বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

৫ বছর বয়সে হাতে ওঠে র‌্যাকেট

এমা শুধু পরিচয়েই ব্রিটিশ। জন্ম কানাডায়। বাবা রোমানিয়ান, মা চাইনিজ। মাত্র ২ বছর বয়সে পাড়ি জমিয়েছিলেন ইংল্যান্ডে। রাদুকানুর গল্পটা দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমানো আর দশটা অ্যাথলেটের মতো করুণ নয়, তাঁর গল্পটা বরং অন্যভাবে রাঙানো।

default-image

পরিবারে কোনো দিন খাদ্যের অভাব হয়নি তাঁর। কিন্তু মা চাইতেন, খেলার থেকে পড়াশোনাতে যেন মনোযোগটা একটু বেশি থাকে, কিন্তু মাত্র ৫ বছর বয়সে র‍্যাকেট হাতে তুলে নিতে দেখে বাবা আর না করেননি। অনেক কিছুই করেছেন ছোটবেলায়, এমন কিছু নেই, যাতে হাত পড়েনি তাঁর। ব্যালেট, কার্টিং, ডার্ট বাইকিং; কৈশোরে পা দেওয়ার আগেই সবেতেই একটু-আধটু অভিজ্ঞতা হয়েছে এমার। কিন্তু কোনোটাই পাকাপাকিভাবে থাকেনি, থেকেছে শুধু টেনিস। আর সেখানেই রাদুকানু গল্পটা লিখেছেন নিজের মতো করে।

default-image

এমা রাদুকানুর ক্ষেত্রে তিনটিকেই সত্য বলে ধরে নেওয়া যায়। ব্রিটিশ খেলোয়াড়দের জন্য আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে ভালো করাটা স্বপ্নের মতো। শত সাধনার পর অ্যান্ডি মারে পেরেছিলেন, অন্যরা যেতে পারেননি ধারেকাছেও। এমা সেটি করে দেখিয়েছেন মাত্র ১৭ দিনের মধ্যে। ইউএস ওপেনের নিচের সারি থেকে সরাসরি নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়।

পড়াশোনাই ছিল লক্ষ্য

অথচ উইম্বলডনের আগে তাঁর নামটাও জানত না কেউ। টেনিস থেকে বেশ বড় একটা ছুটিও নিয়েছিলেন তিনি। উদ্দেশ্য পড়াশোনা। এমার নিজের ভাষায়, ‘সমাজতান্ত্রিক দেশে বড় হওয়ার দরুন পড়াশোনাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য!’ মা–বাবা দুজনেরই জন্ম, বড় হওয়া যথাক্রমে রোমানিয়া আর চীনে। তাই মেয়ের পড়াশোনায় বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি হননি তাঁরা। তাই মহামারির মধ্যে সব বন্ধ হয়ে গেল, টেনিস ছেড়ে পুরোদমে সময় দিয়েছিলেন পড়াশোনায়। আর তার ফলে র‍্যাঙ্কিংটাও নেমে গিয়েছিল ৩৩৮-এ।

default-image

ম্যাথ-ইকোনমিকসে ‘এ’ গ্রেড নিয়ে এসে টেনিসের পরীক্ষায় বসেন, পেলেন ‘এফ’। প্রায় দেড় বছর পর প্রফেশনাল টেনিসে নেমেই শুরু করলেন হার দিয়ে। মধ্যে একটি টুর্নামেন্ট দিয়ে ফর্মে ফিরলেন বটে, কিন্তু তা যথেষ্ট ছিল না। তবু অন্ধকারে ঢিল মারলেন একটা, আবেদন করলেন উইম্বলডন ওয়াইল্ডকার্ডের জন্য। ব্রিটিশ আর জুনিয়র র‍্যাঙ্কিংয়ে বেশ বড় একটা সময় ‘নাম্বার ওয়ান’ ছিলেন। আর সে কারণেই হয়তো র‍্যাঙ্কিংয়ে বহুদূর থাকার পরেও ওয়াইল্ডকার্ড পেলেন টেনিসের সবচেয়ে কুলীন আসর উইম্বলডনে! বিশ্বে রাদুকানু নামটা চেনানোর সূচনা সেখান থেকেই।

