কার্নিভ্যালে ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্র কর্মশালা

ক্যামেরার কবি নাসির আলী মামুনছবি: আব্দুল ইলা

কিআ কার্নিভ্যাল ২০২৬-এ বিশেষ আয়োজন হিসেবে ছিল প্রখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্র কর্মশালা। এ আয়োজনে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ৫৬ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অভিজ্ঞতা, জীবনসংগ্রাম ও ফটোগ্রাফির দর্শন।

নাসির আলী মামুনের আলোকচিত্রের শুরুটা মোটেই সহজ ছিল না। নিজের ক্যামেরা কেনার সামর্থ্য না থাকায় পরিচিত একটি স্টুডিও থেকে ধার করা বক্স ক্যামেরায় শুরু হয় তাঁর পথচলা। নতুন কিছু করতে গিয়ে পদে পদে ‘না’ শোনার তিক্ত অভিজ্ঞতা তাঁরও হয়েছে। দারিদ্র্য, চারপাশের নীরব ষড়যন্ত্র আর পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতার মতো সব প্রতিকূলতা জয় করে তিনি নিজেকে প্রস্তুত করেছেন। লেখক হুমায়ূন আহমেদ একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘তুমি কীভাবে চলো? কী খেয়ে বাঁচো? হাওয়া খেয়ে বাঁচো?’ আর্থিক অনটন সত্ত্বেও সারা জীবন আলোকচিত্রকেই ধ্যানজ্ঞান মেনেছেন তিনি।

নাসির আলী মামুনের মতে, নিজের ডিভাইসের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারলে ফটোগ্রাফি খুবই সহজ একটি বিষয়। হাতে থাকা মুঠোফোনটিকে তিনি ‘মহাবিশ্ববিদ্যালয়’ আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘নিজেকে বিলিয়ে দাও। ডিভাইসের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারলে তুমি যা ধারণ করতে চাইবে, সে সেটাই ধারণ করবে।’

আরও পড়ুন
পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি তোলার ক্ষেত্রে নাসির আলী মামুনের দর্শন অত্যন্ত গভীর
ছবি: আব্দুল ইলা

দৃষ্টিভঙ্গির উদাহরণ দিতে গিয়ে নাসির আলী মামুন বলেন, গাড়ি চালানোর সময় যেমন সামনে, ডানে-বাঁয়ে বা ওপরেও নজর রাখতে হয়, তেমনি একজন আলোকচিত্রীকেও চারপাশের সবকিছু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হয়। আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ের হার্ড ড্রাইভের একটি চাবি আছে। সেই চাবির সন্ধান পেলে শিল্প, চিন্তা এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব।

পোর্ট্রেট বা প্রতিকৃতি তোলার ক্ষেত্রে নাসির আলী মামুনের দর্শন অত্যন্ত গভীর। তিনি বিশ্বাস করেন, মানুষের চোখ হলো আয়না, যা দিয়ে ভেতরের ছবিটা পড়া যায়। তাঁর মতে, প্রতিটি ছবিই একেকটা গল্প বলে এবং ছবি তোলার সময় সেই গল্পগুলো নিজে থেকেই চোখের সামনে ধরা দেয়। যেমন সম্প্রতি জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের গ্রাফিতির ছবি তুলতে তিনি প্রায় সাড়ে তিন মাস পুরো ঢাকা শহর ঘুরে বেড়িয়েছেন।

আরও পড়ুন

দীর্ঘ ক্যারিয়ারে নাসির আলী মামুন দেশ-বিদেশের অসংখ্য বিখ্যাত মানুষের ছবি তুলেছেন। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ছবি তোলার অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘তাঁর চোখ দেখে আমার অনুভব হচ্ছিল, ওই চোখে আগুন জ্বলছে।’ এ ছাড়া এস এম সুলতান, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, জসীমউদ্‌দীন থেকে শুরু করে স্টিফেন হকিং, হিলারি ক্লিনটন ও বিল গেটসের মতো বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিদেরও ক্যামেরাবন্দী করেছেন তিনি।

তরুণদের অস্থিরতা নিয়ে নাসির আলী মামুন বলেন, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে দুটি পা শক্ত করে দাঁড়াতে হবে। তাঁর মূল উপদেশ হলো নিজস্বতা বজায় রাখা। ছবি তোলার ক্ষেত্রে শুরুতেই প্রতিজ্ঞা করতে হবে, ‘আমি অন্য কারও মতো তুলব না।’ কাউকে অনুকরণ না করে নিজের মেধা দিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির আহ্বান জানান তিনি। তরুণ আলোকচিত্রীদের প্রতি নির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, কাজ ছোট হোক বা বড়, গল্প থাকুক বা না থাকুক, নিজের কাজগুলো প্রদর্শন করতে হবে, সেটা অনলাইনে হোক কিংবা অফলাইন গ্যালারিতে।

আরও পড়ুন