বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

মেসির রাগও একটু একটু করে কমতে থাকল। গত মৌসুমে বার্সার অধিনায়ক হিসেবে প্রথম ট্রফি জিতলেন, কোপা ডেল রে। লিগটাও জিততে জিততে শেষ মুহূর্তে পথ হারাল বার্সেলোনা। কিন্তু শেষ শূন্যতা পূরণে দুহাত ভরিয়ে দিলেন ফুটবল–বিধাতা। জাতীয় দলের হয়ে বহু আরাধ্যের ট্রফিটা জিতলেন মেসি। কোপা আমেরিকা জয় তাঁকে যেন নতুন তারুণ্য এনে দিল। মেসি প্রস্তুত হতে থাকলেন নতুন মৌসুমের নতুন চ্যালেঞ্জের জন্য।

default-image

এর মধ্যে মেসির সঙ্গে বার্সার চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। মেসি ও বার্সা দুই পক্ষই প্রস্তুত হচ্ছিল আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির জন্য। ক্লাবের আর্থিক দুরবস্থার কথা ভেবে মেসি নিজের বেতন অর্ধেক করে ফেলতেও রাজি হয়েছিলেন। বার্সা তাঁকে অনেক দিয়েছে। তিনিও বার্সাকে কম দেননি। কিন্তু ক্লাব যখন এত কঠিন সময় পার করছে, তখন আর্থিকভাবে নিজের ক্ষতি স্বীকার করে হলেও ভালোবাসাকেই না হয় প্রাধান্য দিলেন।

সব ঠিকঠাক। ছুটি কাটিয়ে মেসি বার্সেলোনায় ফিরলেন। নতুন চুক্তি সই হয়ে যাবে। ঠিক সেই মুহূর্তে বার্সেলোনা জানাল ভয়ংকর এক দুঃসংবাদ। মেসিকে সই করানো সম্ভব হচ্ছে না। স্প্যানিশ ফুটবল লিগ (লা লিগা) কর্তৃপক্ষ ক্লাবের আয়-ব্যয়ের একটা সীমারেখা বেঁধে দিয়েছে। মেসি তাঁর বেতন অর্ধেক কমালেও কাজ হচ্ছে না। বার্সার আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ অনেক বেশি থেকেই যাচ্ছে।

অনেকেই অবাক। বার্সেলোনার মতো একটি ক্লাব, যারা ২০০০ সালের পর ১০ বার লিগ জিতেছে, চারবার চ্যাম্পিয়নস লিগ; তাদের এই আর্থিক দুর্দশা হয় কী করে! ক্লাব ফুটবলে তো সাফল্যের হাত ধরে আসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। সর্বনাশটা আসলে হয়েছে গত ক্লাব সভাপতির সময়ে।

নেইমার হুট করে বার্সা ছেড়ে পিএসজিতে চলে যাওয়ার পর সমর্থকদের চাপের মুখে বিস্তর টাকা দিয়ে একের পর এক ভুল খেলোয়াড়কে দলে ভিড়িয়েছে বার্সা। এই বাবদ প্রচুর টাকা বের হয়ে তো গেছেই, ক্লাব খেলোয়াড়দের বেতনও তারা করে ফেলেছিল আকাশছোঁয়া। এরই মধ্যে করোনার হানা বিশ্বের সব ক্লাবকেই কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে।

বার্সেলোনার আর্থিক অবস্থা এখন এতটাই খারাপ, ঠিকমতো সবার বেতনই দিতে পারছে না। মেসি এতটা ছাড় দেওয়ার পরও তাই সম্ভব হচ্ছে না তাঁকে ধরে রাখা। নতুন চুক্তি করা।

default-image

মেসির জন্য তা ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। আগের বছর অভিমান থেকে ক্লাব ছাড়তে চেয়েছিলেন বটে, কিন্তু সত্যিই বার্সেলোনা ছাড়বেন, এ তাঁর কল্পনার অতীত। সেই ছোট্ট থাকতে আর্জেন্টিনার রোজারিও ছেড়ে এখানে এসেছেন। এই শহরেই তাঁর বড় হয়ে ওঠা। এই শহর জানে তাঁর প্রথম সবকিছু। এই শহরেই তাঁর তিন ছেলের জন্ম।