ওয়াইল্ডকার্ডে উইম্বলডনে

বাড়ির পাশে উইম্বলডন, কতবার দেখতে এসেছেন, তার ইয়াত্তা নেই। টেনিস র‍্যাকেট হাতে নেওয়ার পর থেকেই প্রত্যেক খেলোয়াড়ের স্বপ্ন থাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর। আর সেই সর্বোচ্চ পর্যায়টা হলো গ্র্যান্ড স্লাম। ওয়াইল্ডকার্ডের সুবাদে সে স্বপ্নটা ছোঁয়া হয়েছে বটে, কিন্তু স্বপ্ন ছোঁয়া আর পূরণ করার মধ্যে পার্থক্যটা বিশাল। ডব্লিউটিএ (উইম্যান্স টেনিস অ্যাসোসিয়েশন) ট্যুরের কোনো টুর্নামেন্টেই শুরু থেকে খেলার সৌভাগ্য কিংবা যোগ্যতা, কোনোটাই হয়নি তাঁর। আর সে সুযোগ যখন সৌভাগ্য হয়ে এসেছে, তখন সেটাকে হেলায় হারানোর পাত্রী নন এমা রাদুকানু। নিজ যোগ্যতায় এত দূর এসেছেন, সুযোগ যখন মিলেছে, সেটাকে কাজে লাগাতে ভুল করলেন না।

default-image

টানা তিন রাউন্ডে তুলে নিয়েছেন জয়। উইম্বলডনের সেরা ১৬ থেকে যখন আরও বড় স্বপ্ন দেখছেন এমা, ঠিক তখনই আঘাত হানল ভয়টা। অস্ট্রেলিয়ান আইলা তমলিয়ানোভিচের বিপক্ষে দ্বিতীয় সেটে শুরু হলো শ্বাসকষ্ট। বৃষ্টির কারণে পিচের ওপরের ছাদ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর সেই বদ্ধ মাঠে খেলতে গিয়েই অস্বস্তি শুরু হয় এমার। ছোটবেলা থেকেই সামান্য শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে তাঁর, সেই সঙ্গে যোগ হয়েছিল এই বদ্ধ মাঠ। নিজের মাটি থেকে ওয়াকওভার দিয়ে ম্যাচ ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হলো এমাকে। স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় মাঠের মধ্যেই কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন এমা। শ্বাসকষ্টের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কাঁদতেও পারছিলেন না ঠিক করে।

টেনিস খেলা নিয়ে সংশয়

অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে দাদি নিকুলিনা রাদুকানু পরিবারের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিলেন, তাঁদের মেয়েকে খেলতে দেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে। ভাবনাটা অবান্তর নয়, পৃথিবীর অন্য কোনো খেলা থেকে টেনিস খেলাতে পরিশ্রমটা অনেক গুণ বেশি। ফুটবল-ক্রিকেটে তা–ও দম ফেলার ফুরসত আছে, টেনিসে তা নেই। খেলা একবার শুরু হলে ২-৩ ঘণ্টা তো চোখের নিমেষেই চলে যায়। টানা ১১ ঘণ্টা খেলা হওয়ার রেকর্ডও আছে বৈকি। এমন পরিশ্রমী খেলা খেলতে গিয়ে নিজেদের মেয়ের জীবনটাই না শেষ হয়ে যায়—এ চিন্তাই করছিলেন দাদি। ভাগ্যিস দাদির কথা কানে নেননি রাদুকানুর মা–বাবা। নইলে এমন রূপকথার গল্প হয়তো দেখাই হতো না আমাদের!

