষ্ট কিছু নকশা বারবার ফিরে আসছে। যেমন ষড়ভুজাকৃতি তারার ভেতর ষড়ভুজাকৃতি তারা, আবার সেই কোনাগুলো থেকে বেরিয়ে আসছে আরও ছোট ছোট কোনা…
হঠাৎ সে কাঁধে একটা হাত অনুভব করল। খুব পরিচিত একটা গলা শুনতে পেল।
‘সুন্দর, তাই না?’
এ তো সেই সংখ্যার ভূত। সে ঠিক তার পেছনেই বসে আছে।
‘আমি কোথায়?’ জিজ্ঞেস করল রোহান।
‘এক সেকেন্ড,’ ভূতটা উত্তর দিল। ‘আমি আলোটা জ্বেলে দিচ্ছি।’
হঠাৎ চারদিক উজ্জ্বল আলোয় ভরে গেল। রোহান দেখল, সে ছোট কিন্তু খুব সুন্দরভাবে সাজানো একটি অডিটরিয়ামে বসে আছে। সেখানে লাল মখমলে মোড়া মাত্র দুটো সারির আসন।
‘ব্যক্তিগত প্রদর্শনী,’ বলল ভূতটা। ‘শুধু তোমার জন্য।’
‘আর আমি ভাবছিলাম আমি নির্ঘাত জমে মরব।’
‘ওটা তো ছিল শুধু একটা সিনেমা। এই নাও, তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি।’
এটা কোনো পকেট ক্যালকুলেটর নয়। সেই চটচটে সবুজ ক্যালকুলেটরটিও না। জিনিসটা দেখতে রুপালি-ধূসর রঙের একটা যন্ত্র। সঙ্গে একটা দারুণ মাউস আর ফ্লিপ-টপ মনিটরও আছে।
‘একটা কম্পিউটার!’
‘আসলে ছোট একটা নোটবুক। তবে এটার সঙ্গে এমন ব্যবস্থা করা আছে, যাতে তুমি যা ইনপুট দেবে, সব অডিটরিয়ামের সামনের বড় পর্দায় ভেসে উঠবে। মানে তুমি মাউস দিয়ে সোজা পর্দার ওপর আঁকতে পারবে। তাহলে শুরু করা যাক?’
‘ঠিক আছে, তবে কথা দাও আর কোনো তুষারঝড় হবে না? শুধু সংখ্যা নিয়ে কথা বলবে, উত্তর মেরু যেন না আসে।’
‘ফিবোনাচ্চি সংখ্যা হলে চলবে?’
‘তুমি আর তোমার ফিবোনাচ্চি!’ চেঁচিয়ে উঠল রোহান। ‘বলো তো, ওই লোকটা কি তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড নাকি?’
সে এন্টার চাপতেই সংখ্যাগুলো পর্দায় ভেসে উঠল:
১, ১, ২, ৩, ৫, ৮, ১৩, ২১, ৩৪, ৫৫, ৮৯...
‘এবার ওগুলোকে ওদের প্রতিবেশী দিয়ে ভাগ করার চেষ্টা করো,’ পরামর্শ দিল ভূতটা। ‘বড়টাকে ছোটটা দিয়ে।’
‘ঠিক আছে,’ বলল রোহান। সে খুব উৎসাহ নিয়ে কাজটা শুরু করল। পর্দায় কী আসবে তা দেখার জন্য সে কৌতূহলী। স্ক্রিনে ভেসে উঠল:
১ ÷ ১ = ১
২ ÷ ১ = ২
৩ ÷ ২ = ১.৫
৫ ÷ ৩ = ১.৬৬৬৬৬৬৬৬৬৬...
৮ ÷ ৫ = ১.৬
১৩ ÷ ৮ = ১.৬২৫
২১ ÷ ১৩ = ১.৬১৫৩৮৪৬১৫...
৩৪ ÷ ২১ = ১.৬১৯০৪৭৬১৯...
৫৫ ÷ ৩৪ = ১.৬১৭৬৪৭০৫৯...
৮৯ ÷ ৫৫ = ১.৬১৮১৮১৮১৮১৮১৮...
‘উদ্ভট!’ সে বলল। ‘আরেক গাদা সংখ্যা যেগুলো থামতেই চায় না। সেই নিজের লেজ কামড়ে ধরা সাপের মতো। আর কয়েকটা তো রীতিমতো অযৌক্তিক আচরণ করছে।’
‘ঠিক, ঠিক,’ ভূতটা বলল, ‘কিন্তু আর কী দেখতে পাচ্ছ?’
রোহান কিছুক্ষণ ভাবল এবং বলল, ‘সংখ্যাগুলো...মনে হচ্ছে কেমন নড়বড়ে। দ্বিতীয়টা প্রথমটার চেয়ে বড়, তৃতীয়টা দ্বিতীয়টার চেয়ে ছোট, চতুর্থটা আবার একটু বড়...। ওরা এপাশ-ওপাশ দুলছে। কিন্তু আমরা যত এগোচ্ছি, ওদের দুলুনি তত কমছে।’
‘ঠিক। ফিব্বোনাচ্চি সংখ্যা যত বড় হবে, তুমি একটা বিশেষ সংখ্যার তত কাছাকাছি পৌঁছাবে। সংখ্যাটি হলো:
১.৬১৮০৩৩৯৮৯...
তবে ভেবো না যে ওখানেই গল্পের শেষ। কারণ, এই সংখ্যাটা হলো সেই অযৌক্তিক সংখ্যাগুলোর একটা, যেগুলো অনন্তকাল ধরে চলতেই থাকে। তুমি যত দূর খুশি যেতে পারো, কিন্তু কখনোই এর শেষ খুঁজে পাবে না।’
‘ফিবোনাচ্চির থেকে আর কী-ই বা আশা করা যায়?’ রোহান বলল। ‘কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, ওরা কেন ওই অদ্ভুত সংখ্যাটার চারপাশে অমন নড়বড়ে আচরণ করছে।’
‘ওহ, ওটা,’ ভূতটা বলল। ‘ওটা বিশেষ কিছু না। সব সংখ্যাই এ কাজ করে।’
‘সবাই করে মানে কী?’
‘মানে ওদের ফিবোনাচ্চি হওয়ার দরকার নেই। চলো একদম সাধারণ দুটি আলাদা সংখ্যা নিই। তোমার মাথায় আসে এমন দুটি সংখ্যা বলো।’
‘সতেরো ও এগারো।’
‘ভালো। এবার ওই দুটি যোগ করো।’
‘এটা আমি মনে মনেই করতে পারব। আঠাশ।’
‘চমৎকার। এবার আমাকে পর্দায় দেখাতে দাও এরপর আমরা কী পাব।’
১১ + ১৭ = ২৮
১৭ + ২৮ = ৪৫
২৮ + ৪৫ = ৭৩
৪৫ + ৭৩ = ১১৮
৭৩ + ১১৮ = ১৯১
১১৮ + ১৯১ = ৩০৯
‘বুঝেছি,’ রোহান বলল। ‘এখন কী?’
‘আমরা ঠিক তা-ই করব যা ফিবোনাচ্চি সংখ্যার সঙ্গে করেছিলাম। ভাগ করব। শুরু করো,’ ভূতটা বলল, ‘আর দেখো কী পাও।’
রোহান এন্টার চাপতেই আবার সংখ্যাগুলো পর্দায় ভেসে উঠল:
১৭ ÷ ১১ = ১.৫৪৫৪৫৪...
২৮ ÷ ১৭ = ১.৬৪৭০৫৮...
৪৫ ÷ ২৮ = ১.৬০৭১৪২...
৭৩ ÷ ৪৫ = ১.৬২২২২২২...
