এককথায় যত সহজ বলে মনে হলো, খেলাটা কিন্তু মোটেই তেমন সহজ নয়। ওয়েবসাইটে রেজিস্ট্রেশনের পর দল বানাতে তোমাকে বাজেট দেওয়া হবে ১০০ মিলিয়ন (সত্যি সত্যি হাতে পাবে, তা ভেবো না আবার)। এই বাজেটের মধ্যে তোমাকে নিতে হবে—২ জন গোলকিপার, ৫ জন ডিফেন্ডার, ৫ জন মিডফিল্ডার এবং ৩ জন ফরোয়ার্ড অর্থাৎ মোট ১৫ জন খেলোয়াড়। প্রিমিয়ার লিগের ২০ দলের সব খেলোয়াড়ই এখানে অপশন হিসেবে থাকবে। তার মধ্যে ১৩ মিলিয়ন দামের মোহাম্মদ সালাহ কিংবা ১২ মিলিয়নের ডি ব্রুইনা যেমন আছে, তেমনি আছে ৪ কিংবা ৪.৫ মিলিয়নের খেলোয়াড়ও। ১০০ মিলিয়ন বাজেটের মধ্যে মিলিয়ে সব কটি খেলোয়াড় নেওয়ার পরই তোমার দল সেভ হবে। আর তুমি হবে এই দলটির ম্যানেজার।

তারপর প্রতি সপ্তাহে খেলার ফিকশ্চার (সূচি) দেখে সাজাতে হবে তোমার দলের একাদশ। বেঞ্চে থাকবে একজন গোলকিপারসহ মোট চারজন খেলোয়াড়। একাদশের কাউকে অধিনায়ক এবং সহ-অধিনায়ক হিসেবে বেছে নিতে হবে। সাধারণত অধিনায়ক হিসেবে যাদের সবচেয়ে ভালো পয়েন্ট দেওয়ার সম্ভাবনা, তাকেই বেছে নিতে হয়। কারণ, একমাত্র অধিনায়কের পয়েন্টই দ্বিগুণ হয়। যদি কোনো কারণে অধিনায়ক ওই সপ্তাহে না খেলে, সে ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হবে সহ-অধিনায়কের পয়েন্ট আর বেঞ্চ থেকে একজন খেলোয়াড় উঠবে অধিনায়কের জায়গায়।

প্রতি সপ্তাহে তোমার দলের জন্য থাকবে একটি ফ্রি ট্রান্সফার, এটি ব্যবহার করে তোমার দলের কোনো খেলোয়াড়কে বদলে নিতে পারবে নতুন কাউকে। এক সপ্তাহে একটির বেশি খেলোয়াড় বদলাতে চাইলে, প্রতি খেলোয়াড়ের জন্য কিন্তু আবার কাটা যাবে ৪ পয়েন্ট। তবে দলের আমূল পরিবর্তনের জন্য পুরো সিজনে দুবার সুযোগ আছে ওয়াইল্ড কার্ড খেলার। ওয়াইল্ড কার্ড খেললে ওই সপ্তাহে তুমি যত ট্রান্সফারই করো, কোনো পয়েন্ট কাটা যাবে না। সাধারণত ৩১ ডিসেম্বরের আগে একটা ওয়াইল্ড কার্ড খেলতে হয়। আর দ্বিতীয়টা খেলা যায় ১ জানুয়ারি থেকে সিজন শেষ হওয়ার আগপর্যন্ত যেকোনো এক সপ্তাহে।

