বিশ্বযুদ্ধের দামামায় ইতালির বিশ্বজয়

১৯৩৮ বিশ্বকাপের পোস্টার

চার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই পুরোপুরি বদলে গেল ইউরোপের চিত্র। দ্বিতীয় বিশ্বকাপের সময় ইউরোপে ছোট ছোট করে দানা বাঁধতে থাকা ফ্যাসিজম টুঁটি চেপে ধরল বিশ্বের। একদিকে অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি জার্মানি, অন্যদিকে ফ্যাসিজমের জনক বেনিতো মুসোলিনির ইতালি। দুজনের মিলিত শক্তির ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত পুরো ইউরোপবাসী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজল বলে। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে নাকের ডগায় রেখে শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা নিয়ে শুরু হলো তৃতীয় বিশ্বকাপের যাত্রা।

১৯৩৪ ইতালি বিশ্বকাপ ও ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিক—বিশ্বের সবচেয়ে বড় দুটি ক্রীড়া ইভেন্টই ছিল নানা সমালোচনায় সমালোচিত। বিশেষ করে স্বৈরাচারী শাসকদের সরাসরি হস্তক্ষেপের কারণে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হতে হয়েছে ফিফা ও অলিম্পিক কমিটিকে। সে সময় অবশ্য ইউরোপে ফ্যাসিজমের বিপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসও ছিল না কারোর। দিন দিন আরও বাড়ছিল তাদের প্রভাব। যে কারণে ১৯৩৬ সালে বার্লিনে ফিফার সাধারণ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এমন কোনো দেশকেই আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হবে, যাদের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব নেই বললেই চলে।

সব শঙ্কা ও সংশয় কাটিয়ে স্বাগতিক দেশ হিসেবে ১৯৩৮ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া হয় ফ্রান্সকে। পরপর দুবার বিশ্বকাপ আয়োজনের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও হতাশ হয়ে ফিরতে হয় ফরাসিদের। কিন্তু ইউরোপের রাজনৈতিক দুরবস্থায় কপাল খুলে যায় ফ্রান্সের। আর্জেন্টিনা ও জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পায় ফ্রান্স। পূরণ হয় ফিফা সভাপতি জুলে রিমের নিজ দেশে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বপ্ন। অন্যদিকে, ইউরোপের দুরবস্থাতেও বিশ্বকাপ উত্তর আমেরিকায় না আসাতে আবারও বিশ্বকাপ বয়কট করে উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনা।

১৯৩৪ বিশ্বকাপের ফরম্যাটেই আস্থা রাখে ফিফা। ১৬টি দেশ, নকআউট ফরম্যাটে খেলা হবে পুরো বিশ্বকাপ। তবে প্রথমবারের মতো বাছাইপর্বে পরিবর্তন আনে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। স্বাগতিক ও ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন দলকে সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট দেওয়া হয় প্রথমবারের মতো। ফলে, সরাসরি বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায় ফ্রান্স ও ইতালি।

বাকি ১৪ দলের বাছাইপর্বকে ৩টি ভাগে ভাগ করা হয়। ইউরোপ থেকে ১১টি, আমেরিকা থেকে ২টি এবং এশিয়া থেকে ১টি। আমেরিকা থেকে বিশ্বকাপে অংশ নেয় ব্রাজিল, কিউবা এবং এশিয়া থেকে অংশ নেয় ‘ডাচ ইস্ট ইন্ডিজ’। নেদারল্যান্ডসের উপনিবেশে থাকা বর্তমান ইন্দোনেশিয়া সে সময় ডাচদের নাম ব্যবহার করে অংশ নেয় বিশ্বকাপে। এশিয়া থেকে প্রথমবারের মতো কোনো দল অংশ নেয় বিশ্বকাপে।

১৯৩৮ বিশ্বকাপের অফিসিয়াল বল ‘ফেডারেল’

বিশ্বকাপ যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল, ততই বাড়তে থাকল বিশ্বযুদ্ধের দামামা। বিশ্বকাপ শুরুর আগমুহূর্তে দুঃসংবাদ নিয়ে এল অস্ট্রিয়া। ১২ মার্চ অস্ট্রিয়া দখল করে জার্মানি ও অস্ট্রিয়াকে একত্র করার ঘোষণা দেন হিটলার। সেই সঙ্গে বিশ্বকাপ থেকে সরিয়ে নেন অস্ট্রিয়ার নাম; যদিও খেলোয়াড়দের সুযোগ দেওয়া হয়—চাইলে তারা জার্মান পতাকাতলে বিশ্বকাপ খেলতে পারে। কিছু অস্ট্রিয়ান সে দাবি মেনেও নিয়েছিলেন।

বাছাইপর্বে অস্ট্রিয়ার গ্রুপে দ্বিতীয় হওয়া লাটভিয়া জোর দাবি জানিয়েছিল বিশ্বকাপে খেলার। কিন্তু তাদের দাবিকে অগ্রাহ্য করে কাগজে–কলমে ১৬ দল থাকলেও আদতে ১৫ দল নিয়েই বিশ্বকাপ শুরু করে ফিফা। আর ভাগ্যবান দেশ হিসেবে সরাসরি কোয়ার্টার ফাইনাল খেলার সুযোগ পায় সুইডেন।

ইতালির প্রতি ম্যাচেই দেখা মিলত ফ্যাসিস্ট স্যালুটের

ইতালি ও জার্মানির জন্য এই বিশ্বকাপ যতটা না ছিল খেলার, তার থেকে ছিল নিজের আধিপত্য ও ধ্যানধারণা বিশ্বের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ। প্রথম পর্বে হেরে জার্মানি বাদ পড়লেও গত বিশ্বকাপের ফর্ম ধরে রাখে ইতালি। সেই সঙ্গে প্রতি ম্যাচের আগে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার দায়িত্বও ছিল তাদের ওপর। প্রতি ম্যাচেই দেখা মিলত ফ্যাসিস্ট স্যালুটের। এর মধ্যেই নরওয়ে, ফ্রান্স, ব্রাজিলকে হারিয়ে ইতালি নিশ্চিত করে ফাইনাল। কোয়ার্টার ফাইনালে ইতালির কাছে হেরে ‘স্বাগতিক মানেই বিশ্বজয়’ ধারায় ছেদ ফেলে ফ্রান্স। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড ও সুইডেনকে হারিয়ে ফাইনাল নিশ্চিত করে হাঙ্গেরি।

ফাইনালের আগে ইতালির খেলোয়াড়দের উদ্দেশে এক চিরকুট পাঠিয়েছিলেন মুসোলিনি। তাতে লেখা ছিল ‘হয় জেতো, নয়তো মরো’। যদিও খেলোয়াড়েরা তা অস্বীকার করেন, কিন্তু দিন শেষে দ্বিতীয় বিকল্পকেই বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। প্যারিসের স্টাদে অলিম্পিক ডি কলম্বেসে অনুষ্ঠিত দুর্দান্ত এক ফাইনালে হাঙ্গেরিকে ৪-২ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি। ফাইনালে জোড়া গোল করেছিলেন ইতালির জিনো কোলাউসি ও সিলভিও পিওলা।

টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ইতালি

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে সেটাই ছিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। পুরো বিশ্ব মেতে ওঠে রক্তাক্ত এক লীলাখেলায়। জাতপাত, ধর্মনির্বিশেষে সবাই মেতে ওঠে রক্তের নেশায়। একজন মানুষের বিশ্ব শাসন করার ইচ্ছাতে থমকে যায় পুরো পৃথিবী। ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরও থমকে যায় ১২ বছরের জন্য।