১১৮ ÷ ৭৩ = ১.৬১৬৪৩৮...
১৯১ ÷ ১১৮ = ১.৬১৮৬৪৪...
৩০৯ ÷ ১৯১ = ১.৬১৭৮০১...
‘সেই একই পাগলাটে সংখ্যা!’ চিৎকার করে উঠল রোহান। ‘হচ্ছেটা কী এখানে? এটা কি সব সংখ্যার মধ্যে লুকিয়ে আছে?’
‘আছে,’ ভূতটা বলল। ‘আর প্রকৃতিতে এবং শিল্পকলাতেও আছে। তবে তা খুঁজে বের করতে জানতে হবে। ভালো কথা, তুমি আগ্রহী হলে তোমাকে দেখাই ১.৬১৮...আর কী হতে পারে।’
পর্দায় এক বিশাল দানবীয় ভগ্নাংশ ভেসে উঠল:
‘ভগ্নাংশ!’ আবার চেঁচিয়ে উঠল রোহান। ‘এমন একটা ভগ্নাংশ যা কখনোই শেষ হয় না। এত বিদঘুটে যে তাকালেই আমার চোখে ব্যথা করে! আমি ভগ্নাংশ ঘৃণা করি! মিস্টার বাকের ওগুলো ভালোবাসেন। উনি ওগুলো দিয়ে আমাদের অত্যাচার করতে পছন্দ করেন। ওই দানবটাকে আমার চোখের সামনে থেকে সরাও। প্লিজ!’
‘এখনই আতঙ্কিত হয়ো না। এটা তো শুধু একটা অসীম ভগ্নাংশ। কিন্তু এটা কি তোমার কাছে বিস্ময়কর লাগছে না যে আমরা ওই পাগল করা সংখ্যাটিকে (১.৬১৮…) একগুচ্ছ ১-এর ভেতর থেকে বের করে আনতে পারছি, যারা ক্রমশ ছোট থেকে আরও ছোট হচ্ছে?’
‘তুমি যা খুশি ভাবতে পারো, শুধু আমাকে ভগ্নাংশ থেকে রেহাই দাও। আর বিশেষ করে সেসব ভগ্নাংশ, যেগুলোর কোনো শেষ নেই।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি শুধু তোমাকে একটা ছোট সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম। যদি অসীম ভগ্নাংশ তোমাকে এতই বিচলিত করে তবে অন্য কিছু চেষ্টা করা যাক। এই পঞ্চভুজটা দেখো।
ধরো এর প্রতিটি বাহুর দৈর্ঘ্য এক।’
‘এক কী?’ সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল রোহান। ‘এক মিটার নাকি এক সেন্টিমিটার? তুমি কি চাও আমি মেপে দেখি?’
‘তাতে কিছু যায় আসে না,’ ভূতটা একটু বিরক্ত হয়ে বলল। ‘এই সমস্যাটা আমাদের আগেও হয়েছিল, মনে আছে? আর ঠিক করেছিলাম একে আমরা এক ‘কুয়াং’ ডাকব। তাই ধরো প্রতিটি বাহু এক কুয়াং লম্বা। ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। তুমি যা বলো।’
‘এখন আমি পঞ্চভুজের ভেতর একটা কমলা রঙের তারা আঁকব। তারাটিতে পাঁচটি কমলা রেখা আছে। আমাকে যদি জিজ্ঞেস করো ওই রেখাগুলোর যেকোনো একটি কতটা লম্বা, আমি বলব ঠিক ১.৬১৮...কুয়াং। এর চেয়ে একচুল বেশিও না, কমও না।’
‘সত্যিই অদ্ভুত সংখ্যা!’
