ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে কে এগিয়ে
আর মাত্র কয়েক দিন। ২৬ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ীর নাম। ফুটবলে ব্যক্তিগত অর্জনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারগুলোর একটি এই ব্যালন ডি’অর। গতবার পুরস্কার জিতেছিলেন ফ্রান্স ও পিএসজির ফরোয়ার্ড উসমান দেম্বেলে। এবার তাঁর জায়গায় কে বসবেন, তা নিয়ে চলছে আলোচনা।
এবারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় আছেন ৩০ জন ফুটবলার। তাঁদের মধ্যে আছেন দেম্বেলে নিজেও, আছেন লিওনেল মেসিও। তবে পুরস্কার জয়ের দৌড়ে এগিয়ে আছেন বায়ার্ন মিউনিখের হ্যারি কেইন ও মাইকেল ওলিসে। আছেন বার্সেলোনার তরুণ তারকা লামিনে ইয়ামাল।
ব্যালন ডি’অরজয়ী নির্বাচন করেন ১০০ জন সাংবাদিক। তাঁরা ফুটবলারদের ১ থেকে ১০ পর্যন্ত নম্বর দেন। ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলের সাফল্যে খেলোয়াড়ের অবদান, জেতা শিরোপা এবং মাঠে ও মাঠের বাইরে খেলোয়াড়ের আচরণ এখানে বিবেচনা করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এটি বিচারকদের ব্যক্তিগত মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল একটি পুরস্কার। তাই কে সেরা, তা নিয়ে বিতর্ক থাকেই।
পুরস্কারটি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো বারবার ব্যালন ডি’অর জেতা দুই কিংবদন্তি ফুটবলারই ক্যারিয়ার শেষের দিকে। নতুন প্রজন্মের কেউ এবার তাঁদের কাতারে জায়গা করে নিতে পারবেন কি না, সেটাও দেখার বিষয়।
আরেকটি ব্যাপার আছে। পুরস্কার ঘোষণার ঠিক আগের সময়ের পারফরম্যান্স অনেক সময় ভোটারদের মনে বেশি প্রভাব ফেলে। একে বলা হয় সাম্প্রতিক ঘটনার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রবণতা। ব্যালন ডি’অরের হিসাবের সময়সীমা গত বছরের আগস্ট থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত। অর্থাৎ ২০২৫-২৬ মৌসুমের ক্লাব ফুটবলের পাশাপাশি বিশ্বকাপের পারফরম্যান্সও বিবেচনায় আসছে। কিন্তু নতুন মৌসুমে কে কেমন খেলছেন, সেটাও আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। এ কারণেই বাজির বাজারে লামিনে ইয়ামালকে এগিয়ে রাখা হচ্ছে।
৯ সেপ্টেম্বর করা দ্য অ্যাথলেটিকের আগের র্যাঙ্কিংয়ে ইয়ামালের অবস্থান ছিল সপ্তম। এবার তিনি উঠে এসেছেন ৩ নম্বরে। তবে এই তালিকায় শীর্ষে আছেন অন্য একজন। চলুন, দেখে নেওয়া যাক ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর জয়ের দৌড়ে এগিয়ে থাকা সেরা ১০ ফুটবলারকে।
১. হ্যারি কেইন
বায়ার্ন মিউনিখ ও ইংল্যান্ড
২০২৫-২৬ মৌসুমটা হ্যারি কেইনের ক্যারিয়ারের সেরা মৌসুমগুলোর একটি। শুধু গোলের সংখ্যার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, কেন তাঁকে এবার ব্যালন ডি’অরের সবচেয়ে বড় দাবিদার মনে করা হচ্ছে।
বুন্দেসলিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি করেছেন ৫৬ গোল, সঙ্গে ৮টি অ্যাসিস্ট। এর বাইরে বায়ার্নের হয়ে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় আরও ১১ গোল করেছেন। ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে করেছেন আরও ৬ গোল। সব মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তাঁর গোলের সংখ্যা ৭৩। অর্থাৎ প্রতি ম্যাচে গড়ে একটির বেশি গোল করেছেন কেইন।
তবে শুধু সংখ্যার জন্যই নয়, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচেও নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার। চ্যাম্পিয়নস লিগের নকআউট পর্বের ৫ ম্যাচে করেছেন ৬ গোল। জার্মানির ঘরোয়া কাপ ডিএফবি-পোকালের ফাইনালে করেছেন হ্যাটট্রিক।
বিশ্বকাপেও দারুণ খেলেছেন কেইন। শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে ডিআর কঙ্গোর বিপক্ষে তাঁর দুটি অসাধারণ গোল ইংল্যান্ডকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে। পরের রাউন্ডে মেক্সিকোর বিপক্ষে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থকে দিয়ে গোলও করিয়েছেন তিনি।
তবে কেইনের সামনে কিছু বাধাও আছে। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সেমিফাইনালে তাঁকে খুব একটা খুঁজে পাওয়া যায়নি। চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনালে পিএসজির বিপক্ষে গোলের বন্যা বইলেও শেষ পর্যন্ত বায়ার্নের বিদায় নিতে হয়। বড় দুটি প্রতিযোগিতার শেষ দিকে দলের ব্যর্থতা তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
তারপরও পুরো মৌসুমে কেইনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। দল সব বড় শিরোপা না জিতলেও একজন খেলোয়াড় কতটা ধারাবাহিকভাবে গোল করতে পারেন, তার বড় উদাহরণ তিনি।
নতুন মৌসুমেও তাঁর গোল করার গতি কমেনি। ২০২৬-২৭ মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল। ইংল্যান্ডের হয়ে নেশনস লিগের ৪ ম্যাচে করেছেন আরও ৬ গোল। কেইনের বয়স এখন ৩৩। এত গোল, এত ধারাবাহিকতা, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে এমন পারফরম্যান্স—সব মিলিয়ে এবার ব্যালন ডি’অর জেতার দারুণ সুযোগ তাঁর সামনে। এবারও যদি না হয়, তাহলে আর কবে?
২. মাইকেল ওলিসে
বায়ার্ন মিউনিখ ও ফ্রান্স
হ্যারি কেইনের সতীর্থ মাইকেল ওলিসেও ব্যালন ডি’অর জয়ের বড় দাবিদার। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অসাধারণ।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের খেলোয়াড়দের মধ্যে পেনাল্টি বাদ দিয়ে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে তাঁর চেয়ে বেশি অবদান কেউ রাখতে পারেননি। লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও বিশ্বকাপ মিলিয়ে ৫৩ ম্যাচে করেছেন ২০ গোল, সঙ্গে ৩২টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ গোল করেছেন ২০টি, আর সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ৩২টি।
বিশ্বকাপে তাঁর অ্যাসিস্টের সংখ্যা ছিল ৭। এক আসরে সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট করার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি। ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে আরও ৫ গোল করেছেন ওলিসে। এর মধ্যে উত্তর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে একটি হ্যাটট্রিকও ছিল।
ওলিসের খেলার ধরনও চমৎকার। মাঠে স্বাধীনভাবে খেলতে পারেন তিনি। কখন কোথায় পাস দিতে হবে, কখন নিজে আক্রমণে যেতে হবে, সেটাও ভালো বোঝেন। তাঁর খেলায় ঝুঁকি নেওয়ার সাহস আছে, কিন্তু সেটা দায়িত্বজ্ঞানহীন নয়। বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই তাঁকে আলাদা করেছে।
মাঠের মাঝখান থেকে আক্রমণ গড়ে তোলা, খোলা জায়গায় পাস দেওয়া, সেটপিস থেকে সুযোগ তৈরি করাতে দক্ষ ওলিসে। শুধু আক্রমণ নয়, রক্ষণেও দলের কাজে আসেন। বল পায়ে নিয়ে প্রতিপক্ষের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন, আবার প্রয়োজন হলে বল কেড়ে নেওয়ার চেষ্টাও করেন।
বায়ার্ন ও ফ্রান্সের হয়ে বেশির ভাগ ম্যাচেই তিনি দলের সেরা কিংবা দ্বিতীয় সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। তাঁর পারফরম্যান্সে বোঝা গেছে, আধুনিক ফুটবলে একজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়কে শুধু গোল করলেই চলে না। সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করা এবং দলের সামগ্রিক খেলায় অবদান রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কেইনের মতো ওলিসেরও সমস্যা আছে। সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতাগুলোতে দল প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ব্যালন ডি’অর ভোটাররা ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বড় শিরোপাকেও গুরুত্ব দেন। তাই তাঁর অসাধারণ পরিসংখ্যান সত্ত্বেও পুরস্কার জেতা সহজ হবে না।
নতুন মৌসুমে বায়ার্নের হয়ে ১০ ম্যাচে ৯ গোল করেছেন ওলিসে। ফ্রান্সের হয়ে ৪ ম্যাচে করেছেন আরও ৪ গোল। অর্থাৎ গত মৌসুমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পরও তিনি ছন্দ ধরে রেখেছেন।
কেইন যদি গোল করার জন্য সবার নজর কাড়েন, ওলিসে নজর কাড়েন গোল করা ও করানো—দুই ক্ষেত্রেই। ব্যালন ডি’অর জয়ের লড়াইয়ে তাই তাঁকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
৩. লামিনে ইয়ামাল
বার্সেলোনা ও স্পেন
সদ্য কৈশোর পেরিয়েছেন লামিনে ইয়ামাল। অথচ বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের পুরস্কার ব্যালন ডি’অর জয়ের আলোচনায় তাঁর নাম জোরেশোরেই উচ্চারিত হচ্ছে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের খেলায় আরও উন্নতি করেছেন এই স্প্যানিশ তারকা।
২০২৪-২৫ মৌসুমে লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৮ ম্যাচে ১৪ গোল ও ১৬টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন ইয়ামাল। পরের মৌসুমে মাত্র ৩৮ ম্যাচে করেছেন ২২ গোল, সঙ্গে ১৫টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ ম্যাচের সংখ্যা কমলেও গোলের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতাও আরও ধারালো হয়েছে।
তবে পুরো মৌসুম চোটমুক্ত থাকতে পারেননি ইয়ামাল। মৌসুমের শুরু থেকেই তাঁকে ভুগিয়েছে ইনজুরি। ইনজুরির প্রভাব পড়েছে বিশ্বকাপেও।
বিশ্বকাপে ইয়ামাল মাত্র একটি গোল করেন, সৌদি আরবের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেমিফাইনালে একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন। তবে উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তাঁকে ঘিরে যে প্রত্যাশা ছিল, সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ করতে পারেননি তিনি।
তারপরও ইয়ামালকে নিয়ে এত আলোচনা হওয়ার কারণ আছে। তাঁর বয়স এখন মাত্র ১৯। এই বয়সেই বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছেন তিনি। ড্রিবলিং, দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া, ছোট জায়গায় বল নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক খুঁজে বের করার ক্ষমতা তাঁকে বিশেষ করে তুলেছে।
ব্যালন ডি’অর জেতার দৌড়ে এবার তিনি ৩ নম্বরে থাকলেও পরের বছরের পুরস্কারের জন্য তাঁকে আগাম দাবিদার মনে করা হচ্ছে। নতুন মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে মাত্র ১১ ম্যাচে করেছেন ৯ গোল ও ১০টি অ্যাসিস্ট। স্পেনের হয়ে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক বিরতিতে ৪ ম্যাচে করেছেন আরও ৪ গোল।
এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, ইয়ামাল আবারও নিজের সেরা ছন্দে ফিরছেন। তবে এবারের পুরস্কারের ক্ষেত্রে তাঁর বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স কিছুটা পিছিয়ে দিতে পারে তাঁকে। অন্যদিকে, ভোটারদের মনে নতুন মৌসুমের দুর্দান্ত শুরু বড় প্রভাব ফেললে তাঁর সম্ভাবনাও বাড়বে।
এবার ব্যালন ডি’অর না জিতলেও ইয়ামালের সামনে সময় আছে। তাঁর বয়স বিবেচনা করলে, ভবিষ্যতে এই পুরস্কার জেতার সুযোগ আরও অনেকবার আসবে।
৪. কিলিয়ান এমবাপ্পে
রিয়াল মাদ্রিদ ও ফ্রান্স
কিলিয়ান এমবাপ্পে আবারও দারুণ একটি বিশ্বকাপ খেলেছেন। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জিতেছেন তিনি। বিশ্বকাপের ফাইনাল পর্বে তাঁর মোট গোল এখন ২২টি। এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা তিনি। ২২ ম্যাচে ২২ গোলের রেকর্ডই বলে দেয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনি কতটা ভয়ংকর।
ফ্রান্সের হয়ে এমবাপ্পের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি রিয়াল মাদ্রিদের হয়েও ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪২ ম্যাচে করেছেন ৪০ গোল।
রিয়াল মাদ্রিদের মৌসুমটা অবশ্য খুব একটা ভালো কাটেনি। কোচ হিসেবে শুরুতে ছিলেন জাবি আলোনসো, পরে দায়িত্ব নেন আলভারো আরবেলোয়া। দলের ভেতরে নানা সমস্যা ও অস্থিরতার মধ্যে অনেক ম্যাচেই এমবাপ্পে ছিলেন দলের সবচেয়ে উজ্জ্বল খেলোয়াড়।
তবু ফুটবল শুধু ব্যক্তিগত গোলের খেলা নয়। দল কী জিতল, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। রিয়াল মাদ্রিদ টানা দ্বিতীয় মৌসুমে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেনি। অন্যদিকে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের অবস্থান ছিল চতুর্থ। এমবাপ্পের ব্যক্তিগত সাফল্য অসাধারণ হলেও এই দুই ব্যর্থতা তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা কমিয়ে দিতে পারে।
নতুন মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন জোসে মরিনিও। তাঁর অধীনেও এমবাপ্পে গোল করা অব্যাহত রেখেছেন। ১১ ম্যাচে করেছেন ১১ গোল। কিন্তু দলের কৌশলগত সমস্যা ও মাঠে খেলোয়াড়দের অবস্থান নিয়ে জটিলতা পুরোপুরি কাটেনি।
