টিম ক্রাল: টাইব্রেকারের নায়ক

‘নায়ক’ হতে ঠিক কী লাগে? এককথায় বলতে গেলে ম্যাজিক। একমুহূর্তের ম্যাজিকই যথেষ্ট কাউকে সর্বোচ্চ চূড়ায় তুলে নিতে। ২০১৪ বিশ্বকাপে তেমনিভাবে নায়ক হয়ে উঠেছিলেন টিম ক্রাল। একটা বদলি বদলে দিয়েছিল ম্যাচের ভাগ্য। আর সেই বদলি এসেছিল ম্যাচ শেষ হওয়ার মাত্র কয়েক সেকেন্ড আগে।

২০১৪ বিশ্বকাপে ডার্ক হর্স হয়ে উঠেছিল কোস্টারিকা। গ্রুপ অব ডেথ থেকে উঠে আসা কোস্টারিকার সামনে পাত্তাই পাচ্ছিল না কেউ। কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময় শেষ হয়েছিল ০-০ গোলে। ম্যাচ টাইব্রেকারে গড়াবে, ঠিক তখন বদলির সংকেত এল বেঞ্চ থেকে। নেদারল্যান্ডসের কোচ লুই ফন গাল মাঠ থেকে তুলে নিলেন গোলকিপার জ্যাসপার সিলিসেনকে। পুরো বিশ্ব অবাক হয়ে দেখল, পেনাল্টি শুটের ঠিক আগে মাঠে নামলেন টিম ক্রালকে। পুরো বিশ্বকাপে যিনি এক মিনিটের জন্যও খেলার সুযোগ পাননি। ডাচ কোচ যেন নিজের তুরুপের তাস খেললেন শেষ মুহূর্তে এসে।

লুই ফন গালের তুরুপের তাস ছিলেন টিম ক্রাল।
ছবি: এক্স

খোদ টিম ক্রালও জানতেন না সেই কথা। তাঁর ওপর কোনো বাড়তি চাপই ফেলতে চাননি কোচ। তাই তো টিম বাসে ওঠার ঠিক আগে কোচ লুই ফন গাল তাঁকে জানিয়েছিলেন, ম্যাচ যদি টাইব্রেকারে গড়ায়, তবে কিন্তু তুমি পেনাল্টি থামাবে। সেভাবে প্রস্তুতি নিতে থাকো। পুরো ম্যাচে বদলিও করা হয়েছিল সেভাবে ভেবেচিন্তেই। মাত্র দুজন বদল করে ১২০ মিনিট খেলেছিল নেদারল্যান্ডস। অবশেষে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে এসে ফন গাল সিলিসেনকে তুলে মাঠে নামালেন টিম ক্রালকে। চোখেমুখে অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস, যেন তিনি আগে থেকেই জানেন আজ কী হতে যাচ্ছে।

টিম ক্রালের বদলি মানসিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছিল কোস্টারিকাকে। কোস্টারিকার গোলের নিচে ছিলেন কেইলর নাভাস, যিনি বিশ্বকাপে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছেন গোলরক্ষক হিসেবে। আর ক্রালও গোলপোস্টে গিয়ে শুরু করলেন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। কোস্টারিকার প্রত্যেক খেলোয়াড় যখন শট নিতে আসছিলেন, ক্রাল দাঁড়িয়ে থাকতেন ঠিক পেনাল্টি স্পটের সামনে। শুটার যখন প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন ক্রাল দৌড়ে ওয়ার্মআপ করছেন। বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন, তাঁকে এ কারণেই মাঠে নামানো হয়েছে।

আরও পড়ুন
কোস্টারিকার অধিনায়ক ব্রায়ান রুইজের পেনাল্টি থামানোর পর টিম ক্রাল।
ছবি: এক্স

মজার ব্যাপার হলো, টিম ক্রাল যে পেনাল্টি স্পেশালিস্ট ছিলেন, তা কিন্তু নয়। বরং তাঁর চেয়ে বেঞ্চে থাকা মিকেল ভ্রমের পেনাল্টি থামানোর রেকর্ড ছিল বেশি। এমনকি সিলিসেনও বেশ ভালো পেনাল্টি থামাতে পারতেন। কিন্তু সেদিন দিনটা ছিল টিম ক্রালের। তাই তো সময়মতো সমীকরণ বদলে দিতে হাজির হয়েছিলেন তিনি।

৬ ফুট ৪ ইঞ্চির টিম ক্রাল বদলে দিলেন সব সমীকরণ। কোস্টারিকার নেওয়া পাঁচটি শটের প্রতিটিই লাফ দিয়েছিলেন ঠিক দিকে। আর এর মধ্যে থামিয়ে দিয়েছিলেন কোস্টারিকার অধিনায়ক ব্রায়ান রুইজ আর মিকেল উমানার শট। ব্যস, দুই শট থামিয়েই ইতিহাসের পাতায় নাম লেখালেন টিম ক্রাল। ৪-৩ ব্যবধানে জয়ী হয়ে সেমিফাইনালে পা রাখল ডাচরা।

আরও পড়ুন
সেদিন দুটি পেনাল্টি থামিয়েছিলেন ক্রাল।
ছবি: এক্স

মজার ব্যাপার হলো, সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও ঠিক একই ঘটনা দেখেছিল নেদারল্যান্ডস। কিন্তু সেদিন লুই ফন গালের হাতে ছিল না কোনো বদলি। তাই জ্যাসপার সিলিসেনকে দাঁড়াতে হয়েছিল গোলবারের নিচে। সেদিনের নায়ক হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার সার্জিও রোমেরো। টিম ক্রাল বিরস বদনে তাকিয়ে দেখেছিলেন সেই হার।

কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালের এক রাত টিম ক্রালকে অমর করে রেখেছে বিশ্বকাপ। ক্রাল প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, ইতিহাসের অংশ হতে চাইলে ৯০ মিনিট খেলার দরকার হয় না, সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেই চলে।

আরও পড়ুন