এবার আসা যাক পয়েন্টের আলোচনায়। প্রতি ম্যাচে তোমার দলের কোনো প্লেয়ার মাঠে নামলেই মিলবে ১ পয়েন্ট, যদি সে ৬০ মিনিট বা তার বেশি সময় খেলে তাহলে পাবে আরও ১ পয়েন্ট। দলের কোনো ফরোয়ার্ড গোল দিলেই মিলবে ৪ পয়েন্ট, যদি মিডফিল্ডার গোল দেয় সে ক্ষেত্রে পাবে ৫ পয়েন্ট আর ডিফেন্ডার বা গোলকিপার গোল দিলে ৬ পয়েন্ট। সাধারণত ডিফেন্ডারদের গোল দেওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে বলেই তাদের গোলের পয়েন্ট সবচেয়ে বেশি। যেকোনো খেলোয়াড় অ্যাসিস্ট করলেই পাওয়া যাবে ৩ পয়েন্ট। ডিফেন্ডার আর গোলকিপারদের যেহেতু গোল দেওয়ার সম্ভাবনা কম, তাই তাদের জন্য রয়েছে ক্লিনশিটের পয়েন্ট। অর্থাৎ ওই খেলোয়াড়ের দল কোনো গোল না খেলে, ডিফেন্ডার কিংবা গোলকিপারটি পাবে ৪ পয়েন্ট। আর মিডফিল্ডার পাবে ১ পয়েন্ট, ফরোয়ার্ডদের জন্য ক্লিনশিটের কোনো পয়েন্ট নেই। এ ছাড়া গোলকিপাররা প্রতি তিন সেভের জন্য পাবে ১ পয়েন্ট। আর কোনো খেলোয়াড় ওই ম্যাচের সেরা তিনজন খেলোয়াড়ের মধ্যে থাকলে বোনাস হিসেবে যথাক্রমে ৩, ২ ও ১ পয়েন্ট পাবে। এ তো গেল কেবল পয়েন্ট পাওয়ার কথা, কোনো খেলোয়াড় হলুদ কার্ড খেলে কাটা যায় ১ পয়েন্ট। লাল কার্ড পেলে সেখানে কাটা হবে ৩ পয়েন্ট। পেনাল্টি মিস করলে কিংবা আত্মঘাতী গোল দিলে কাটা যাবে ২ পয়েন্ট।

default-image

পয়েন্টের হিসাব দেখে বোঝাই যায়, সাধারণত যেসব খেলোয়াড়ের গোল অ্যাসিস্ট দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি তাদের নিয়েই দল বানানো উচিত। ডিফেন্ডারদের ক্ষেত্রে গোলের বদলে বিবেচনা করতে হবে ক্লিনশিট। তাই এ ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ করতে হয় প্রিমিয়ার লিগের দলগুলোর খেলা। কোন খেলোয়াড় কতটা গোল করার চেষ্টা করছে কিংবা কাদের সবচেয়ে বেশি ক্লিনশিট বা কোনো ম্যাচে গোল না খাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের প্রাধান্য দিয়ে দল সাজালে ভালো পয়েন্ট পাওয়া যায়। আর অধিনায়ক হিসেবে যার গোল দেওয়ার সম্ভাবনা বেশি, সাধারণত তাকেই বেছে নেওয়া ভালো। এগুলোর সঙ্গে আরও নানা রকম প্রশ্নের উত্তর তুমি পাবে ওয়েবসাইটটির Help পেজটিতে।

একে একে দলের সবার খেলা শেষ হলে তাদের পারফরম্যান্স থেকে পাওয়া পয়েন্ট যোগ করলে সেটি হবে ওই সপ্তাহে বা গেমউইকে অর্জন করা তোমার পয়েন্ট। এ রকম মোট ৩৮ সপ্তাহ বা গেমউইক খেলা হলে শেষ হবে এক সিজন। এই এক সিজনে তোমার অর্জন করা পয়েন্ট যদি পৃথিবীর অন্য সব ম্যানেজারের দলের পয়েন্ট থেকে বেশি হয়, তাহলে পাবে ল্যাপটপ, ব্লুটুথ হেডফোনের মতো বিভিন্ন মার্চেন্ডাইজসহ যুক্তরাজ্যে একদম বিনা খরচে সাত দিন বেড়ানোর সুযোগ। পছন্দের কোনো দলের দুটি খেলা দেখার সুযোগও থাকবে সঙ্গে। দ্বিতীয় হলে একই মার্চেন্ডাইজসহ যুক্তরাজ্যে দুই দিন ভ্রমণের সুযোগ, সঙ্গে প্রিয় দলের একটি খেলা দেখার সুযোগ। তৃতীয় হলে ভ্রমণের সুযোগ না থাকলেও থাকবে ল্যাপটপ-হেডফোন-ফিফা ২৩-এর অফিশিয়াল কপিসহ নানা ধরনের আকর্ষণীয় গিফট।