‘তুমি তো এর অর্ধেকও জানো না,’ ভূতটা হাসিমুখে বলল। রোহানের আগ্রহ দেখে সে খুশি হয়েছে। ‘এখন খুব মনোযোগ দিয়ে দেখো। আমি চাই তুমি দুটো কমলা অংশ মাপো, যেগুলোকে আমি A এবং B দিয়ে চিহ্নিত করেছি।’
‘A অংশটা B-এর চেয়ে সামান্য লম্বা,’ রোহান বলল।
‘আর যাতে তোমাকে মাথা ঘামাতে না হয়, আমি সোজাসুজি বলে দিচ্ছি এটা কতটা লম্বা: A হলো B-এর ঠিক ১.৬১৮... গুণ। এভাবে তুমি যত ইচ্ছা তারা ওটার ভেতরে আঁকতে পারো। মানে গরু ঘরে না ফেরা পর্যন্ত! কারণ, আমাদের তারাটা অনেকটা তুষারকণার মতো। কমলা তারার ভেতরে একটা কালো পঞ্চভুজ আছে, কালো পঞ্চভুজের ভেতরে আবার একটা কমলা তারা আছে। এভাবে চলতেই থাকবে।’
‘আর সেই বজ্জাত অযৌক্তিক সংখ্যাটা বারবার ফিরে আসবে?’ জিজ্ঞেস করল রোহান।
‘অবশ্যই আসবে। তাই তুমি যদি এতে ক্লান্ত না হয়ে থাকো...’
‘একদমই না,’ রোহান তাকে আশ্বস্ত করল। ‘এটা জাদুকরি!’
‘তাহলে চলো তোমার নোটবুকে ফিরে যাই আর ওই বজ্জাত সংখ্যাটা লিখি। দাও, আমি বলে দিচ্ছি:
১.৬১৮০৩৩৯৮৯...
এখন ০.৫ বিয়োগ করো:
১.৬১৮০৩৩৯৮৯... - ০.৫ = ১.১১৮০৩৩৮৯৮...
ফলাফলটা দ্বিগুণ করো। মানে ২ দিয়ে গুণ:
১.১১৮০৩৩৯৮৯... × ২ = ২.২৩৬০৬৭৯৭৮...
দারুণ। এবার নতুন ফলাফলকে বর্গ করতে হবে। এটার জন্য একটা বিশেষ বাটন আছে। ক্যালকুলেটরের x² লেখা বাটনটি চাপো:
২.২৩৬০৬৭৯৭৭...২ = ৫.০০০০০০০০০
‘পাঁচ!’ রোহান চিৎকার করে উঠল। ‘না! অসম্ভব! কীভাবে হলো? কেন পাঁচ?’
‘আসলে,’ ভূতটা খুব আনন্দের সঙ্গে বলল, ‘আমাদের পাঁচ বাহুর আকৃতির ভেতরে একটা পাঁচ কোনা তারা আছে।’
‘হাজারটা শয়তানি বুদ্ধি আছে তোমার,’ রোহান বলল।
‘এখন চলো আমাদের তারার মধ্যে কয়েকটা বিন্দু বসাই,’ ভূতটা বলে চলল। ‘যেখানে রেখাগুলো একে অপরকে ছেদ করেছে, তার প্রত্যেকটা পয়েন্টে একটা করে বসাও। গুনে দেখো কয়টা আছে।’
‘দশটা,’ রোহান বলল।
‘আর এখন কয়টা সাদা জায়গা আছে?’
রোহান গুনে দেখল এগারোটা।
‘এখন আমাদের জানতে হবে কয়টা রেখা আছে। দুটি বিন্দুর মাধ্যমে যুক্ত রেখা।’ রোহানের গুনতে একটু সময় লাগল কারণ, সে বারবার গুলিয়ে ফেলছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে উত্তরটা পেল: ২০।
‘ঠিক,’ ভূতটা বলল। ‘এখন এটা দেখো:
তুমি যদি বিন্দু আর স্পেসের সংখ্যা যোগ করো এবং সেখান থেকে রেখার সংখ্যা বিয়োগ করো, তবে মোট ফল হবে এক।’
‘তো?’
