ব্রাজিল তার প্রমাণও দেয় বিশ্বকাপে। সোভিয়েত ইউনিয়ন, ইংল্যান্ড আর অস্ট্রিয়ার গ্রুপ থেকে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয় ব্রাজিল। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে দেখা মেলে ১৭ বছর বয়সী এক খেলোয়াড়ের। ফুটবল-বিশ্বে রাজত্ব করার আহ্বান দিয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেক হয় তাঁর। নাম—এডসন অরান্তেস দো নাসিমেন্তো। সংক্ষেপে পেলে। ফুটবল-বিশ্বকে নিজের জাদুতে মুগ্ধ করার শুরু ছিল সেখান থেকে।

পেলের ম্যাজিক শুরু হয় কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়েলসের বিপক্ষে গোলের খাতা খোলেন পেলে। যদিও তাঁর উদ্‌যাপনের কারণে ইউরোপিয়ানদের কাছে হাসির পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু তা নিয়ে থোড়াই কেয়ার করতেন পেলে। সেমিফাইনালে ব্রাজিলের প্রতিপক্ষ ফ্রান্স। এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা জুস ফন্তেনের ফ্রান্স। আর সেই ফ্রান্সের বিপক্ষেই হ্যাটট্রিক করে বসেন পেলে। হয়ে যান বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ হ্যাটট্রিক করা ফুটবলার। ব্রাজিল আবারও ফাইনালে।

স্টকহোমের ফাইনালে ব্রাজিলের মুখোমুখি স্বাগতিক সুইডেন। কিন্তু ঝামেলা বাধে জার্সি নিয়ে। দুই দলেরই জার্সির রং হলুদ। টসে হেরে হলুদ জার্সির মায়া ছাড়তে হয় ব্রাজিলকে। শেষ মুহূর্তে এসে একজন পরামর্শ দেন তাদের কুখ্যাত সাদা জার্সি পরে মাঠে নামার। কিন্তু মুখের কথা মুখেই থেকে যায়, সাদা জার্সির পরিকল্পনা বাদ পড়ে যায় তালিকা থেকে। ব্রাজিল বেছে নেয় তাদের পুরোনো অ্যাওয়ে জার্সি—নীল।

স্বাগতিক হওয়ার ফায়দা নিতে প্রস্তুত সুইডেন মাঠের পাশে রেখেছিল চিয়ারলিডার। যাতে ব্রাজিল দলের খেলায় বিঘ্ন সৃষ্টি করা যায়। কিন্তু ব্রাজিল দলের অভিযোগে তা প্রত্যাহার করা হয়।

ম্যাচ শুরুর চার মিনিটের মাথায় সুইডেনকে এগিয়ে নেন অধিনায়ক নিলস লাইদহোম। সুইডিশদের আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল মাত্র ৫ মিনিট। ৯ মিনিটে ব্রাজিলকে সমতায় ফেরান ভাভা। ৩২ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন রিনি। ২-১ গোলে শেষ হয় প্রথমার্ধ। আর এরপর শুরু হয় ‘দ্য পেলে শো’, তর্কাতীতভাবে বিশ্বকাপ ফাইনালের অন্যতম সেরা পারফরম্যান্স।

ম্যাচের ৫৫ মিনিটে প্রথম ম্যাজিক দেখান পেলে। এরপর তার বানিয়ে দেওয়া বল থেকে ৬৮ মিনিটে গোল করেন মারিও জাগালো। আর সুইডেনের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেন পেলে নিজেই। ৯০ মিনিটে তাঁর করা গোলে ফাইনালের বাঁশি বাজে ৫-২ গোলে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা স্পর্শ করে ব্রাজিল।

স্টকহোমের রাসুন্দা স্টেডিয়ামে সেদিন ছিল পিনপতন নীরবতা। এমন নীরবতার সম্মুখীন ব্রাজিল আগেও হয়েছে। নিজেদের মাটিতে, নিজেদের খেলোয়াড়দের ভুলে নিজেদের দর্শকদের সামনে শিরোপা হাতছাড়ার গল্পটা তাদের দিয়েই লেখা হয়েছিল। সে গল্প পেছনে ফেলে নতুন শুরু স্বপ্ন দেখার সূচনা ছিল ১৯৫৮ বিশ্বকাপ। তবে এ তো ছিল কেবল শুরু।