শুনে কি বেশ সহজ লাগছে? তাহলে বলি, ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন হওয়া কিন্তু অত সহজ নয়। প্রতি সিজনে প্রায় ৮০ লাখের মতো ম্যানেজার এই স্ট্র্যাটেজিক খেলায় অংশ নেয়। কেবল বাংলাদেশ থেকেই খেলে ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। তাদের টেক্কা দিতে ছক কষতে হবে নিখুঁত, বিশ্লেষণ করতে হবে গভীর আর সঙ্গে সহায়তা দরকার ভাগ্যেরও।

কেবল যে প্রিমিয়ার লিগ থেকেই পুরস্কার দেয় তা নয়, প্রতিবছর বাংলাদেশের বিভিন্ন গ্রুপও নানা রকম প্রাইভেট লিগের আয়োজন করে। সেখানেও চ্যাম্পিয়নের জন্য থাকে পুরস্কার। ফেসবুকে তাদের গ্রুপও রয়েছে। যেখানে অভিজ্ঞ ম্যানেজাররা নিয়মিত নিজেদের মতামত এবং অন্যের টিম বানাতে বিভিন্ন সাজেশন দিয়ে থাকেন।

ফ্যান্টাসি ফুটবলের ধারণা প্রথম শুরু হয় সেই ষাটের দশকে। তখন আমেরিকার একটি পত্রিকা ওকল্যান্ড ট্রিবিউন দেশটির ফুটবল লিগ নিয়ে শুরু করে পাঠকদের অংশগ্রহণে ফ্যান্টাসি ফুটবল লিগ। তখন ইন্টারনেট ছিল না। তারপরও বিপুল জনপ্রিয়তা পায় এই লিগ। তারপর নব্বইয়ের দশকে ইংল্যান্ডের টেলিগ্রাফ পত্রিকা শুরু করে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ফ্যান্টাসি। আর বর্তমানে জনপ্রিয় ফ্যান্টাসি প্রিমিয়ার লিগ বা FPL শুরু হয় ২০০২-০৩ সিজন থেকে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের অফিশিয়াল ফ্যান্টাসি লিগ শুরুর পর যেন বিপ্লব ঘটে যায়। ইংল্যান্ডের মানুষেরা তো বটেই, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রিমিয়ার লিগভক্ত দর্শকেরা অংশ নিতে শুরু করেন এতে। এখন তো এর জনপ্রিয়তা এত বেড়েছে যে যেসব খেলোয়াড় নিয়ে দল বানাতে হয়, সেই মোহাম্মদ সালাহ, ডি ব্রুইনা কিংবা হ্যারি কেইনরাও খেলেন এটি।

default-image

এতক্ষণে নিশ্চয়ই পরিষ্কার, কেন এক দলের সমর্থক হয়েও অন্য দলের খেলোয়াড়ের জন্য প্রার্থনা করতে হতে পারে। সত্যি বলতে, খেলা দেখার মজা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয় এই ফ্যান্টাসি লিগ। তা ছাড়া মগজের ব্যায়ামও তো কম হয় না! তাই সদ্য শুরু হওয়া প্রিমিয়ার লিগের ম্যাচগুলো থেকে বাড়তি আনন্দ পেতে তুমিও বানিয়ে ফেলতে পারো একটি ফ্যান্টাসি দল। সত্যিকারের খেলোয়াড়দের নিজের দলে নিয়ে ম্যানেজ করতে গেলে মাঝেমধ্যে নিজেকে ইয়ুর্গেন ক্লপ কিংবা পেপ গার্দিওলাও মনে হতে পারে!

খেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন