আর্জেন্টিনা কেন গোলে কোনো শট নিতে পারল না
১৬ বছরের অপেক্ষা শেষ হলো স্পেনের। আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নিল ইয়ামাল-অলমোদের দল। স্পেনের জয়টা অনেকের কাছে হয়তো অনুমিতই ছিল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটা বাদ দিলে তাদের খুঁত খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু ফাইনালে স্পেনের পারফরম্যান্স যতটা না অবাক করেছে, তার চেয়েও বেশি অবাক করেছে নিষ্প্রভ আর্জেন্টিনার পারফরম্যান্স।
ভেবে দেখো তো, পুরো টুর্নামেন্টে ১৯ গোল করা দল আর্জেন্টিনা। কোনো ম্যাচে ২ গোলের কম করেনি। সেই দলটা কীভাবে ফাইনালে এসে গোল করা দূর থাক, গোলপোস্টে কোনো শটই রাখতে পারে না? যে লিওনেল মেসিকে নিয়ে চিন্তিত থাকেন ডিফেন্ডাররা, সেই মেসি বলই পাননি পুরো ম্যাচে। অল্প সময়ের জন্য বল পেলেও তা রাখতে পারেননি। আর্জেন্টিনার মূল শক্তিই ছিল শেষ মুহূর্তের খেলায় প্রভাব বিস্তার করে ম্যাচটা নিজের করে নেওয়া, সেখানে ফিরে আসা দূরে থাক, ম্যাচে বল পায়েই রাখতে পারেনি তারা। ফাইনালে এসে কীভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা?
এর পুরো কৃতিত্ব স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ও অধিনায়ক রদ্রির ঘাড়ে। কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে এখন পর্যন্ত মূল একাদশে কোনো পরিবর্তন আনেননি কোচ। কারণ যে কৌশলে বেলজিয়াম-ফ্রান্সকে ধরাশায়ী করেছেন, সেই একই ছকে আর্জেন্টিনাকেও বাঁধতে চেয়েছেন তিনি। আর্জেন্টিনার ৪-৪-২ ফরমেশনের বিপরীতে স্পেন নেমেছিল ৪-৩-৩ ফরমেশনে। কিন্তু খেলা শুরু হতেই সেটা পরিণত হয় ৪-২-৩-১ ফরমেশনে। যেখানে নিচ থেকে বল কন্ট্রোলের কাজ করেন রদ্রি আর ফাবিয়ান রুইজ, সামনে দানি ওলমো সাজাচ্ছিলেন খেলা। ফলে মাঝমাঠের দখল স্পেনের কাছেই ছিল।
তিন মিডফিল্ডারের সঙ্গে মাঝমাঠে যোগ দিয়েছিলেন স্ট্রাইকার হিসেবে নামা মিকেল ওয়ারজাবাল। লামিনে ইয়ামাল ও অ্যালেক্স বায়েনা দুই পাশে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন ডিফেন্ডারদের, আর দুই উইং ব্যাক পেদ্রো পোরো আর মার্ক কুকুরেয়া ব্যস্ত রাখছিলেন দুই মিডফিল্ডারকে। এক এক করে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠে যাঁদের কাজ করার কথা, সবাইকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন স্পেনের উইঙ্গাররা। ফলে মাঝমাঠে চারজন নামিয়েও যেন কম হয়ে যাচ্ছিল আর্জেন্টিনার জন্য। আর্জেন্টিনা হেরেছে ঠিক এই জায়গাতেই।
স্প্যানিশদের পাসিং নিয়ে তো নতুন করে বলার কিছু নেই। বল তারা একবার পায়ে পেলে ছাড়ার কথা ভুলে যায়। স্প্যানিশ মিডফিল্ডাররা বল পেয়ে সেটাই করেছে। একের পর এক পাস খেলে ক্লান্ত করেছে আর্জেন্টিনার মাঝমাঠকে। মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারানোয় মেসির সঙ্গে পুরো দলের কোনো যোগাযোগই ছিল না, মেসি একা একা ঘুরে বেড়িয়েছেন মাঠে। প্রথম ৩০ মিনিটে তিনি বলে স্পর্শ করতে পেরেছেন মাত্র দুবার! এর মধ্যে একবার ম্যাচ শুরুর সময়।
আক্রমণে সুবিধা করতে না পারায় মেসি মাঝপথে নেমে এসেছিলেন ডিফেন্সে। দেখতে যে এখান থেকে বল তৈরি করা যায় কি না। কিন্তু সেটাও আটকে দিয়েছেন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রি। আর মেসির পাসগুলো পায়ে রাখতে পারেননি অন্য খেলোয়াড়েরা। এককথায় পুরো ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরুতেই নিজের কাছে নিয়ে নিয়েছিল স্পেন। মাঝমাঠ পেরোতেই পারছিল না আর্জেন্টিনা।
একের পর এক পাস দিয়ে পুরো দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি করেছিল আর্জেন্টিনার জন্য। সেই সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আর্জেন্টিনার দুই ডিফেন্ডারের চোট। প্রথমার্ধের শেষে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ও দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকে ক্রিস্টিয়ান রোমেরো—দুজনকে হারিয়ে আর ডিফেন্স শক্ত করতে পারেনি তারা। স্পেনের একের পর এক পাস যে ডিফেন্সকে ভাঙতে পারেনি শুরুতে, সেটাই ভেঙে গেছে তাঁরা দুজন উঠে যাওয়ার পর। ফাউল করা ছাড়া স্পেনের আক্রমণ আটকানোর কোনো পথই খোলা ছিল না আর্জেন্টিনার সামনে। সেটা করতে গিয়েই ঘটেছে বিপত্তি। এনজো ফার্নান্দেজের লাল কার্ড বদলে দিয়েছে ম্যাচের চিত্র। আর বাকিটা তো চোখের সামনেই।
পুরো ম্যাচে আর্জেন্টিনা শট নিয়েছে মাত্র ৩টি, গোলপোস্টে তো একটিও না। মুদ্রার উল্টোপিঠে স্পেনের শট ২০টি, গোলপোস্টের ভেতরেই আছে ১২টি। স্পেনের ৮০৩টি পাসের বিপরীতে আর্জেন্টিনার পাস মাত্র ৪৪৫টি। এটুকুতেই বোঝা যায় ম্যাচে স্পেনের একচ্ছত্র আধিপত্য। গোলবারের নিচে এমিলিয়ানো মার্তিনেজ অতিমানব হয়ে না উঠলে হয়তো লজ্জায় পড়তে হতো আর্জেন্টিনাকে।
শেষ পর্যন্ত পুরো বিশ্বকাপে একের পর এক মিস করে হতাশায় ভোগা ফেরান তোরেস হয়ে উঠলেন হিরো। একমাত্র গোলটাই হয়ে উঠল বিশ্বকাপ জয়ের গোল। এর থেকে বড় সৌভাগ্য আর কী-ইবা হতে পারে? লুইস দে লা ফুয়েন্তের দুর্দান্ত ট্যাকটিকস পূর্ণতা পেল আত্মবিশ্বাসের অভাবে পোড়া এক স্ট্রাইকারের পা থেকে।