এমবাপ্পে এমন একজন খেলোয়াড়, যিনি একাই ম্যাচের ফল বদলে দিতে পারেন। কিন্তু ব্যালন ডি’অর জিততে শুধু গোল করাই যথেষ্ট হবে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
৫. রদ্রি
ম্যানচেস্টার সিটি/বার্সেলোনা ও স্পেন
রদ্রির ২০২৫-২৬ মৌসুমকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। মৌসুমের শুরুতে তিনি ছিলেন ইনজুরি থেকে ফেরা একজন খেলোয়াড়। আর বছরের শুরু থেকে ধীরে ধীরে দেখা গেছে সেই রদ্রিকে, যিনি মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পুরো দলের খেলার ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন।
হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুশিয়েট লিগামেন্ট ছিঁড়ে যাওয়ায় আট মাস মাঠের বাইরে ছিলেন রদ্রি। ফিরে এসে শুরুতে ছন্দ খুঁজে পেতে সমস্যা হয়। হ্যামস্ট্রিং ও হাঁটুর সমস্যাও তাঁকে ভুগিয়েছে। ম্যানচেস্টার সিটির প্রিমিয়ার লিগের প্রথম ১৭ ম্যাচের ১১টিতেই খেলতে পারেননি তিনি।
২০২৬ সালের শুরু থেকে ধীরে ধীরে নিজের পুরোনো রূপে ফিরতে থাকেন এই স্প্যানিশ মিডফিল্ডার। পেপ গার্দিওলার ম্যানচেস্টার সিটির শেষ মৌসুমে দলটি আগের চেয়ে সরাসরি আক্রমণ এবং দ্রুত বল আদান-প্রদানের ওপর বেশি জোর দিয়েছিল। সেই কৌশলে রদ্রির ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মার্চ ও এপ্রিলে আর্সেনালের বিপক্ষে লিগ ও কারাবাও কাপের ফাইনালে জেতে সিটি। দুটি ম্যাচেই রদ্রি ছিলেন দুর্দান্ত। চেলসির বিপক্ষে এফএ কাপের ফাইনালেও অসাধারণ খেলেন তিনি। মাঝখানে কুঁচকির সমস্যায় ভুগলেও বিশ্বকাপের আগে নিজের ছন্দ ফিরে পান।
বিশ্বকাপে স্পেনের হয়ে রদ্রি ছিলেন দলের খেলার মূল নিয়ন্ত্রক। শৃঙ্খলাপূর্ণ ও প্রতিভাবান স্পেন দল শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে। রদ্রি নিজেও টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার গোল্ডেন বল জেতেন।
এই অর্জন ব্যালন ডি’অরের হিসাবেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, বিশ্বকাপের মতো বড় প্রতিযোগিতায় দলের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এবং নিজে সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হওয়া—দুটিই ভোটারদের কাছে বড় অর্জন।
তবে তাঁর মৌসুমের মোট খেলার সময় খুব বেশি ছিল না। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে তিনি খেলেছেন ২ হাজার ১৮৫ মিনিট। পুরো ৯০ মিনিটের ম্যাচ হিসেবে হিসাব করলে ২৪টির একটু বেশি ম্যাচের সমান। চোটের কারণে এত কম সময় খেলেও বিশ্বকাপে এমন পারফরম্যান্স দেখানো তাঁর কৃতিত্ব।
এখন বার্সেলোনার হয়ে খেলছেন রদ্রি। কাতালোনিয়ার ক্লাবটিতেও মানিয়ে নিয়েছেন ভালোভাবে। গত সপ্তাহে রিয়াল বেতিসের বিপক্ষে ৫-২ গোলের জয়ে বার্সেলোনার হয়ে নিজের প্রথম গোল করেছেন তিনি।
রদ্রির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তাঁকে দেখে সব সময় বোঝা যায় না তিনি কতটা গুরুত্বপূর্ণ। তিনি হয়তো প্রতিটি ম্যাচে গোল করবেন না, চোখধাঁধানো ড্রিবলিংও দেখাবেন না। কিন্তু মাঝমাঠে তাঁর সিদ্ধান্ত, পাস ও খেলার গতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পুরো দলকে বদলে দিতে পারে। বিশ্বকাপের সাফল্য তাঁকে এবার ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় অনেকটাই এগিয়ে দিয়েছে।
৬. আর্লিং হালান্ড
ম্যানচেস্টার সিটি ও নরওয়ে
ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে নিজের দ্বিতীয় সেরা মৌসুম কাটিয়েছেন আর্লিং হালান্ড। প্রিমিয়ার লিগে করেছেন ২৭ গোল। তবে এবার শুধু গোল করেই থেমে থাকেননি নরওয়ের এই স্ট্রাইকার। সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও উন্নতি করেছেন।
লিগে আটটি অ্যাসিস্ট করেছেন হালান্ড। আগের দুই মৌসুম মিলিয়েও তিনি এতগুলো অ্যাসিস্ট করেছিলেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে করেছেন আরও আট গোল। এফএ কাপ জেতার পথেও সিটির হয়ে তিনটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর। সব মিলিয়ে ক্লাবের হয়ে ৫২ ম্যাচে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে অবদান রেখেছেন ৪৭ গোলে।
নরওয়ের হয়েও তাঁর গোলের সংখ্যা ছিল অবিশ্বাস্য। বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে সাত ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল। মলদোভার বিপক্ষে ১১-১ গোলের বিশাল জয়ে একাই করেছেন পাঁচ গোল।
তবে হালান্ডের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জন আসে বিশ্বকাপে। নরওয়েকে কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি ও মার্টিন ওডেগার্ড। ৫ ম্যাচে লক্ষ্যে রাখা ১৩টি শট থেকে ৭ গোল করেন হালান্ড। অর্থাৎ সুযোগ পেলে গোল করতে তিনি ছিলেন ভয়ংকর দক্ষ।
স্টালে সোলবাকেনের নরওয়ে দলটি ছিল রক্ষণে বেশ শক্তিশালী। সেই দলের আক্রমণে হালান্ড ছিলেন সবচেয়ে বড় ভরসা। তাঁর গোলগুলো দলকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এগিয়ে দিয়েছে। সব মিলিয়ে ক্লাব ও জাতীয় দলের হয়ে মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৯।
নতুন মৌসুমেও তাঁর গোলের ধারা অব্যাহত। ম্যানচেস্টার সিটির হয়ে ৯ ম্যাচে করেছেন ১২ গোল। লিগে ৭ ম্যাচ খেলে সিটি এখনো শতভাগ জয়ের রেকর্ড ধরে রেখেছে। নরওয়ের হয়ে ৪ ম্যাচে করেছেন আরও ৩ গোল। আন্তর্জাতিক ফুটবলে তাঁর গোলের সংখ্যা এখন ৫৯ ম্যাচে ৬৫।
হালান্ডের সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর গোল করার ক্ষমতা। বক্সের ভেতরে সঠিক জায়গায় থাকা, সুযোগ বুঝে দৌড় দেওয়া এবং অল্প সময়ের মধ্যে শট নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ। তবে এবার গোলের পাশাপাশি সতীর্থদের জন্য সুযোগ তৈরি করার ক্ষমতাও দেখিয়েছেন।
ব্যালন ডি’অর জিততে হলে বড় প্রতিযোগিতায় দলের সাফল্য গুরুত্বপূর্ণ। নরওয়েকে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে নিয়ে যাওয়া এবং সিটির হয়ে ধারাবাহিক গোল করার কৃতিত্ব তাঁকে এই তালিকায় জায়গা করে দিয়েছে।
৭. খভিচা কাভারাতসখেলিয়া
পিএসজি ও জর্জিয়া
পিএসজি টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফরাসি লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছে। তবে এই সাফল্যের কৃতিত্ব শুধু আক্রমণভাগের তারকাদের দিলে ভুল হবে। দলের রক্ষণ ও মাঝমাঠও ছিল অসাধারণ। মারকিনিয়োস, উইলিয়ান পাচো, নুনো মেন্দেস, ভিতিনিয়া ও জোয়াও নেভেসের মতো খেলোয়াড়েরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
বিশ্বকাপে তাঁদের কয়েকজনের পারফরম্যান্স অবশ্য খুব একটা ভালো ছিল না। ব্যালন ডি’অরজয়ী উসমান দেম্বেলে বিশ্বকাপে ছয় গোল করলেও চোটের কারণে লিগ ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে দুই হাজার মিনিটের কম খেলেছেন। স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য ফাবিয়ান রুইজও হাঁটুর সমস্যায় অনেক ম্যাচ খেলতে পারেননি।
এই পরিস্থিতিতে জর্জিয়া বিশ্বকাপে জায়গা না পাওয়াটা কাভারাতসখেলিয়ার জন্য একদিক থেকে সুবিধা হয়েছে। জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে খেলতে না হওয়ায় তাঁর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সকে মূলত ক্লাবের সাফল্যের ভিত্তিতে বিচার করা হচ্ছে।
২৫ বছর বয়সী এই উইঙ্গারকে পিএসজিতে নিয়মিত সব ম্যাচে খেলানো হয়নি। লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে খেলেছেন ২ হাজার ৬২৩ মিনিট। তারপরও করেছেন ১৮ গোল ও ১০টি অ্যাসিস্ট। কেইন, ওলিসে বা হালান্ডের মতো গোলের সংখ্যা না হলেও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর অবদান ছিল বড়।
চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ ষোলো ও কোয়ার্টার ফাইনাল মিলিয়ে ৪ গোল করেছেন কাভারাতসখেলিয়া, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট। বায়ার্নের বিপক্ষে সেমিফাইনালে করেছেন আরও দুটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট। আর্সেনালের বিপক্ষে ফাইনালে পিএসজি পিছিয়ে পড়ার পর যে পেনাল্টি থেকে দল সমতায় ফেরে, সেটি আদায় করে নিয়েছিলেন তিনিই।
চ্যাম্পিয়নস লিগের মতো প্রতিযোগিতায় শেষ দিকের ম্যাচগুলোতে এমন পারফরম্যান্সের গুরুত্ব অনেক। বিশ্বকাপের বছরে ব্যক্তিগত পুরস্কারের আলোচনায় জাতীয় দলের সাফল্য বেশি গুরুত্ব পেলেও কাভারাতসখেলিয়ার ক্লাব পারফরম্যান্স উপেক্ষা করা কঠিন।
তবে নতুন মৌসুমের শুরুটা তাঁর বা পিএসজির জন্য খুব একটা ভালো হয়নি। লিগ ওয়ানে সাত ম্যাচের মধ্যে পিএসজি জিতেছে চারটি। কাভারাতসখেলিয়া ১০ ম্যাচে মোট ৫৫৯ মিনিট খেলেছেন, গোল করেছেন মাত্র দুটি এবং অ্যাসিস্ট করেছেন একটি।
নতুন মৌসুমে এমন শুরু তাঁর ব্যালন ডি’অর জয়ের সম্ভাবনা বাড়ানোর বদলে কিছুটা কমিয়ে দিতে পারে। তারপরও চ্যাম্পিয়নস লিগের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে তাঁর অবদান তাঁকে সেরা দশে রাখার যথেষ্ট কারণ।
৮. লুইস দিয়াজ
বায়ার্ন মিউনিখ ও কলম্বিয়া
বায়ার্ন মিউনিখের আক্রমণভাগকে তিন মাথাওয়ালা এক ড্রাগনের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এক মাথায় হ্যারি কেইন, আরেক মাথায় মাইকেল ওলিসে, তৃতীয় মাথায় লুইস দিয়াজ। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ভিনসেন্ট কোম্পানির দলের গোলসংখ্যা ছিল ৫৫ ম্যাচে ১৮৪। এই গোলবন্যার পেছনে তিনজনেরই অবদান ছিল।
কেইন এবং ওলিসে যখন গোল ও অ্যাসিস্টের জন্য আলোচনায়, তখন দিয়াজের কাজ ছিল মাঠের আরেক দিকে। বল হারালে দ্রুত প্রতিপক্ষের ওপর চাপ তৈরি করা, বল দখলে আনতে সাহায্য করা এবং আক্রমণে জায়গা তৈরি করার কাজ তিনি নিরলসভাবে করেছেন। তাঁর পরিশ্রমের ফলে সতীর্থদের আক্রমণ সাজানো সহজ হয়েছে।
তবে নিজেও গোল ও অ্যাসিস্টে পিছিয়ে ছিলেন না। বুন্দেসলিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৪৪ ম্যাচে ২২ গোল করেছেন দিয়াজ, সঙ্গে ১৭টি অ্যাসিস্ট। অর্থাৎ ৩৯টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি।
কলম্বিয়ার হয়ে বিশ্বকাপটা অবশ্য কঠিন কেটেছে। উজবেকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ৩-১ গোলের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেছিলেন দিয়াজ। কিন্তু এরপর দল সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। ফলে বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার যাত্রা প্রত্যাশামতো এগোয়নি।
বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচ মিলিয়ে ১০ ম্যাচে ৩টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করেছিলেন তিনি। নতুন মৌসুমেও ভালো শুরু করেছেন। ক্লাবের হয়ে ৮ ম্যাচে করেছেন ৫ গোল ও একটি অ্যাসিস্ট।
ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় দিয়াজ হয়তো কেইন–বা ওলিসের মতো বেশি নজর কাড়েননি। কিন্তু তাঁর অবদান শুধু গোলের সংখ্যায় মাপা যায় না। দলের আক্রমণকে সচল রাখা এবং বল ছাড়া অবস্থায় পরিশ্রম করে যাওয়ার কারণে তিনি বায়ার্নের সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
৯. জুড বেলিংহাম
রিয়াল মাদ্রিদ ও ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ইংল্যান্ডের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন জুড বেলিংহাম। মেক্সিকোর বিপক্ষে অল্প সময়ের ব্যবধানে ২টি গোল করেন তিনি। এরপর নরওয়ের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে আরও ২টি গোল করেন, যার মধ্যে অতিরিক্ত সময়ে করা গোলটি ছিল জয়সূচক। ফ্রান্সের বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও একটি গোল করেন ২৩ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে তাঁর গোলের সংখ্যা ৭।
তবে বেলিংহামের অবদান শুধু গোল করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি মাঠের বিভিন্ন জায়গায় খেলতে পারেন। কখন সামনে এগিয়ে যেতে হবে, কখন মাঝমাঠে নেমে বল নিতে হবে, কখন সতীর্থের জন্য জায়গা তৈরি করতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নিতে পারেন। তাঁর দৌড় ও অবস্থান নেওয়ার কারণে হ্যারি কেইন অনেক সময় মাঝমাঠের দিকে নেমে এসে আক্রমণ সাজানোর সুযোগ পেয়েছেন।
রক্ষণেও দায়িত্ব পালন করেছেন বেলিংহাম। মেক্সিকো সিটির ম্যাচে ১০ জন নিয়ে খেলতে থাকা ইংল্যান্ডের যখন রক্ষণ সামলাতে হচ্ছিল, তখন তিনিও দলের কাজে নেমে পড়েন। কিন্তু ক্লাবের হয়ে তাঁর মৌসুমটা ভালো কাটেনি। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে এটি ছিল টানা দ্বিতীয় হতাশাজনক মৌসুম। কাঁধের চোট নিয়ে মৌসুম শুরু করার পর ২০২৬ সালের শুরুর দিকে হ্যামস্ট্রিংয়ের সমস্যায় পড়েন তিনি।
চোট ও দলের খারাপ পারফরম্যান্সের প্রভাব পড়েছে তাঁর গোল-অ্যাসিস্টের সংখ্যায়। লা লিগা ও চ্যাম্পিয়নস লিগ মিলিয়ে ৩৭ ম্যাচে করেছেন ৮ গোল ও ৫টি অ্যাসিস্ট। অথচ ২০২৩-২৪ মৌসুমে করেছিলেন ২৩ গোল ও ১১টি অ্যাসিস্ট। তার পরের মৌসুমে সংখ্যাটি ছিল ১২ গোল ও ১১টি অ্যাসিস্ট।
এবারের বিশ্বকাপে অসাধারণ খেলার কারণে ভোটারদের মনে বেলিংহামের নাম ভালোভাবেই থাকতে পারে। তবে ক্লাবের হয়ে পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্স বিচার করলে তাঁর অবস্থান কিছুটা পিছিয়ে যায়।
নতুন মৌসুমে হোসে মরিনিওর অধীনে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ১১ ম্যাচে ৩ গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট করেছেন বেলিংহাম। ইংল্যান্ডের হয়ে আন্তর্জাতিক বিরতিতে ৪ ম্যাচে করেছেন ২টি গোল ও ৩টি অ্যাসিস্ট।
বিশ্বকাপে বেলিংহাম দেখিয়েছেন, বড় মঞ্চে চাপের মধ্যে তিনি কতটা ভালো খেলতে পারেন। কিন্তু ব্যালন ডি’অর জিততে হলে ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই জায়গাতেই ধারাবাহিকতা দরকার। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে পুরস্কার জেতার সম্ভাবনাও বাড়বে।
১০. লিওনেল মেসি
ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনা
লিওনেল মেসি কি এখনো বিশ্বের সেরা ১০ জন ফুটবলারের একজন? ৩৯ বছর বয়সে হয়তো আগের মতো সব প্রতিযোগিতায় সেরা ১০ জনের মধ্যে তাঁকে রাখা কঠিন। কিন্তু এবারের ব্যালন ডি’অরের হিসাবের সময়সীমায় তাঁর পারফরম্যান্স দেখলে তাঁকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়াও কঠিন।
বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়। আর্জেন্টিনার হয়ে তিনি করেছেন ৮ গোল, লক্ষ্যে রাখা শট ছিল ১৮টি। সঙ্গে চারটি অ্যাসিস্টও করেছেন। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে দল ঘুরে দাঁড়ানোর সময় দুটি অ্যাসিস্ট ছিল তাঁর।
গত তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে এক আসরে কোনো খেলোয়াড়ের তৈরি করা সবচেয়ে বেশি গোলের সুযোগও ছিল মেসির। তিনি মোট ২৫টি সুযোগ তৈরি করেছিলেন। শুধু গোল করা নয়, সতীর্থদের গোল করার সুযোগ তৈরি করতেও তিনি যে কতটা দক্ষ, সেটি আবারও প্রমাণ করেছেন।
বেনিনের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে একটি গোল করার পাশাপাশি দীর্ঘদিনের সতীর্থ নিকোলাস ওতামেন্দি এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় নিকো পাজকে দিয়ে গোল করিয়েছেন তিনি। এরপর জাতীয় দল থেকে অবসর নেন মেসি।
ক্লাবের হয়েও তাঁর পারফরম্যান্স ছিল অসাধারণ। এমএলএসে ইন্টার মায়ামির হয়ে মৌসুমের শেষ ১৬ ম্যাচে (প্লে-অফসহ) করেছেন ১৭ গোল ও ১৯টি অ্যাসিস্ট। শেষ পর্যন্ত ইন্টার মায়ামি শিরোপা জেতে। প্রতি ৯০ মিনিটে গড়ে ৫.৫টি শট নিয়েছেন মেসি এবং গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন ৩.৬টি।
২০২৬ সালের এমএলএসের প্রথম ১৪ ম্যাচে করেছেন ১২ গোল ও আটটি অ্যাসিস্ট। এর সঙ্গে লিগস কাপের দুটি ম্যাচে দুটি গোল এবং আর্জেন্টিনার হয়ে বিশ্বকাপের বাছাইপর্ব ও প্রীতি ম্যাচে ছয় ম্যাচে পাঁচ গোল ও তিনটি অ্যাসিস্ট যোগ করলে তাঁর অবদান আরও বড় হয়ে ওঠে।
ব্যালন ডি’অরের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মেসির গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা ৭৮। ৪৪ গোল ও ৩৪টি অ্যাসিস্ট, মাত্র ৪৬ ম্যাচে। বিশ্বকাপ শেষে ফিরে এসে এমএলএসের ১৯ ম্যাচে করেছেন ১৩ গোল ও ৬টি অ্যাসিস্ট। সেপ্টেম্বরে ক্যাম্পেওনেস কাপের ফাইনালে ক্রুজ আজুলের বিপক্ষে ২-০ গোলের জয়ে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করেন।
অবশ্য মেসি যে প্রতিপক্ষদের বিপক্ষে খেলেছেন, তাঁদের কয়েকটি দল এই তালিকার অন্য খেলোয়াড়দের প্রতিপক্ষের তুলনায় দুর্বল ছিল। আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির প্রতিযোগিতার মান নিয়েও আলোচনা হতে পারে। তারপরও তাঁর গোল-অ্যাসিস্টের সংখ্যা এবং বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স তাঁকে সেরা দশে রাখার যথেষ্ট যুক্তি আছে।
মেসি এখন পর্যন্ত আটবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন, যা ইতিহাসে সর্বোচ্চ। নবমবার জেতার সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। কিন্তু এমন একটি বছর, যেখানে বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়েছেন তিনি, সেখানে আরেকটি ব্যালন ডি’অর জিততে পারলে সেটি হবে তাঁর অসাধারণ ক্যারিয়ারের আরও একটি স্মরণীয় অধ্যায়।
তাহলে কে জিতবেন ব্যালন ডি’অর
এবারের তালিকায় হ্যারি কেইনকে এক নম্বরে রাখার বড় কারণ তাঁর গোল করার অসাধারণ ক্ষমতা ও ধারাবাহিকতা। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৭৩ গোল, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল এবং নতুন মৌসুমেও একই ছন্দ; সব মিলিয়ে পুরস্কার জেতার জন্য তাঁর পক্ষে শক্ত যুক্তি আছে।
মাইকেল ওলিসে গোলের পাশাপাশি অ্যাসিস্টেও দুর্দান্ত। তিনি দেখিয়েছেন, একজন আক্রমণাত্মক খেলোয়াড় কীভাবে নিজে গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদেরও গোল করার সুযোগ করে দিতে পারেন। আর লামিনে ইয়ামাল বয়সে তরুণ হলেও তাঁর পারফরম্যান্স ইতিমধ্যে বিশ্বের সেরাদের সঙ্গে তুলনা করার মতো। নতুন মৌসুমে তাঁর দারুণ শুরু তাঁকে আলোচনার কেন্দ্রেও নিয়ে এসেছে।
এমবাপ্পে ও হালান্ডের গোল করার ক্ষমতা, রদ্রির বিশ্বকাপজয়ী পারফরম্যান্স, কাভারাতসখেলিয়ার চ্যাম্পিয়নস লিগে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং মেসির অসাধারণ পরিসংখ্যানও তাঁদের দাবিকে শক্তিশালী করেছে। বেলিংহাম ও দিয়াজের অবদানও উপেক্ষা করার মতো নয়।
তবে ব্যালন ডি’অর শুধু গোলের হিসাব নয়। দলের সাফল্য, বড় ম্যাচে পারফরম্যান্স এবং ভোটারদের মূল্যায়নে হবে। তাই হ্যারি কেইন এগিয়ে থাকলেও শেষ মুহূর্তে লামিনে ইয়ামাল বা মাইকেল ওলিসে তাঁকে পেছনে ফেলে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
২৬ অক্টোবরই জানা যাবে, এবার ফুটবলের ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট উঠছে কার মাথায়।