বিশ্বকাপের ড্রেস রিহার্সাল থেকে এশিয়ার বিশ্বকাপ

এশিয়া কাপে অংশ নেওয়া ছয় দলের ছয় তারকাছবি: এশিয়ান ক্রিকেট কাউন্সিল

আশির দশকের কথা, ক্রিকেটে তখন একচ্ছত্র আধিপত্য ইংলিশদের। ‘ভদ্রলোকের খেলা’ বলে একটা কথা চালু করেছিল তারা। যার জের ধরেই ক্রিকেটের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত—সবটাই নিয়ন্ত্রণ করত ইংলিশরা। সূচনালগ্ন থেকেই ক্রিকেট চলত ইংল্যান্ডের ইশারায়। বিশ্বকাপের প্রথম তিনটি আসরও বসেছিল তাদের মাটিতেই। কাগজে–কলমে ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক আইসিসি থাকলেও তা চালাত মূলত ইংলিশরা।

১৯৮৩ বিশ্বকাপ নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয় ক্রিকেট–বিশ্বের জন্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজের আধিপত্য ভেঙে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জেতে ভারত। প্রথমবারের মতো এশিয়াকে উঁচু নজরে দেখতে শুরু করে ক্রিকেট–বিশ্ব। মাঠের ভেতরের আধিপত্য ভেঙে পুরো বিশ্ব নজর দেয় মাঠের বাইরের আধিপত্য ভাঙার দিকে। শিরোপা ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছ থেকে বের করে আনা গেছে, এবার ক্রিকেটকেও ইংল্যান্ডের হাত থেকে বের করে আনার পালা। তখনই অদ্ভুত এক চিন্তা খেলে ভারতীয়দের মাথায়। কেমন হবে, যদি আইসিসির মতো শুধু এশিয়ার দেশগুলোকে নিয়ে একটি বিশ্বকাপ আয়োজন করা যায়?

ক্রিকেটে এশিয়া তখনো নিজেদের অবস্থান খুঁজে ফিরছে। ভারত-পাকিস্তান ছাড়া বাকি দলগুলো পায়ের নিচে মাটি খুঁজে বেড়াচ্ছে। সবেমাত্র আইসিসির পূর্ণ সদস্য হয়েছে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ তো ওয়ানডে খেলার পুরোপুরি স্বীকৃতি পায়নি। তবু একটা কিছু তো করা দরকার। এই লক্ষ্য নিয়েই ১৯৮৩ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতের নয়াদিল্লিতে গঠন করা হলো এশিয়ান ক্রিকেট কনফারেন্স। যার প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যোগ দিল ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া। ছয় দেশ নিয়ে শুরু হলেও কাগজে-কলমে মাঠে নামার মতো দল ছিল মাত্র তিনটি। আর তাদের নিয়েই বসে এশিয়া কাপের প্রথম আসর।

১৯৮৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় বসে এশিয়া কাপের প্রথম আসর। সে আসরের স্লোগান ছিল ‘ওয়ান এশিয়া ওয়ান ড্রিম’। রাউন্ড রবিন পদ্ধতির প্রথম আসরের শিরোপা জিতে নেয় ভারত।

দুই বছর পর এশিয়া কাপের দ্বিতীয় আসর বসে শ্রীলঙ্কায়। সে আসরেই ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় বাংলাদেশের। ৩১ মার্চ পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়েই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা দেয় বাংলাদেশ। নতুন দল হিসেবে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি হলেও এশিয়া কাপের দ্বিতীয় আসরে দলের সংখ্যা ছিল ৩। সেবার তামিল সংঘাতের কারণে শ্রীলঙ্কায় যেতে অপারগতা প্রকাশ করে ভারত। তাই তাদের ছাড়াই মাঠে গড়ায় এশিয়া কাপের দ্বিতীয় আসর। তবে যে লক্ষ্যে এশিয়া কাপের সূচনা হয়েছিল, তা পরিপূর্ণ হয় এক বছর পরই।

প্রথমবার আয়োজিত এশিয়া কাপে শিরোপা তুলে ধরে ভারত

১৯৮৭ বিশ্বকাপের আসর বসে এশিয়ায়। এশিয়া কাপের দুই আসর দিয়ে নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছিল এশিয়ার দেশগুলো। যে কারণে নানাবিধ শঙ্কা ছাপিয়ে বিশ্বকাপের চতুর্থ আসর বসে ভারত-পাকিস্তান মিলিয়ে। যে লক্ষ্যে এশিয়া কাপকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল এসিসি, তিন বছরের মধ্যেই সে লক্ষ্যে সফল তারা। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই এসিসি লক্ষ করল, বিশ্বকাপের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে শুরু হওয়া টুর্নামেন্টের জনপ্রিয়তা ছাড়িয়ে গেছে বিশ্বকাপকেও। কারণ? বাংলাদেশ। বিশ্বকাপে যোগ দিতে না পারা ছোট্ট দেশটির কাছে এশিয়া কাপই তখন বিশ্বকাপ। যে কারণে এশিয়া কাপের তৃতীয় আসর বসে বাংলাদেশে। ১৯৮৮ সালের এশিয়া কাপকে ধরা হয় এশিয়া কাপের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আসর। ঢাকায় বসা সেই আসরে খেলেছিল এশিয়ার সেরা চার দল। সেবার দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা–উৎসব করে ভারত।

১৯৯০ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতায় এশিয়া কাপে যোগ দেয়নি পাকিস্তান। ’৯৩ সালের এশিয়া কাপ বাতিল হয়ে যায় ভারত-পাকিস্তান বৈরিতায়। অবশেষে ’৯৫ সালে আবারও চার দল নিয়ে এশিয়া কাপ নামে শারজায়। ২০০০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো বাংলাদেশে বসে এশিয়া কাপ। সেবারই প্রথম এশিয়া কাপের শিরোপা ঘরে তোলে পাকিস্তান। ২০০৪ সালে বৃদ্ধি পায় এশিয়া কাপের দলের সংখ্যা। শ্রীলঙ্কায় বসা সেই এশিয়া কাপে আমন্ত্রণ জানানো হয় সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকংকে। ২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের আসর বসে পাকিস্তানে। ভারতের অংশগ্রহণ নিয়ে অনেক জল্পনাকল্পনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত অংশ নেয় তারা। করাচির ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে শ্রীলঙ্কা জিতে নেয় এশিয়া কাপ।

এর পর থেকেই অবনতি হতে থাকে পূর্ব এশিয়ার ভূরাজনীতি। ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব এতটাই চরম পর্যায়ে পৌছায় যে বন্ধ হয়ে যায় ভারত-পাকিস্তান সিরিজ। এমনকি অলিখিতভাবে এশিয়া কাপের ভেন্যু হিসেবেও বাতিল হয়ে যায় দুই দেশ। যে কারণে পাঁচ বছরের মধ্যেই টানা তিনবার স্বাগতিক হিসেবে এশিয়া কাপ খেলার সৌভাগ্য হয় বাংলাদেশের। আর স্বপ্নভঙ্গের স্মৃতি শুরু সেখান থেকেই।

২০১২ সালে তৃতীয়বারের মতো এশিয়া কাপ বসে বাংলাদেশে। সেবারই প্রথম এশিয়া কাপের ফাইনালে জায়গা করে নেয় টাইগাররা। কিন্তু পাকিস্তানের কাছে মাত্র ২ রানে হেরে রানার্সআপ হয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয় স্বাগতিকদের। ২০১৪ সালে এশিয়া কাপে নতুন দল হিসেবে যোগ দেয় আফগানিস্তান। সেবার শিরোপা ঘরে তোলে শ্রীলঙ্কা।

২০১৫ সালে পরিবর্তন আসে এশিয়া কাপের ফরম্যাটে। আইসিসির নির্দেশনা অনুযায়ী আসন্ন বিশ্বকাপের ফরম্যাটের সঙ্গে মিল রেখে আয়োজন করতে হবে এশিয়া কাপ। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে আর ওয়ানডে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে ওয়ানডে ফরম্যাট। যে কারণে ২০১৬ এশিয়া কাপ আয়োজন হয় টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে। আবারও স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশের। ফাইনালে ভারতের কাছে হেরে দ্বিতীয়বারের মতো এশিয়া কাপের রানার্সআপ হয় টাইগাররা।

২০১৮ সালে এশিয়া কাপের ভেন্যু হিসেবে ভারতকে ঠিক করা হলেও শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসে পাকিস্তান। টুর্নামেন্ট চলে যায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ওয়ানডে ফরম্যাটের সেই টুর্নামেন্টের ফাইনালে তৃতীয়বার স্বপ্নভঙ্গ হয় বাংলাদেশের। ভারতের কাছে তিন উইকেটে হারে বাংলাদেশ।

২০১২ এশিয়া কাপ ফাইনালে সাকিব-মুশফিকের সেই কান্না

করোনার কারণে পরিত্যক্ত হয় ২০২০ সালের আসরটি, ২০২২ সালে আরব আমিরাতে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে বসে এশিয়া কাপের ১৫তম আসর। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই আবারও শুরু হয়েছে এশিয়া কাপ। কম জল ঘোলা হয়নি এবারের আসর নিয়েও। পাকিস্তানে হওয়ার কথা থাকলেও ভারতের আপত্তিতে এই প্রথম দুই দেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এশিয়া কাপ। কাগজে–কলমে পাকিস্তান স্বাগতিক হলেও এশিয়া কাপের পর্দা নেমেছে শ্রীলঙ্কাতেই। রাজনৈতিক অস্থিরতার বলি হলো আরেকটি এশিয়া কাপ।

আজ থেকে ৩৬ বছর আগে এশিয়া কাপের সূচনা হয়েছিল বিশ্বকে একটি বার্তা দিতে। পূর্ণাঙ্গ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে এশিয়া প্রস্তুত। আজ ৩৬ বছর পর, ১৫তম আসর শেষে এশিয়া কাপের অবস্থান বিশ্বকাপের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এশিয়া কাপে ক্রিকেট যতটা না আলোচনায় থাকে, তার থেকে হাজার গুণ বেশি আলোচনায় থাকে এশিয়ার ভূরাজনীতি। এশিয়া কাপ যেন এশিয়ার রাজনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতিচ্ছবি। প্রতিটি আসরে স্বাগতিক আর দলগুলোর অংশগ্রহণের দিকে এক নজর দিলেই বলে দেওয়া সম্ভব, কেমন ছিল তখন পূর্ব-এশিয়ার অবস্থা। এত কিছুর পর অবশেষে বল যখন মাঠে গড়ায়, তখন অবশ্য ক্রিকেটটাই হয়ে ওঠে মুখ্য।