শুধু রাত গড়ানোর অপেক্ষা। এরপরেই মাঠে গড়াবে ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের ২৩তম আসর বসতে যাচ্ছে তিন দেশে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে যৌথ আয়োজনের এ এক অনন্য রেকর্ড। তবে আজকের গল্পটা বিশ্বকাপের ২৩তম আসর নিয়ে নয়। বরং বিশ্বকাপের আগের গল্প। বিশ্বকাপের সর্বজনীন হয়ে ওঠার গল্প।
বিশ্বকাপের সূচনা খুঁজতে আমাদের পাড়ি দিতে হবে বিংশ শতাব্দীর একদম শুরুতে—১৯০০ সালে অনুষ্ঠিত অলিম্পিকের দ্বিতীয় আসরে। প্যারিসে অনুষ্ঠিত সে আসরে প্রথমবারের মতো ‘আন অফিশিয়াল স্পোর্টস’ হিসেবে জায়গা করে নেয় ফুটবল। অলিম্পিকে ফুটবলের সাফল্য দেখে ১৯০৪ সালের ২১ মে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে সাত দেশ নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফেডারেল ইন্টারন্যাশনাল দে ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন’ বা ফিফা। দেশগুলো ছিল বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। সর্বসম্মতিক্রমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ফরাসি সাংবাদিক রবার্ট গুয়েরিন। তখন পর্যন্ত ফিফার কার্যক্রম আটকে ছিল কাগজে–কলমেই। ব্রিটিশদের বাদ দিয়ে ইউরোপের মাটিতে নতুন কিছু শুরু করা ছিল অনেকটা আমড়া কাঠ দিয়ে ঢেঁকি তৈরির মতোই। ভেঙে পড়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।
পরের বছরই সে মাথাব্যথার অবসান ঘটায় স্বয়ং ইংল্যান্ড। ১৯০৫ সালের ১৪ এপ্রিল ইংল্যান্ড যোগ দেয় ফিফায়। ইংল্যান্ডের পদচিহ্ন অনুসরণ করে যোগ দেয় স্কটল্যান্ড, ওয়েলস, আয়ারল্যান্ড। অন্যদিক থেকে জার্মানি, ইতালি, হাঙ্গেরির মতো দলও যোগ দিতে থাকে ফিফার সঙ্গে। আস্তে আস্তে ডানা মেলতে থাকে নিজেদের একটা টুর্নামেন্টের স্বপ্ন। ১৯০৫ সালে অনুষ্ঠিত হয় ফিফার সম্মেলন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, ১৯০৬ সালে প্রথমবারের মতো মাঠে গড়াবে ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট।
কিন্তু শুরুর আগেই মুখ থুবড়ে পড়ে সে প্রজেক্ট। এতটাই বাজেভাবে মুখ থুবড়ে পড়ে যে ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে পদত্যাগ করেন ফিফা প্রেসিডেন্ট রবার্ট গুয়েরিন। অন্যদিকে ১৯০৮ সালে লন্ডন অলিম্পিকে ‘অফিশিয়াল স্পোর্টস’ হিসেবে নাম লেখায় ফুটবল। ফলে ফিফার টুর্নামেন্টের চেয়ে অলিম্পিককেই বেশি প্রাধান্য দিতে থাকে দলগুলো। নিজেদের অস্তিত্ব–সংকটে ফেলা এক সিদ্ধান্তের যোগ্য জবাব ছুড়ে দেয় ফিফা। ১৯০৯ সালে স্যার থমাস লিপটন তুরিনে আয়োজন করেন একটি বহুজাতিক টুর্নামেন্টে। ইতালি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও ইংল্যান্ড থেকে একটি ক্লাব নিয়ে আয়োজন করা হয় ‘লিপটন ট্রফি’। চার ম্যাচের টুর্নামেন্ট জিতে নেয় ইংলিশ ক্লাব ওয়েস্ট অকল্যান্ড। সেটাই ছিল ফুটবল ইতিহাসে প্রথম বহুজাতিক টুর্নামেন্ট। যার পথ ধরেই পূর্ণতা পেয়েছে আজকের বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো মেগা টুর্নামেন্ট। যে কারণে অনেকেই লিপটন ট্রফিকে ফুটবলের প্রথম বিশ্বকাপ হিসেবে গণ্য করেন।
