আইভরিকোস্ট কি এবার চমক দেখাতে পারবে

দিদিয়ে দ্রগবা

দিদিয়ে দ্রগবার নাম নিশ্চয়ই শুনেছ? ভদ্রলোক ফুটবল থেকে অবসর নিয়েছেন, তা–ও বহু বছর হয়ে গেছে। তাঁর কথায় নাকি থেমে গিয়েছিল দেশের গৃহযুদ্ধ। হয়তো দ্রগবার নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে চেলসির জার্সি পরা, লম্বা চুলের এক দুর্দান্ত সেন্টার ফরোয়ার্ডের ছবি। কিন্তু তিনি কোন দেশের জাতীয় ফুটবল দলে খেলতেন, সেটা বলতে পারবে? দেশটির নাম আইভরিকোস্ট। আর দীর্ঘ ১২ বছর পর চতুর্থবারের মতো এই দেশ খেলতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ, যে তথ্য নিয়ে তুমি সামান্য উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেই পারো।

আইভরিকোস্ট বিশ্বকাপ খেলেছে মোটে তিনবার। ২০০৬, ২০১০ ও ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে অংশ নিলেও কোনোবারেই তারা গ্রুপ পর্বের বাধা পেরোতে পারেনি। সে সময়ে তাদের তারকা ফুটবলারের সংখ্যা হাতে গোনা থাকলেও প্রতিবারই আইভরিকোস্ট বেশ কঠিন গ্রুপে পড়েছিল। হয়তো বিশ্বকাপে খুব একটা ভালো না করার পেছনে এটা একটা বড় কারণ।

তবে ২০২৬–এর বিশ্বকাপে এসে এই দলের অনেক কিছুই বদলে গেছে।

ক্যাফ অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে আইভরিকোস্ট পড়েছিল ‘এফ’ গ্রুপে। সেখানে গ্যাবনকে পেছনে ফেলে গ্রুপ–সেরা হয়েই বিশ্বকাপের টিকিট কেটেছে তারা। তবে আফ্রিকার এই দেশের জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিল ২০২৩ সালের আফ্রিকা নেশনস কাপ জেতা। সেনেগাল, মালি, কঙ্গো এবং ফাইনালে নাইজেরিয়াকে হারিয়ে সেবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল তারা। ব্যাপারটা কিন্তু বেশ গর্ব করেই বলার মতো। কারণ সেনেগাল, মালি বা কঙ্গোর বহু খেলোয়াড় আছেন, যাঁরা নিয়মিত ইউরোপিয়ান ফুটবলে খেলেন।

এবারের বিশ্বকাপে আইভরিকোস্টকে আলাদা করে নজরে রাখতে হবে তাদের স্কোয়াডের জন্য। একগাদা তরুণ ফুটবলার দলে থাকলেও রয়েছে অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের ছোঁয়া, যাঁদের অধিকাংশ ইউরোপিয়ান ফুটবলে খেলতে অভ্যস্ত।

আইভরিকোস্টের মূল একাদশে জায়গা পেতে গোলপোস্টের নিচে নিজেদের মধ্যে এক মধুর লড়াইয়ে মেতেছেন ইয়াহিয়া ফোফানা আর আলবান লাফন্ট। তুর্কি লিগের ক্লাব চায়কুর রিজেসপোরের হয়ে দুর্দান্ত এক মৌসুম পার করেছেন ফোফানা। আর লাফন্ট বর্তমানে গ্রিসের লিগে খেললেও কিছুদিন আগেই ছিলেন ফরাসি লিগে। তাই লাফন্টও বেশ নির্ভরযোগ্য একজন বিকল্প গোলরক্ষক। ফলে মূল গোলরক্ষক বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে কোচ এমার্স ফায়ে বেশ কঠিন এক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। তবে দুজন বিশ্বমানের গোলরক্ষক থাকাটা একটা দলের জন্য বড় শক্তির জায়গা।

রক্ষণেও আছেন নামকরা বেশ কয়েকজন। রোমার ইভান এনদিকা এবং বেসিকতাসের এমানুয়েল আগাবাদুর সঙ্গে যোগ হবেন স্পোর্টিং লিসবনের তরুণ ডিফেন্ডার ওসমানে দিওমান্দে। দিওমান্দে চলতি মৌসুমে যে ফর্মে ছিলেন, বিশ্বকাপের আসরে সেটা টেনে আনতে পারলে আগামী মৌসুম শুরু হতেই ইউরোপিয়ান ক্লাবগুলো তাকে কেনার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করে দেবে। অভিজ্ঞতার দিক থেকে দলকে সাহায্য করবেন পিএসজির ফরোয়ার্ড দেজিরে দুয়ের ভাই গুয়েলা দুয়ে এবং আতালান্তার ওডিলন কোসোউনো। একদম শেষ মুহূর্তে ফর্ম ফিরে পেয়েছেন উইলফ্রিড সিঙ্গো। তবে আইভরিকোস্টের কোচ এমার্স ফায়ে যেহেতু অধিকাংশ সময়ে চারজনের রক্ষণভাগ নামান, তাই দিওমান্দে ও কোসোউনোর সঙ্গে রাইটব্যাকে সিঙ্গোর খেলার সুযোগই বেশি।