১৯৬২ বিশ্বকাপ: মারদাঙ্গা এক বিশ্বকাপ

১৯৬২ বিশ্বকাপ যতটা না পরিচিত ফুটবলের জন্য, তার থেকে বেশি সমালোচিত ফুটবলের বাইরের ইতিহাসের জন্য। ফুটবল ইতিহাসে এমন সহিংস বিশ্বকাপের দেখা মেলেনি কখনো। আর তার সূচনা হয়েছিল বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর আগেই।

বিশ্বকাপ আয়োজন নিয়ে যখন সবার কাছ থেকে আবেদন চাচ্ছে ফিফা, তখনই অদ্ভুত এক দাবি করে বসে দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল ফেডারেশন, কনমেবল। দাবিটা হলো, যদি ১৯৬২ বিশ্বকাপ আমেরিকায় আয়োজন করা না হয় তবে আমেরিকান কোনো দলই অংশ নেবে না সেখানে। অদ্ভুত এ দাবিতে স্তম্ভিত হয়ে যায় ফিফা। বিশ্বজয়ী দলকে ছাড়া বিশ্বকাপ শুরু করার মতো অবস্থা তখনো হয়নি ফিফার। তাদের দাবি মেনে ১৯৬২ বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয় দক্ষিণ আমেরিকান দেশ চিলিতে।

বিশ্বকাপের আগেই হানা দেয় চিলিতে বিপর্যয়। ১৯৬০ সালের ভূমিকম্পে একপ্রকার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় চিলি। ফিফা তখন বিশ্বকাপ প্রজেক্ট সরিয়ে আনার চেষ্টা করে ফিফা। কিন্তু চিলির প্রেসিডেন্ট অনুরোধ করেন ফিফাকে, এই বিশ্বকাপ ছাড়া তাদের জন্য আর কিছুই বাকি নেই। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে মাত্র চার ভেন্যুতেই বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয় চিলি। আর সেখান থেকেই শুরু বিতর্কের।

ইউরোপের বাইরে বিশ্বকাপ নিয়ে সব সময় নারাজ থাকে ইউরোপবাসী। তার ওপরে যোগ হয়েছিল কনমেবলের জোরজবরদস্তি করে নিজেদের কাছে বিশ্বকাপ আয়োজনের স্বত্ব নিয়ে নেওয়া। বল মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই শুরু হয় সমালোচনা; চিলির জনগণ থেকে শুরু করে বিশ্বকাপ আয়োজন—সবকিছুকে একেবারে ধুয়ে দেয় ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যমগুলো। ফলে ম্যাচ শুরু আগেই যুদ্ধের আভাস তৈরি হয়েছিল ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে।

ফুটবলে তখনো কার্ডপ্রথার সূচনা হয়নি, রেফারিরা চাইলে মৌখিকভাবে খেলোয়াড়দের মাঠ থেকে সাময়িক সময়ের জন্য বহিষ্কার করতে পারতেন। মাঠে নিজেদের আধিপত্য দেখানোর জন্য সেটারই পূর্ণ সুবিধা নিয়েছে প্রতিটি দল। বিশ্বকাপের প্রথম দুই দিনে মোট চারজন খেলোয়াড়কে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেছেন রেফারিরা। পা ভেঙেছে তিনজনের। ভাঙা গোড়ালি ও চিড় ধরা বুকের পাঁজর নিয়ে মাঠ ছেড়েছেন অনেকে। এর মধ্যে ছিলেন গত বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় পেলেও। আর্জেন্টিনা-বুলগেরিয়া ম্যাচে রেফারি মোট বাঁশি বাজিয়েছেন ৬৯ বার, প্রতি ৭৮ সেকেন্ডে ১টি ফাউল হয়েছে মাঠে।

কিন্তু সবকিছু ছাড়িয়ে গিয়েছিল চিলি-ইতালি ম্যাচে। বিশ্বকাপের শুরু থেকে চিলিকে নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছিল ইতালির পত্রপত্রিকায়। মাঠের বাইরের কার্যক্রম নিয়ে আগে থেকেই উত্তপ্ত হয়ে ছিল পরিবেশ। ২ জুন সান্তিয়াগোর স্তাদিও নাসিওনালে মুখোমুখি হয় চিলি আর ইতালি। ইতিহাসের যার পরিচিতি ‘ব্যাটল অব সান্তিয়াগো’ নামে।