দুই বছর পর একই জায়গাতে বসে টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় আসর। টানা দ্বিতীয়বারের মতো লিপটন ট্রফি জিতে নেয় ওয়েস্ট অকল্যান্ড। কিন্তু এত কিছুর পরও অলিম্পিকের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উঠতে পারছিল না ফিফা। ১৯১৪ সালে অলিম্পিক ফুটবলকে স্বীকৃতি দেয় ফিফা। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে বাতিল হয়ে যায় ১৯১৬ বার্লিন অলিম্পিক। তাই ১৯২০ অ্যান্টওয়ার্প অলিম্পিকে প্রথমবারের মতো ফিফা স্বীকৃত অলিম্পিক ফুটবল অনুষ্ঠিত হয়। ১৩ দলের সে অলিম্পিক ফুটবল পদক জিতে নেয় স্বাগতিক বেলজিয়াম।
১৯২১ সালের ১ মার্চ ফিফা প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন সাবেক ফরাসি সেনাপ্রধান মঁসিয়ে জুলে রিমে। শপথ নেওয়ার পর থেকেই তাঁর ইচ্ছা ছিল, নিজেদের একটা টুর্নামেন্ট আয়োজনের। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আঁচ তখনো ইউরোপের ওপর থেকে কাটেনি। এই সময়ে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখাটাই পাগলামি। কিন্তু মনের ভেতর জন্ম নেওয়া স্বপ্নকে কি সহজে মেরে ফেলা যায়? একদিকে অলিম্পিকের একের পর এক সাফল্য, অন্যদিকে ফিফা থেকে ইংল্যান্ড, ব্রাজিল ও উরুগুয়ের পদত্যাগ—সব মিলিয়ে সময়টা ভালো যাচ্ছিল না ফিফার। কিন্তু জুলে রিমে অপেক্ষায় ছিলেন একটা সুযোগের। চাইছিলেন বিশ্বকাপের প্রস্তাব আবারও সবার সামনে তুলে আনার। সেই সুযোগ করে দিল অলিম্পিক কমিটিই। ১৯২৭ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি সিদ্ধান্ত নেয় পরবর্তী অলিম্পিক, অর্থাৎ ১৯৩২ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে থাকবে না ফুটবল। কারণ, আমেরিকায় ফুটবল খেলাটা তেমন জনপ্রিয় নয়। তাই সে বছর ফুটবলকে বাদ দিয়েই শুরু হয় অলিম্পিকের প্রস্তুতি।
জুলে রিমের জন্য এটা ছিল মোক্ষম সুযোগ। এমন কিছুর অপেক্ষাতেই ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটির সঙ্গে এক দফা তর্কবিতর্কের পরই জুলে রিমে সিদ্ধান্ত নিলেন, এবার যে করেই হোক নিজেদের টুর্নামেন্ট আয়োজন করতেই হবে। ২৮ মে ১৯২৮ নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে প্রথমবারের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, মাঠে গড়াবে ফিফার নিজস্ব টুর্নামেন্ট। এ যেন ফুটবলের অলিম্পিক।
১৯৩০ বিশ্বকাপের জন্য আগ্রহ দেখিয়েছিল মোট চারটি ইউরোপিয়ান দেশ। কিন্তু ইতালি ও স্পেনের মতো হেভিওয়েটদের পাশে রেখে প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপের ভেন্যু ঠিক করা হলো উরুগুয়েকে। পরপর দুই অলিম্পিক জয়, সেই সঙ্গে স্বাধীনতার শতবর্ষ উদ্যাপন, সব মিলিয়ে উরুগুয়ে ছিল বিশ্বকাপের জন্য মোক্ষম মঞ্চ।
২৬ বছরের স্বপ্ন এখন হাতের মুঠোয়। অপেক্ষা শুধু বল মাঠে গড়ানোর। অলিম্পিককে দেখিয়ে দেওয়ার মিশন থেকে যে টুর্নামেন্টের সূচনা, কে জানত, সেই টুর্নামেন্ট একদিন ছাড়িয়ে যাবে সব রেকর্ড!
রাত গড়ালেই সেই বিশ্বকাপের ২৩তম আসর গড়াবে মাঠে। সেই বিশ্বকাপের আগে ৫০ দিন ধরে আমাদের আয়োজন তো পড়লে, এখন চোখ রাখো টিভির পর্দায়, দেখো বিশ্বকাপের আমেজ ঠিক কতটা মজাদার।