আরও পড়ুন
আইভরিকোস্টের আক্রমণভাগের মূল আকর্ষণ হলেন আমাদ দিয়ালো

৪-৪-২ ছকে খেলার জন্য আইভরিকোস্টের মধ্যমাঠে থাকবেন ফ্রাঙ্ক কেসিয়ে। সৌদি আরবের লিগে খেললেও কেসিয়ে এই দলের মধ্যমাঠের অন্যতম কান্ডারি। আফকনের পর আন্তর্জাতিক ফুটবলে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুটা সংশয় তৈরি হলেও দলের নেতৃত্ব সম্ভবত তার কাঁধেই থাকছে। অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার জঁ-মিশেল সেরির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও সমর্থকেরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছিল। তবে মার্চের প্রীতি ম্যাচগুলোতে স্কোয়াডে জায়গা পাওয়ার পর ধরে নেওয়া হচ্ছে তিনি বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও নিয়মিত সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া আইভরি কোস্টের মধ্যমাঠে প্রতিভার কোনো কমতি নেই। সেখানে রয়েছেন ইব্রাহিম সাঙ্গারে এবং সেকো ফাফানার মতো দুর্দান্ত সব খেলোয়াড়। বিশেষ করে নটিংহাম ফরেস্টের সাঙ্গারে প্রিমিয়ার লিগে এক দারুণ মৌসুম কাটিয়ে এসেছেন। তার এই পারফরম্যান্সের কারণেই ফুটবল মহলে জোর গুঞ্জন উঠেছে যে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের মতো ক্লাব তাঁকে দলে ভেড়াতে আগ্রহী।

আইভরিকোস্টের আক্রমণভাগের মূল আকর্ষণ হলেন আমাদ দিয়ালো। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়ে এই বছর খুব একটা জুতসই না হলেও তাঁর প্রতিভা নিয়ে কারও সংশয় নেই। আফকনের শুরুর একাদশে সুযোগ পাওয়ার পর তিন ম্যাচের তিনটিতেই গোল করেছিলেন তিনি। দিয়ালো হয়তো মুখিয়ে আছেন সেই ফর্ম বিশ্বকাপের আসরেও ধরে রাখতে।

আরও পড়ুন
বিশ্বকাপে ইয়ান দিওমান্দের ওপরও সবার বাড়তি নজর থাকবে।

বিশ্বকাপে ইয়ান দিওমান্দের ওপরও সবার বাড়তি নজর থাকবে। বুন্দেসলিগায় নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর আরবি লাইপজিগের এই ফুটবলার এখন দলগুলোর চাহিদার তুঙ্গে। ১৯ বছর বয়সী এই উইংগার বুন্দেসলিগায় করেছেন ৩৬ ম্যাচে ১৩ গোল আর ৯ অ্যাসিস্ট। আছেন ফরাসি ক্লাব নিসের স্ট্রাইকার এলি ওয়াহি। ফিটনেসের কারণে সেবাস্টিয়ান হলার যেহেতু নেই, টুর্নামেন্টের আগেই ওয়াহি আইভোরিয়ান পাসপোর্ট পেয়ে গেছেন বলে জাতীয় দলে তার জায়গা এখন একেবারে নিশ্চিত। এ ছাড়া অভিজ্ঞ খেলোয়াড় হিসেবে আক্রমণভাগে রয়েছেন নিকোলাস পেপে আর সিমোনে আদিনগ্রা। তবে আক্রমণভাগে চমকের নাম এঁজ-ইয়োয়ান বনি। ২২ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার খেলেন ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টারে। এমার্স ফায়ের অ্যাটাকিং ফুটবলে বনি বেশ কার্যকর হতে পারেন। এ ছাড়া ৪-৪-২ ছকে দ্বিতীয় স্টাইকারের ভূমিকায় খেলার অভিজ্ঞতাও তাঁর রয়েছে।

আইভরিকোস্ট পড়েছে ‘এফ’ গ্রুপে—জার্মানি, কুরাসাও ও ইকুয়েডরের সঙ্গে। বিগত বিশ্বকাপগুলোর কথা চিন্তা করলে এবারও এই গ্রুপ তাদের জন্য বেশ কঠিন। কিন্তু শীর্ষ দলগুলোর পাশাপাশি সেরা তৃতীয় দলগুলোরও যেহেতু পরের রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাই গ্রুপ পর্ব পেরোনো খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে না। যদি আইভরিকোস্ট এই গ্রুপে দ্বিতীয় হয়, তবে পরের পর্বে তারা হয়তো নরওয়ে অথবা সেনেগালের মুখোমুখি হবে। আর তৃতীয় হলে হয়তো বেলজিয়াম অথবা মিসরের সঙ্গে খেলতে হবে।

তাই আইভরিকোস্টের বিশ্বকাপের ইতিহাস বিবেচনা করলে ফিফার নতুন নিয়ম অনুযায়ী এবার গ্রুপ পর্ব এড়ানো সহজ হলেও দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদের জন্য মূল পরীক্ষা অপেক্ষা করছে। তবে আইভরিকোস্ট বিশ্বকাপে বেশি দূর এগোক বা না এগোক, তাদের কাছ থেকে রোমাঞ্চকর গতিময় ফুটবলের আশা রাখতেই পারো তোমরা।

তবে দ্রগবার উত্তরসূরিদের ডার্ক হর্স বা উচিত কি না, সেটা তোমাদের হাতেই ছেড়ে দিলাম।

আরও পড়ুন