সংবাদ সম্মেলনে এসে মেসিকে জানাতে হলো, তিন ছেলেকে কথা দিয়েছিলেন যে তাঁরা বার্সেলোনাতেই থাকছেন। কিন্তু কথা রাখতে পারছেন না। নিজের দিক থেকে সব রকম চেষ্টা করেছেন। পারলেন না। বলতে বলতে মেসি হু হু কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সামনের সারিতে বসা স্ত্রী আন্তোনেলা তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন ন্যাপকিন। মেসির চোখের জলে ভিজে সেই ন্যাপকিনই সাক্ষী হয়ে থাকল ক্লাব ফুটবলের সবচেয়ে সোনালি এক অধ্যায়ের সমাপ্তির।

এবার নতুন অধ্যায়, নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পালা। হোক না তাঁর বয়স এখন ৩৪, তর্ক সাপেক্ষে সর্বকালের সেরা ফুটবলারকে কে না দলে পেতে চায়। এখনো মেসির জাদুর অনেক ঝলকই বাকি। তার ওপর সেই মেসিকে দলে নিতে যখন বার্সেলোনাকে একটা পয়সাও দিতে হবে না। বার্সার সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছিল বলে মেসি হয়ে গিয়েছিলেন ফ্রি এজেন্ট। মেসিকে লুফে নিল ফ্রান্সের ক্লাব পিএসজি, সেই পিএসজি, যেখানে বার্সা ছেড়ে আগেই চলে গিয়েছিলেন মেসির সবচেয়ে কাছের বন্ধু নেইমার।

default-image

বার্সা সমর্থকদের মধ্যে তখন হাহাকার। বার্সেলোনা শহরে তখন শোকের ছায়া। অনেকে তখনো ঘোরের মধ্যে। যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না, মেসি আর বার্সেলোনায় থাকছেন না।

ঠিক উল্টো ছবি প্যারিসে। খবর পাকা হওয়ার আগে থেকেই সেখানে উৎসবের ঢল পড়েছে। বিমানবন্দরের সামনে পিএসজি সমর্থকদের ভিড়। ‘মেএএএসিইইই, মেএএসিইই’ স্লোগানের কোরাস।

default-image

অবশেষে নিজস্ব জেটে মেসি উড়াল দিলেন। সবকিছু ঘটে গেল ফাস্ট ফরোয়ার্ডে। চুক্তি সই হয়ে গেল। বছরে সাড়ে তিন কোটি ইউরো বেতনে দুই বছরের চুক্তি, দুই পক্ষ রাজি থাকলে সেটি তিন বছরেও যেতে পারে। আইকনিক ১০ নম্বর জার্সি, সাধারণত দলের সেরা খেলোয়াড়টির গায়েই যে জার্সি থাকে; নেইমার সেটি দিয়ে দিতে চাইলেও মেসি নিলেন না। তিনি বেছে নিলেন ৩০ নম্বর। ২০০৪ সালে এই ৩০ নম্বর জার্সিতেই বার্সেলোনার হয়ে পেশাদার ফুটবলে অভিষেক হয়েছিল তাঁর।

মাত্রই তো শুরু হলো, সময়ই বলে দেবে মেসির নতুন এই অধ্যায় কতটা ঝলমলে হয়। নিজের সেরা সময় পেছনে ফেলে এসেছেন সত্যি, কিন্তু এখনো মেসি-ঝলকে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। গত মৌসুমেও বার্সার হয়ে ৪৭ ম্যাচে যেমন ৩৮ গোল করেছেন।

পিএসজিতে চুক্তি সইয়ের পর বলেছেন, খুব ভালো করেই জানেন পিএসজির লক্ষ্য কী। গত দুই মৌসুমে একবার ফাইনাল আরেকবার সেমিফাইনাল খেলা প্যারিসের ক্লাবটি চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে চায়। সত্যি বলতে কি, মেসি নিজেও ব্যাকুল হয়ে আছেন পঞ্চমবারের মতো এই ট্রফি জিততে। কাতারি পেট্রোডলারে বলীয়ান হয়ে পিএসজি এমন দল বানিয়েছে, তাদের পক্ষে খুবই সম্ভব ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের এই মুকুট জয় করা।

মেসির এই হাসি–কান্নার ঘনঘটার মধ্যেই আবার একটা মিম ভাইরাল হয়ে গেছে। ২০০১ সালে পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পরের বছর বিশ্বকাপ জিতেছিলেন রোনালদিনহো। ২০১৭ সালে যোগ দেওয়ার পরের বছর যেমন জিতেছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। মেসি যোগ দিলেন ২০২১-এ। তবে কি ২০২২ বিশ্বকাপে…।

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন