ছোট দলের বড় চমক

এবারের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে স্বভাবতই আগ্রহ ছিল কম। বাংলাদেশ নেই বিশ্বকাপে। রাজনৈতিক জটিলতা আর নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতে বিশ্বকাপে খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। সেই জায়গায় সুযোগ পেয়েছে স্কটল্যান্ড। ১৯৯৬ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশবিহীন এক বিশ্বকাপের দেখা পেল ক্রিকেটবিশ্ব।

মজার ব্যাপার হলো সেই বিশ্বকাপও আয়োজন করেছিল ভারত ও শ্রীলঙ্কা। সঙ্গে ছিল পাকিস্তান। ছিল বয়কটের ঘটনাও। সবাই ধরে নিয়েছিল, বাংলাদেশের বয়কটের ঘটনার জন্যই হয়তো মনে রাখতে হবে এই বিশ্বকাপকে। অথচ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব শেষ হতে না হতেই চমক নিয়ে হাজির হয়েছে তুলনামূলক কম শক্তির দলগুলো। হেভিওয়েটদের টেক্কা দিয়ে নিজেদের মেলে ধরেছে নতুন দলগুলো।

গতবারের মতো এই বিশ্বকাপেও অংশ নিয়েছে ২০ দল। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে ইউরোপের ইতালি। ফুটবলের জন্য বিশ্বখ্যাত দলটি বাছাইপর্ব পেরিয়ে জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে। কিন্তু যতই বাছাইপর্ব পেরিয়ে দলগুলো আসুক না কেন, বিশ্বকাপের ফরম্যাট সাজানো হয় এমনভাবে, যেন বড় দলগুলো কোনো চিন্তা ছাড়াই হেসেখেলে উতরে যেতে পারে পরের পর্বে। ছোট দলগুলোও খুব একটা বাগড়া দিতে পারে না হেভিওয়েটদের। কিন্তু এবারে যেন সেই বাগড়া দিতেই এসেছিল ছোট দলগুলো। টুর্নামেন্টজুড়ে তাই চোখে পড়েছে হেভিওয়েটদের হোঁচট খাওয়ার দৃশ্য।

আরও পড়ুন

নেপালের কাছে প্রায় ধরাশায়ী ইংল্যান্ড

বিশ্বকাপের প্রথম চমকটা আসতে পারত নেপালের কাছ থেকে। টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় দিনেই বিশ্বজয়ী ইংল্যান্ডকে একেবারে খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছিল দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে আসা নেপাল। প্রথমে ব্যাট করে ইংল্যান্ড ১৮৫ রানের বিশাল টার্গেট ছুড়ে দেয় নেপালের সামনে। সেই রান হেসেখেলেই পূরণ করে যাচ্ছিল নেপাল। শেষ ওভারে দরকার ছিল মাত্র ১০ রান। কিন্তু শেষ ওভারে এসেই খেই হারিয়ে ফেলল নেপাল। স্যাম কারেনের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ইংল্যান্ড ম্যাচটা জিতে নেয় মাত্র ৪ রানে। হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে গিয়েছিল সেদিন ইংল্যান্ড।

ডাবল সুপার ওভার

আফগানদের টি-টুয়েন্টি জগতে চমক দেখানো দল বলা যাবে না। গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলেছে যে দল, তারা তো আর যাই হোক ছোট দল নয়। কিন্তু তারা যে চমক দেখিয়েছে, তা এই তালিকায় যুক্ত করার জন্য যথেষ্ট। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে দেখা মিলেছে ডাবল সুপার ওভারের। প্রথমে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকা করে ১৮৭ রান। সেই রান তাড়া করতে নেমে রহমানুউল্লাহ গুরবাজের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে আফগানরাও ইনিংস শেষ করে ১৮৭ রানে। শেষ ওভারে কাগিসো রাবাদার দুই নো বল, এক ওয়াইড আর নুর আহমেদের ছক্কায় সমান স্কোর নিয়ে সুপার ওভারে পা দেয় আফগানিস্তান। প্রথম সুপার ওভারে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ১৮ রানের বড় টার্গেট ছুড়ে দেয় আফগানিস্তান। জবাবে শেষ বলে ছক্কা মেরে ত্রিস্তান স্টাবস তোলেন ১৭ রান। অর্থাৎ আরেকটি সুপার ওভার। এবার স্টাবস আর ডেভিড মিলার ভুল করেননি। দুজন মিলে এক ওভারে তুলেছেন ২৩ রান। সেই রান থামাতে বোলিংয়ে আসেন কেশব মহারাজ। দ্বিতীয় বলেই মোহাম্মদ নবীকে ফেরান তিনি। কিন্তু রহমানউল্লাহ গুরবাজ তখনো হাল ছাড়েননি। তিন বলে দরকার ১৮ রান, পরপর দুই ছক্কা মেরে সমীকরণ নামিয়ে এনেছেন ১ বলে ৬ রানে। এবার আর সুপার ওভার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তখনই মহারাজ দিলেন ওয়াইড। ১ বলে দরকার ৫। উড়িয়ে মারতে গিয়ে মিলারের হাতে ধরা পড়লেন গুরবাজ। দুইবার সুপার ওভারে উঠেও শেষ পর্যন্ত ৪ রানে হেরে যেতে হলো আফগানদের।

আরও পড়ুন

নেপাল বনাম ইতালি

অন্য কোনো সহযোগী দুই দেশের খেলা হলে হয়তো আলাদা করে নজরই থাকত না কারও। কিন্তু দল দুটোর নাম নেপাল আর ইতালি বলেই হয়তো আলাদা করে আগ্রহ ছিল সবার। বিশ্বকাপের আগেই দল দুটো নাম কামিয়েছিল নিজেদের খেলা দিয়ে। নেপালের দিকে পাল্লা ভারী থাকলেও ম্যাচটা একপেশে করে জিতে নিয়েছে ইতালি। নেপালের দেওয়া ১২৪ রানের টার্গেট ইতালি পূরণ করেছে মাত্র ১২ ওভার ৪ বলে, সেটাও ১০ উইকেট হাতে রেখে।

আরও পড়ুন

জিম্বাবুয়েময় এক বিশ্বকাপ

কথায় আছে, অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আসেন সবার শেষে। জিম্বাবুয়ের গল্পটাও এখানে ঠিক সে রকম। এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চমক ছিল জিম্বাবুয়ে। প্রায় ৪০ বছরের বেশি সময় ধরে আইসিসির পূর্ণ সদস্য হলেও জিম্বাবুয়েকে খাটো করেই দেখা হয় অনেক বছর ধরে। গত বিশ্বকাপে উগান্ডার কাছে হেরে বাদ পড়েছিল মূল পর্ব থেকে। সেই জিম্বাবুয়েই এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বড় চমকটা দেখিয়েছে। গ্রুপের সেরা দুই দল শ্রীলঙ্কা আর অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শীর্ষ স্থানে থেকে শেষ করেছে গ্রুপ পর্ব। যাদের কোনো সমীকরণে রাখাই হয়নি, তারাই পাশার দান উল্টে দিয়েছে এবারের বিশ্বকাপে।

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথমে ব্যাট করে জিম্বাবুয়ে করে ১৬৯ রান। সেই রান তাড়া করা কোনো ব্যাপারই ছিল না অজিদের জন্য। কিন্তু ব্যাট করতে নেমেই ব্লেসিং মুজারাবানি আর ব্র্যাড ইভান্সের দুর্দান্ত বোলিংয়ের কাছে পরাস্ত হয় অজিরা। বিশ্বজয়ী অস্ট্রেলিয়া থেমে যায় ১৪৬ রানেই। ২৩ রানের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে জিম্বাবুয়ে।

অজিদের থামিয়েই বিশ্বকাপের সুপার এইট নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল জিম্বাবুয়ের। কিন্তু তখনো আরেকটি চমক লুকিয়ে রেখেছিল তারা নিজেদের কাছে। স্বাগতিক শ্রীলঙ্কা প্রথমে ব্যাট করে করে ১৭৮ রান। সেই রান হেসেখেলেই পার হয়ে যায় জিম্বাবুয়ে। ৩ বল হাতে রেখে শেষ ওভারে চার ছক্কা হাঁকিয়ে শ্রীলঙ্কাকে ধরাশায়ী করার মাধ্যমে শেষ হয় জিম্বাবুয়ের গ্রুপ পর্ব। ৪ ম্যাচে ৩ জয় আর ১টি পরিত্যক্ত ম্যাচ, ৭ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে থেকে শেষ হয় জিম্বাবুয়ের বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব। ২০২৪ বিশ্বকাপ তাই স্মরণীয় হয়ে থাকবে জিম্বাবুয়ের পারফরম্যান্সের জন্যই।

আরও পড়ুন