default-image

এমার অন্য লড়াই

রাদুকানুর জন্য পরের বাধাটা উতরানো ছিল আরও কঠিন। দুর্দান্ত শুরুর পর কষ্টের সঙ্গে বিদায় নিতে হয়েছিল তাঁকে, যতটা না হারের যন্ত্রণা, তার থেকে বেশি শ্বাসকষ্টের। নিজের খেলা নয়, নিজের স্বাস্থ্যের দিকেই নজর রাখতে হচ্ছিল তাঁকে। ট্রেনিং থেকে শুরু করে খাদ্যাভাসে আস্তে আস্তে পরিবর্তন আনা শুরু করেছিলেন, যাতে আবার এমন অবস্থার মুখোমুখি না হতে হয়। ইউএস ওপেনের প্রস্তুতি নিতে তাই এক মাস আগেই আমেরিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন, নিজেকে প্রস্তুত করতে। ভিনদেশে গিয়ে আবার যেন এমন স্বপ্নভঙ্গের শিকার না হতে হয়। উইম্বলডনের চতুর্থ রাউন্ডে ওঠার কারণে র‍্যাঙ্কিংয়ের ওপরের দিকে উঠেছেন বটে, কিন্তু শীর্ষ পর্যায়ে নিয়মিত মুখ হওয়ার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। নাম ছড়িয়ে পড়লেও তাঁকে খেলতে হচ্ছিল সেই তাঁর সমান র‍্যাঙ্কের খেলোয়াড়দের সঙ্গেই। তাতেও যে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। ইউএস ওপেনের প্রস্তুতি হিসেবে খেলেছেন শিকাগো কাপ। যেখানে ফাইনালে এসে প্রথম শিরোপাটা হাতছোঁয়া দূরত্বে রেখে চলে আসতে হয়েছে। তখনও রাদুকানু জানতেন না বিধাতা তাঁর গল্পটা লিখেছেন অন্যভাবে!

১৫০ থেকে শুরু

এমাকে শুরুটা করতে হয়েছিল প্রতিবার যেভাবে শুরু করতে হয়, ঠিক সেভাবেই। উইম্বলডনে বাড়ির মেয়ে বলে ওয়াইল্ডকার্ড পেয়েছিলেন, এখানে সে সুযোগটা নেই। আটলান্টিক মহাসাগর পার করে এসে তাঁকে শুরু করতে হয়েছিল থার্ড কোয়ালিফাইয়ার থেকে। সোজা বাংলায় বললে যতটা নিচ থেকে পারা সম্ভব, ততটাই নিচ থেকে। উইম্বলডনে ভালো করার সুবাদে র‍্যাঙ্কিংটা ৩৩৮ থেকে উঠে এসেছে ১৫০-এ। তাতে করে কোনোমতে ইউএস ওপেনে প্রবেশ করার সুযোগ হয়েছিল এমার। আর সেটাই ছিল এমার সামনে একটাই সুযোগ। উইম্বলডনে যেটা করেছেন, সেটা যে ফ্লুক নয়, তা প্রমাণ করার।

ফ্লুক নয় প্রমাণ করতে এসে রাদুকানু যেটি করে দেখালেন, সেটি শুধু ইউএস ওপেন না, পুরো টেনিস ইতিহাসের কেউ কোনো দিন এখান থেকে শিরোপার স্বপ্ন দেখেননি। কোয়ালিফাইং রাউন্ডের ৩ ম্যাচ, এরপর মূল পর্বের ৭ ম্যাচ, টানা ১০ ম্যাচ জিতে কোনো গ্র্যান্ড স্লাম টেনিস ইতিহাসের কেউ কোনো দিন জেতেননি। অষ্টাদশী এমা সেটা করে দেখিয়েছেন কোনো সেট না হেরে, তা–ও নিজের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লামেই। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় গ্র্যান্ড স্লামে শিরোপা জেতা দূরে থাক, ফাইনালেই উঠতে পারেননি কেউ কোনো দিন। ক্যারিয়ারের তৃতীয় গ্র্যান্ড স্লামে এসে ফাইনালে উঠেছিলেন ক্রিস এভার্ট ও ভেনাস উইলিয়ামস, কিন্তু শিরোপা জেতা হয়নি। রাদুকানু তা–ও ভেঙেছেন, নিজের নাম লেপটে দিয়েছেন টেনিস ইতিহাসের কানায় কানায়। আটলান্টিকের ওপার থেকে ব্রিটিশরা শেষ শিরোপা এনেছিল ২০১২ সালে, তা–ও অ্যান্ডি মারের সুবাদে। নারী এককের হিসাব ধরলে শেষ ১৯৬৮ সালে। আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে নতুন করে ব্রিটিশ রাজত্বের সূচনা করলেন এমা রাদুকানু।

