‘বাজ্জো মারা গিয়েছিলেন দাঁড়িয়ে’

অনেকেই বলে ইতিহাস পরাজিতদের মনে রাখে না। কিন্তু কিছু ইতিহাস এমনভাবেই লেখা হয়, পরাজয়ের কিছু গল্প এমনভাবেই বলা হয় যে বিজয়ীর চেয়ে পরাজিতকে মনে রাখা হয় বেশি। রবার্তো বাজ্জো ইতিহাস গড়েছিলেন পরাজিত হয়েই। যে পরাজয়ে তিনি পরিচিত আফসোসের এক নাম হিসেবে।

১৯৯৪ বিশ্বকাপ আসরটা ছিল রবার্তো বাজ্জোর। গ্রুপ পর্বে ইতালির শুরুই হয়েছিল হার দিয়ে। দ্বিতীয় ম্যাচে জয় আর তৃতীয় ম্যাচে ড্র দিয়ে কোনোমতে বিশ্বকাপের পরের পর্বের টিকিট কাটে ইতালি। এরপরের পুরো আসর ছিল বাজ্জোর ম্যাজিক। নাইজেরিয়ার বিপক্ষে হারতে বসা ম্যাচে শেষ মুহূর্তের গোল, অতঃপর অতিরিক্ত সময়ে গিয়ে পেনাল্টিতে গোল। কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের জয়সূচক গোল, আর সেমিফাইনালে বুলগেরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল। পুরো নক আউট পর্ব ইতালি পার হয়েছিল রবার্তো বাজ্জোর ওপর ভর করে।

নক আউট পর্বের তিন ম্যাচে ইতালি গোলের দেখা পেয়েছিল মাত্র ছয়টি। এর মধ্যে পাঁচটিই করেছিলেন রবার্তো বাজ্জো। মজার ব্যাপার হলো আরেকটা গোল এসেছিল ইতালি দলেরই আরেক বাজ্জোর কাছ থেকে, নাম তাঁর দিনো বাজ্জো। শুধু নামেরই মিল আছে দুজনের, আর কিছুতে নয়। দুই বাজ্জোর দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ইতালিকে পৌঁছে দেয় ১৯৯৪ বিশ্বকাপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে।

নাইজেরিয়ার বিপক্ষে দলকে জেতানোর পর বাজ্জোর উদ্‌যাপন
ছবি: এক্স

ইতালির সামনে তখন সুযোগ নিজেদের চতুর্থ বিশ্বকাপ জেতার। সেটাও আবার তিনবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে হারিয়ে। এর চেয়ে সুবর্ণ সুযোগ আর কী হতে পারে? কিন্তু এর মধ্যেই হানা দিল দুঃসংবাদ। ফাইনালের আগে বাজ্জো পড়লেন হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে। খেলবেন কিনা, এ নিয়েই জল্পনা কল্পনা।

কালিফোর্নিয়ার রোজ বোল স্টেডিয়ামে ১২০ মিনিটের গোলশূন্য লড়াই। ফাইনাল গড়াল টাইব্রেকারে। যে দল জিতবে, সে দলই নাম লেখাবে সর্বোচ্চ বিশ্বজয়ী হিসেবে। ব্রাজিলের হয়ে একে একে গোল করলেন রোমারিও, ব্রাঙ্কো আর দুঙ্গা। অন্যদিকে ইতালির ফ্রাঙ্কো বারেসি আর ড্যানিয়েল মাসারো ততক্ষণে গোল মিস করে বসেছেন। পঞ্চম পেনাল্টি নিতে এগিয়ে আসছেন বাজ্জো, তাঁর ওপরই দায়িত্ব, দলকে আরেকটা সুযোগ এনে দেওয়ার। এমন মুহূর্ত কত এসেছে জীবনে। ‘ডিভাইন পনিটেইল’ কোনো ঘাম না ঝরিয়েই সেসব সামলে নিয়েছেন।

বাজ্জোর শট!
ছবি: এক্স

ঝুঁটি দুলিয়ে বাজ্জো এলেন, রেফারির বাঁশি শুনে এক পা, দুই পা করে দৌড়ে এলেন, অতঃপর শট। ক্লদিও তাফারেল ঝাঁপ দিলেন ভুল দিকে। কিন্তু বাজ্জোর শট ততক্ষণে গোলবার পার হয়ে জায়গা করে নিয়েছে দর্শকসারিতে। তাফারেল ছুটলেন আনন্দে, ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা তাঁর পেছন পেছন। আর বাজ্জো?

‘ম্যান হু ডাইড স্ট্যান্ডিং’
ছবি: এক্স

বাজ্জো দাঁড়িয়ে রইলেন ঠায়। না কোনো অশ্রু ঝরে পড়ল তাঁর চোখ দিয়ে, না তিনি তাকিয়ে দেখলেন কিছু। বাজ্জো মাথা নিচু করে দাঁড়িয়েই থাকলেন। পুরো স্টেডিয়ামে যখন হলুদ জার্সির আনন্দ, তখন বেদনায় নীল হয়ে একা পেনাল্টি স্পটে দাঁড়িয়ে বাজ্জো। বাজ্জো থমকে গিয়েছিলেন সেখানেই।

পরদিন পত্রিকায় বড় বড় অক্ষরে ছাপা হয়েছিল, ‘সক্রেটিস মারা গেছেন হেমলক পানে, নিটশে মতিভ্রমে আর বাজ্জো দাঁড়িয়ে।’ ‘ডিভাইন পনিটেইল’ তাঁর জীবন থামিয়ে দিয়েছিলেন সেই এক মুহূর্তেই। বাজ্জো পরবর্তী সময়ে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘আমি জানতাম তাফারেল আগেই ঝাঁপ দেবে, তাই আমি মাঝামাঝি শট নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বলটি কেন অত উঁচুতে উঠল, আমি আজও জানি না। আমি যখন ছোট ছিলাম, সব সময় স্বপ্ন দেখতাম ব্রাজিলের বিপক্ষে ফাইনাল খেলব এবং গোল করব। কিন্তু সেই স্বপ্ন এভাবে দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরবে ভাবিনি।’

বিশ্বকাপ থেকে হাতছোঁয়া দূরত্বে বাজ্জো
ছবি: এক্স

সেই একটি মিস বাজ্জোকে তাড়া করে বেড়িয়েছে সারা জীবন। ব্যালন ডি’অর জিতে, পৃথিবীর ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হয়ে বাজ্জো পা রেখেছিলেন বিশ্বকাপে। খেলেছিলেনও বিশ্বসেরার মতোই। নক আউট পর্বে পাঁচ গোল, দলকে একা টেনে এনে ফাইনাল খেলানো—অথচ তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন সেই একমুহূর্তের জন্যই। বাজ্জো বেঁচে আছেন তাঁর আইকনিক ঝুঁটি আর পেনাল্টি মিসে।