‘ব্যাপারটা হলো, শুধু আমাদের তারার ক্ষেত্রেই যোগফল এক হয় না, যেকোনো চ্যাপ্টা বা সমতল আকৃতির ক্ষেত্রে এই ফল সব সময় এক হবে। ওটা যত খুশি জটিল বা আঁকাবাঁকা হোক না কেন। তুমি চেষ্টা করে দেখো। যা খুশি একটা আকৃতি আঁকো আর মিলিয়ে দেখ।’
সে রোহানের হাতে মাউসটা দিল। পর্দায় নিচের ছবিগুলো ভেসে উঠল:
‘হিসাব করার দরকার নেই,’ ভূতটা বলল। ‘আমি তোমার হয়ে করে দিয়েছি। প্রথম ছবিতে সাতটা বিন্দু, দুটি স্পেস আর আটটা রেখা। অর্থাৎ, ৭ + ২ - ৮ = ১। দ্বিতীয় ছবিতে: ৮ + ৩ - ১০ = ১। তৃতীয় ছবিতে: ৮ + ১ - ৮ = ১। অর্থাৎ সব সময় ১। ভালো কথা, এটা শুধু সমতল ছবির জন্যই নয়; কিউব বা পিরামিডের জন্যও খাটে। একমাত্র পার্থক্য হলো তখন উত্তরটা একের বদলে ২ হবে।’
‘প্রমাণ করো।’
‘পর্দায় যেটা দেখছ ওটা একটা পিরামিড।’
‘তুমি এটাকে পিরামিড বলো? এটা তো শুধু চারটা ত্রিভুজ।’
‘কিন্তু যদি তুমি এটাকে কেটে ভাঁজ করো?’
ফলাফল সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় ভেসে উঠল:
‘তুমি নিচের ছবিগুলোর সঙ্গেও একই কাজ করতে পারো,’ ভূতটা বলল।
পর্দায় তিনটি নতুন আকৃতি এলো।
‘ওগুলো কিছু না,’ রোহান বলল। ‘আমি আগেও করেছি। প্রথমটা কেটে আঠা দিয়ে লাগালে একটা কিউব বা ঘনক পাওয়া যায়। কিন্তু দাঁড়াও, বাকি দুটো মনে হচ্ছে বেশি জটিল।’
‘তোমাকে দেখাই কী পাবে। দ্বিতীয়টা হবে একটা ডাবল পিরামিড, যার মুখ ওপর ও নিচে, দুই দিকেই আছে। তৃতীয়টা বিশটি সমান আকারের ত্রিভুজ দিয়ে তৈরি প্রায় গোলকাকৃতির একটা বস্তু।
আমাদের প্রিয় পঞ্চভুজ দিয়েও তুমি একধরনের বল বানাতে পারো। ওটা আঁকলে এমন দেখায়:
আর কাটার পর, ভাঁজ করে এবং আঠা লাগিয়ে এমন হবে:
‘মন্দ না,’ রোহান বলল। ‘আমার মনে হচ্ছে আমি একটা বানাব।’
‘এখন না, প্লিজ,’ ভূতটা বলল, ‘কারণ, এখন আমি আমাদের বিন্দু, রেখা ও স্পেসের খেলায় ফিরতে চাই। চলো একটা কিউব দিয়ে শুরু করি। এটা সবচেয়ে সহজ।’
আটটা বিন্দু, ছয়টা স্পেস (তল) ও বারোটা রেখা গোনার পর রবার্ট বলল, ‘৮ + ৬ - ১২ = ২।’
‘দুই, যেমনটা আশা করেছিলাম,’ ভূতটা বলল। ‘আকৃতি যা-ই হোক না কেন, ফলাফল সব সময় দুই। বিন্দু যোগ তল বিয়োগ রেখা সমান দুই। কোনো ব্যতিক্রম নেই। তুমি যা খুশি তাই কেটে আঠা দিয়ে জোড়া লাগাতে পারো। এমনকি তোমার মায়ের আংটির হিরেটাও। তুষারকণা গোনার আগেই গলে শেষ না হয়ে গেলে সেগুলোও করতে পারো...’