অপ্রতিরোধ্য এমা

পুরো টুর্নামেন্টে কেউ দাঁড়াতেই পারেননি এমা রাদুকানুর সামনে। দ্বিতীয় রাউন্ড থেকেই মুখোমুখি হয়েছেন শীর্ষ ৫০–এর ভেতরে থাকা খেলোয়াড়ের। কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিলেন অলিম্পিক স্বর্ণজয়ী বেলিন্ডা বেনচিচের। তাঁকেও হারিয়েছেন সরাসরি সেটে। ফাইনালে লেইলা এসে যা একটু প্রতিরোধ গড়েছিলেন, তা–ও ভেঙে যায় বালুর বাঁধের মতো রাদুকানুর প্রত্যয়ের কাছে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র একবার টাইব্রেকারে গিয়েছেন, সেটাও দ্বিতীয় কোয়ালিফাইং রাউন্ডে। এমন দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে এর আগে শিরোপা নিজের করে নিতে দেখা গেছে একমাত্র রাফায়েল নাদালকে, ফ্রেঞ্চ ওপেনে। এমা রাদুকানু যেন সেটাই করে দেখালেন।

ইউএস ওপেনের ফাইনাল যখন রাঙাচ্ছেন এমা, তখন ব্রিটেনে বসে খেলা দেখছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। কোয়ারেন্টিন নিয়মের জন্য কারও ভিসা মেলেনি আমেরিকা ভ্রমণের। কোর্টে তাঁর বক্সে শুধু কোচ। এমা তাঁর প্রথম শিরোপাটা তাই ভাগাভাগি করে নেওয়ার মানুষও পাননি। তিন মাস আগে প্রথম ডব্লিউটিএ টুর্নামেন্ট খেলা মেয়েটা, একা একা মহাসাগর পাড়ি দিয়ে শিরোপা উদ্‌যাপন করছেন, এর থেকে বড় আনন্দের বিষয় বাবা-মায়ের কাছে কীই–বা হতে পারে?

default-image

এখন এগোনোর পালা

রাদুকানুর আগমন এমন সময়ে, যখন ফেদেরার ৪০ পার করে ফেলেছেন, নাদাল-জোকোভিচও ৩৫-এ পা দেবেন বলে। সেরেনাও এখন টেনিসে পুরো মনোযোগ দিতে পারেন না। বয়স হওয়ার পর থেকে নারী টেনিস মিউজিক্যাল চেয়ারের মতো, ধারাবাহিক কোনো খেলোয়াড় নেই, একবার জিতেও কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছেন সবাই। টেনিসে এখন নতুন হিরো আসার সময়, সে জায়গাটা পূরণ করার জন্য এমা রাদুকানুর থেকে ভালো কেই–বা আছেন?

এমার সামনে এখন কী? আড়াই মিলিয়ন ডলার প্রাইজমানি পেয়েছেন, ব্রিটিশ মিডিয়া তাঁকে সর্বোচ্চ আসনে তুলেছে। সামনে রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে সম্মানজনক পদকও পেতে পারেন। দুই সপ্তাহ আগে ইউএস ওপেনের মধ্যেই অন্য একটি টুর্নামেন্টে নাম লিখিয়েই ফেলেছিলেন তিনি। সেখান থেকে ফ্যাশিং মিডোর রানি তিনি। রাদুকানু কি পারবেন আটলান্টিকের এপার থেকে নিজের রাজত্ব পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দিতে? সে প্রশ্নের উত্তর সময়ের কাছেই বরাদ্দ থাক। এখন না হয় এমার মতো তাঁর জয়টাকেই উদ্‌যাপন করা যাক।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন