সবুজ জার্সিতে ফ্রান্স, হলুদ জার্সিতে আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপ এলেই সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে পছন্দের দলের জার্সি কিনতে। জার্সি দিয়েই যেন চেনা যায়, কার পছন্দের দল কোনটি। কিছু রং তো ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ব্রাজিলের হলুদ, আর্জেন্টিনার আকাশি-নীল কিংবা স্পেনের লাল—দূর থেকে রং দেখলেই দল চেনা যায়। কিন্তু এমন যদি হয়, পছন্দের দলকে বিশ্বকাপ খেলতে হচ্ছে অন্য কোন ক্লাবের জার্সি গায়ে দিয়ে? এমন এক অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হয়েছিল ১৯৭৮ বিশ্বকাপ। যেখানে ফ্রান্সকে খেলতে হয়েছিল আর্জেন্টিনার এক স্থানীয় দলের জার্সি গায়ে দিয়ে।

এখানকার সময়ে জার্সি মানেই বিশাল ব্যবসা। একটি দলের জার্সির স্পনসর নিতে কারি কারি টাকা খরচ করে কোম্পানিগুলো। বিশ্বকাপের কয়েক মাস আগেই জার্সি উন্মোচন করা হয় ধুমধাম করে। নিজের দলের জার্সি গায়ে দিয়ে দলকে সমর্থন করার আনন্দই অন্য রকম। কিন্তু সেই দলই যদি অখ্যাত কোন এক দলের জার্সি গায়ে দিয়ে খেলে তখন? আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে ফ্রান্স ঘটিয়েছিল এমনই এক কাণ্ড।

গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে মুখোমুখি ফ্রান্স আর হাঙ্গেরি। দুই দলই বিদায় নিয়েছে বিশ্বকাপের লড়াই থেকে। শেষ ম্যাচটা তাই নিছকই নিয়মরক্ষার। কিন্তু নিয়মরক্ষার ম্যাচটাই জায়গা করে নেবে ইতিহাসে, তা কে জানত? ম্যাচের আগেই নির্দেশ দেওয়া ছিল ফ্রান্স পরবে নীল জার্সি আর হাঙ্গেরি সাদা। কিন্তু মাঠে এসে দুই দলই আবিষ্কার করল, দুই দলের খেলোয়াড়দের গায়েই ধবধবে সাদা জার্সি! টিভি পর্দায় তো বটেই, মাঠেও খেলোয়াড়দের আলাদা করতে পারছিলেন না রেফারি। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ, কারও না কারও জার্সি তো পাল্টাতে হবে। বলতে পারো, ফ্রান্স তো চাইলেই জার্সি পরিবর্তন করতে পারে। কিন্তু টুর্নামেন্টের শেষ ম্যাচ বলে ফ্রান্সের কিট ম্যানেজার ভুল করে শুধু সাদা জার্সি নিয়েই রওনা দিয়েছিলেন। হাঙ্গেরিও ফিফার নির্দেশ অনুযায়ী, মাঠে হাজির হয়েছে সাদা জার্সি পরে। ফলাফল নতুন জার্সির খোঁজ।

প্রায় আধা ঘণ্টা খোঁজাখুঁজি করার পর অবশেষে ত্রাণকর্তা হয়ে এল স্থানীয় এক ক্লাব—‘কিম্বার্লি দে মার ডেল প্লাটা’। তাদের নিয়মিত সবুজ-সাদা ডোরাকাটা জার্সিতে দুই দলকে কিছুটা আলাদা করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু সেখানেও বাধল এক বিপত্তি। কিম্বার্লির জার্সিতে লেখা ছিল না কোনো নম্বর। তাই তড়িঘড়ি করে হাতে লিখে, অন্য জার্সি থেকে নম্বর কেটে বসানো হলো ফরাসি খেলোয়াড়দের পিঠে। সেই জার্সি পরেই মাঠে নামল ফ্রান্স। প্রথমবারের মতো তাদের দেখা গেল সাদা-সবুজ ডোরাকাটা জার্সিতে।

সাদা-সবুজ ডোরাকাটা জার্সির সঙ্গে ছিল নীল শর্টস
ছবি: এক্স

ধার করা জার্সি ফ্রান্সের জন্য সুখবরই বয়ে এনেছিল। হাঙ্গেরিকে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেই বিশ্বকাপের একমাত্র জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল ফরাসিরা। বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও ফরাসি সমর্থকেরা সাদা-সবুজ জার্সিতে নিজেদের দলকে দেখে সামান্য আনন্দও পেয়েছেন বটে।

সেই ম্যাচের পর ফিফা জার্সি নিয়ে আরও কড়াকড়ি নিয়ম করে দেয়। প্রতি ম্যাচেই দুই সেট জার্সি নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হয় দুই দলকে। এমনকি বিশ্বকাপের মাসখানেক আগে থেকেই কে কোন জার্সি পরে খেলবে, সেটাও ঠিক করে দেয়। সেবারই শেষবারের মতো ক্লাবের জার্সিতে বিশ্বকাপে খেলতে দেখা গিয়েছে কোনো দলকে। শেষবার বলছি। কারণ, এর আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে তিনবার। প্রথমবার ঘটেছিল ১৯৩৪ বিশ্বকাপে।

১৯৩৪ বিশ্বকাপ: অস্ট্রিয়ার নীল জার্সি

দ্বিতীয় বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল সেটি। জার্মানির মুখোমুখি অস্ট্রিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে থাকা দুই দেশ মুখোমুখি হয়েছিল নিজেদের ঐতিহ্যবাহী সাদা জার্সিতে। কিন্তু রেফারি তো মানবেন না। ফলে এক দলকে জার্সি পাল্টাতেই হতো। কারও কাছেই বিকল্প জার্সি না থাকায় শেষ পর্যন্ত ইতালিয়ান ক্লাব নাপোলির জার্সি পরে মাঠে নামতে হয়েছে অস্ট্রিয়াকে। অস্ট্রিয়া তাদের ফুটবল–ইতিহাসে একবারই নীল জার্সিতে মাঠে নেমেছিল। সেই ম্যাচে ৩-২ গোলে হেরে চতুর্থ অবস্থানে থেকে বিশ্বকাপ শেষ করেছিল অস্ট্রিয়া।

১৯৫০ বিশ্বকাপ: মেক্সিকোর নীল-সাদা জার্সি

মেক্সিকোর নীল-সাদা জার্সি
ছবি: এক্স

১৯৫০ সালে ব্রাজিল বিশ্বকাপেও ঘটেছিল একই ঘটনা। মেক্সিকো ও সুইজারল্যান্ড—দুই দলই মাঠে নেমেছিল লাল জার্সি পরে। রেফারিও জানিয়ে দিলেন, এভাবে খেলা সম্ভব নয়। তাই মেক্সিকো নিজেদের জার্সি পাল্টে পরেছিল নীল-সাদা ডোরাকাটা জার্সি। সেটাই ছিল মেক্সিকোর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো লাল-সবুজবিহীন কোনো জার্সি। এখনো পর্যন্ত মেক্সিকোর প্রতিটি জার্সিতেই আছে লাল বা সবুজের ছোঁয়া। ধারের জার্সি পরে মেক্সিকোর ভাগ্য পাল্টায়নি। তারা ম্যাচ হেরেছিল ৪-১ গোলে।

১৯৫৮ বিশ্বকাপ: আর্জেন্টিনার হলুদ জার্সি

১৯৫৮ বিশ্বকাপে একই ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। সেবার তাদের জার্সি মিলে গিয়েছিল পশ্চিম জার্মানির সঙ্গে। যদিও আর্জেন্টিনার ছিল আকাশি-সাদা জার্সি আর জার্মানির সাদা জার্সি। কিন্তু রেফারি দুই দলকে কোনোভাবেই আলাদা করতে পারছিলেন না। যে কারণে আর্জেন্টিনাকে নির্দেশ দেওয়া হলো তাদের জার্সি পরিবর্তন করতে, যাতে দুই দলকে আলাদা করা যায়। অগত্যা সুইডেনের ক্লাব আইএফকে মালমো ধার দিল নিজেদের অ্যাওয়ে জার্সি। প্রথমবারের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের হলুদ জার্সি পরে মাঠে নামল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচেও তারা হেরেছিল ৩-১ গোলে।

এই হলুদ জার্সি পরেই বিশ্বকাপে খেলেছিল আর্জেন্টিনা
ছবি: এক্স

শেষের তিনটি ঘটনাই টিভি পর্দায় বিশ্বকাপ দেখানোর আগে হওয়ায় নজর এড়িয়ে গিয়েছিল অনেকের। কিন্তু ফ্রান্সের ঘটনার পর ফিফাও নড়েচড়ে বসে, ফুটবলকে আরও আকর্ষণীয় করতে জার্সিও হয়ে উঠে দলের প্রতীক। এর পর থেকে এ রকম ভুল হওয়ার সুযোগও রাখে না দলগুলো।