ভূতের কথাগুলো দ্রুত অস্পষ্ট আর চাপা হয়ে আসছে। অডিটরিয়ামের আলোগুলো নিভে যাচ্ছে। পর্দায় শুরু হয়েছে আবার তুষারপাত। তবে এবার রোহান ভয় পেল না। সে কোথায় আছে তা জানে। এটাও জানে যে সে আর জমে যাবে না। যদিও তার চোখের সামনেই সবকিছু সাদা থেকে আরও সাদা হয়ে যাচ্ছে।
যখন তার ঘুম ভাঙল, সে তুষারের বদলে পশমের একটা মোটা সাদা কম্বলের নিচে শুয়ে ছিল। কম্বলে কোনো বিন্দু নেই, রেখা নেই, এমনকি তলও নেই। কম্বলটাও নিশ্চিতভাবেই চারকোনা, পাঁচকোনা নয়। আর অবশ্যই সেই সুন্দর রুপালি-ধূসর কম্পিউটারটা উধাও হয়ে গেছে। সেই বজ্জাত সংখ্যাটা যেন কী ছিল, ওই এক দশমিক ছয়...? ওটা যে অসীম, তা সে জানত। কিন্তু এখন এর বেশি আর কিছু মনে করতে পারল না।
শেষের আগে
(তোমাদের মধ্যে যারা কাঁচি ও আঠা নিয়ে কারিকুরি করতে পছন্দ করো, তারা চাইলে সংখ্যার ভূতের দেখানো আকৃতিগুলো বানানোর চেষ্টা করতে পারো। আঠা লাগানোর সুবিধার জন্য তোমাকে ছোট ছোট বাড়তি অংশ এঁকে নিতে হবে। তুমি যদি পাঁচটা করেও আরও করতে চাও, তবে বিশেষ একটা জটিল আকৃতি বানাতে পারো। আগেই বলে রাখি, এর জন্য তোমাকে অনেক ধৈর্যশীল ও নিখুঁত হতে হবে।
তাহলে একটা বড় কাগজ নাও, অন্তত ৯ × ১২ ইঞ্চির। কাগজটা মোটা হওয়া চাই। তবে কার্ডবোর্ড হলে চলবে না। এখন নিচে যে ছবিটা দেখছো, সেটি কপি করো। মনে রেখো, অনেকগুলো ত্রিভুজের প্রতিটা বাহু যেন অন্যগুলোর সমান হয়। বাহুগুলো কত বড় হবে তা তুমি ঠিক করতে পারো, তবে দেড় ইঞ্চির মতো হলে সবচেয়ে ভালো। আকৃতিটা কেটে নাও এবং একটা স্কেল ব্যবহার করে লাল রেখা বরাবর কাগজটা সামনের দিকে ভাঁজ করো। এবার নীল রেখা বরাবর পেছনের দিকে ভাঁজ করো। তারপর আঠা দিয়ে জোড়া লাগাও। প্রথমে B ট্যাবের সঙ্গে b ত্রিভুজ, C ট্যাবের সঙ্গে c ত্রিভুজ ইত্যাদি…। সবশেষে A ট্যাবের সঙ্গে a ত্রিভুজ জোড়া দাও। কী পেলে? দশটা ছোট পিরামিড দিয়ে তৈরি একটা পাগলাটে রিং!
তুমি এটাকে সামনের দিকে বা পেছনের দিকে ঘোরাতে পারবে। প্রতিবার ঘোরালে একটা নতুন পঞ্চভুজ হবে। আন্দাজ করো তো, যদি তুমি বিন্দু, তল ও রেখাগুলো গুনে আমাদের সমীকরণে বসাও, তবে কী পাবে: D + S - L =?