রেফারি বাঁশি বাজানোর পর থেকেই ফুটবল মাঠ পরিণত হয় রণক্ষেত্রে। ১২ সেকেন্ডের মাথায় প্রথম ফাউলের বাঁশি বাজান রেফারি। সেখান থেকে শুরু—১২ মিনিটের মাথায় ইতালিয়ান খেলোয়াড় জর্জিও ফেরারিকে মাঠের বাইরে পাঠান রেফারি। কিন্তু রেফারির সিদ্ধান্ত না মেনে উল্টো তার সঙ্গেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন জর্জিও। পুলিশ ডেকে তাঁকে পাঠানো হয় মাঠের বাইরে। ১০ মিনিট পর খেলা শুরু হতে না হতেই ইতালির অধিনায়কের মুখে ঘুষি বসিয়ে দেন চিলির লিওনেল সানচেজ। আরেক দফা হট্টগোল লেগে যায় মাঠে। প্রথমার্ধের শেষ মিনিটে ফ্লায়িং কিক করে দ্বিতীয় ইতালিয়ান হিসেবে মাঠ ছাড়েন মারিও ডেভিড।

দ্বিতীয়ার্ধেও বিন্দুমাত্র উন্নতি হয়নি ম্যাচের পরিস্থিতির। কাউকে মাঠ ত্যাগ করতে না হলেও প্রতি মিনিটেই বেজে চলছিল ফাউলের বাঁশি। ৯ জনের ইতালির বিপক্ষে সহজেই দুই গোলের লিড নিয়ে নেয় স্বাগতিক চিলি। অন্যদিকে ৯০ মিনিট পার হতে না হতেই ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজিয়ে দেন রেফারি কেন অ্যাস্টন। তাঁর মতে, সেই ম্যাচে আর এক মিনিটও মাঠে থাকা তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।

এই ম্যাচের প্রভাব পরে পুরো চিলিতে। বার, রেস্তোরাঁ নিষিদ্ধ করা হয় ইতালিয়ানদের। পুলিশি নিরাপত্তায় রাখা হয় ইতালিয়ান সমর্থক ও খেলোয়াড়দের। ইতালিতে চিলির রাষ্ট্রদূতের নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন করা হয় সেনাবাহিনী। সেবার গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয় ইতালি। এমনও শোনা যায়, ইতালির বিদায়ে স্বস্তির নিশ্বাস ছেড়েছিলেন অনেকে।

ইতালি বিদায় নিলেও বিশ্বকাপের পিছু ছাড়েনি সহিংসতা। বিশ্বকাপজুড়ে ফুটবল থেকে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে সহিংসতা। তবে এত কিছুর মধ্যেও ভাটা পড়েনি একটি জায়গায়—ব্রাজিলের ফর্ম। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডেই ইনজুরির কারণে পেলেকে হারিয়ে ফেলে ব্রাজিল। কিন্তু গারিঞ্চা আর ভাভার ওপর ভর করে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের পথে এগিয়ে যায় ব্রাজিল। কোয়ার্টারে ইংল্যান্ড ও সেমিতে চিলিকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনাল খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ব্রাজিল। কিন্তু ফাইনালেই পথেই বাধে বিপত্তি।

১৯৫৮ বিশ্বকাপ যদি হয়ে থাকে পেলের, তবে ১৯৬২ বিশ্বকাপ ছিল গারিঞ্চার। পেলের চোটের কারণে সবাই যখন ব্রাজিলকে দুর্বল ভাবতে শুরু করেছিল, তখনই ব্রাজিলের ত্রাতা হয়ে আসেন ‘ছোট পাখি’ গারিঞ্চা। বিশ্বকাপের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত গারিঞ্চা একাই টেনে এনেছেন ব্রাজিলকে। কিন্তু চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে তাঁকে মাঠের বাইরে বের করে দেন রেফারি। ফলে নিষেধাজ্ঞা জারি হয় ফাইনালে। যদিও শেষ মুহূর্তে বিশেষ বিবেচনায় গারিঞ্চাকে খেলার অনুমতি দেয় ফিফা। আর গারিঞ্চাই হয়ে ওঠেন ফাইনালে ব্রাজিলের রক্ষাকর্তা।

চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে নেয় ব্রাজিল। ফাইনালে গোল না করতে পারলেও পেছন থেকে ব্রাজিলের হয়ে ছড়ি ঘুরিয়েছেন গারিঞ্চাই। যদিও ব্রাজিলের দারুণ ফর্ম আর টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ মুছে দিতে পারেনি পুরো টুর্নামেন্টের কালিমা। এখনো ইতিহাসের সবচেয়ে সহিংস বিশ্বকাপ হিসেবে পরিচিত ১৯৬২ চিলি বিশ্বকাপ।