শচীনের তিন অধ্যায়

শচীন টেন্ডুলকারের আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ে প্রকাশিত হয়েছে ২০১৪ সালে। বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলোড়ন। সেই বই থেকে তাঁর শৈশব-কৈশোরের তিন অংশ নিয়ে এই রচনা।

বাবা তাঁর নাম রেখেছিলেন শচীন। প্রিয় সুরকার শচীন দেববর্মনের সঙ্গে মিলিয়ে। বাবা কি স্বপ্ন দেখেছিলেন, টেন্ডুলকারও বড় হয়ে একজন সুরকার হবেন!

সব সন্তানকে নিয়েই বাবার অনেক উচ্চাশা থাকে। টেন্ডুলকারের সাহিত্যিক বাবাও নিশ্চয়ই তেমন কোনো স্বপ্ন মনের সিন্দুকে জমিয়ে রেখেছিলেন। টেন্ডুলকার বাবার স্বপ্ন ঠিকই পূরণ করেছেন। হয়তো এসরাজ-সেতার কিংবা পিয়ানোতে নয়। কিন্তু সুর তো ঠিকই তুলেছেন। ব্যাট নামের বীণায়। কিন্তু টেন্ডুলকার ব্যাটসম্যান হিসেবে যত বড় মাপের, মানুষ হিসেবে যেন তার চেয়েও উঁচুতে বাঁধা তাঁর স্থান। আর এখানেই রমেশ টেন্ডুলকারের সার্থকতা।

আদর্শ মধ্যবিত্ত বাবা সন্তানের মনে সেই ছোটবেলাতেই আদর্শের, সৎ আর ন্যায়ের বীজ বুনে দিয়েছিলেন। যে কথা টেন্ডুলকার সারা জীবনে ভোলেননি। যে কথাগুলো ছিল তাঁর জীবনে চলার পাথেয়। নিজের আত্মজীবনীতেও সেই কথাগুলো তুলে ধরতে ভোলেননি টেন্ডুলকার। যে কথাগুলো হতে পারে যে কারও জীবনের জন্যই পথনির্দেশ:

‘বাবা, জীবনটা একটা বইয়ের মতো। এখানে অনেকগুলো অধ্যায় থাকে। থাকে অনেক শিক্ষা। সমাহার ঘটে বিচিত্র অভিজ্ঞতার। অনেকটা পেন্ডুলামের মতো। সেখানে সাফল্য যেমন আছে, ব্যর্থতাও আছে; আনন্দ আছে, দুঃখও আছে। এটাই বাস্তবতা। সাফল্য থেকে যেমন, একইভাবে ব্যর্থতা থেকে শেখাও সমান গুরুত্বের। কখনো কখনো তো সাফল্য আর আনন্দের চেয়ে ব্যর্থতা আর কষ্টই বড় শিক্ষক হয়ে ওঠে। তুমি একজন ক্রিকেটার, একজন ক্রীড়াবিদ। তোমার সৌভাগ্য, নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে পারছ। যেটা অনেক সম্মানের। কিন্তু কখনোই ভুলে যাবে না, এটাও সেই বইয়ের একটা অধ্যায় মাত্র।

‘একটা মানুষ কত দিন বাঁচে? ধরো সত্তর-আশি বছরের মতো। কিন্তু তুমি খেলবে কত দিন? ২০ বছর, খুব ভালো হলে হয়তো ২৫ বছর। এর থেকেই বোঝা যায়,

জীবনের একটা বড় অংশই তোমাকে খেলার বাইরে কাটাতে হবে। এর মানে একটাই। জীবনটা ক্রিকেটের চেয়ে অনেক বড়। আমি তাই তোমাকে বলব, বাবা, সব সময় শান্ত থাকবে, পা হড়কাবে না। সাফল্যকে কখনোই তোমার মধ্যে উদ্ধত আচরণের জন্ম দিতে দেবে না। যদি তুমি বিনয়ী হও, মানুষ তোমাকে সব সময় ভালোবাসবে, এমনকি খেলা ছাড়ার পরও। বাবা হিসেবে আমি তখনই বেশি খুশি হব, “শচীন দুর্দান্ত একজন ক্রিকেটার” বলার চেয়েও মানুষ যেন বেশি করে বলে, “শচীন মানুষ হিসেবে খুব ভালো”।’

সাইকেল-পাগল

সেই সব শৈশব। আর দশটা কিশোরের মতো তিনিও ছিলেন ভীষণ দুরন্ত, ভীষণ ছটফটে। দুষ্টুমিতে মাখামাখি ছিল তাঁর কৈশোর। এর-ওর বাগানের আম চুরি করে খাওয়া, চুপ করে অন্যের গায়ে পানি ঢেলে দেওয়া কিংবা কাউকে গর্তে ফেলে দিয়ে ভীষণ মজা পাওয়া।

তাঁর শৈশব ছিল স্বপ্নমাখাও। পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চেপে উড়াল দেওয়ার স্বপ্ন কোন কিশোরই বা না দেখে! শচীন টেন্ডুলকারও দেখেছিলেন। আর তাঁর পঙ্খিরাজ ছিল একটা বাইসাইকেল, যেটি কেনার জন্য কী ভীষণ জেদটাই না করেছিলেন তিনি। আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়েতে টেন্ডুলকারের সরল স্বীকারোক্তি, ‘ছেলেবেলায় আমি ভীষণ একগুঁয়ে আর জেদি ছিলাম।’

মুম্বাইয়ে তাঁদের সাহিত্য সহবাস কলোনিতে বন্ধুদের অনেকেরই সাইকেল ছিল। ছিল না শুধু তাঁর। টেন্ডুলকার তাই তাঁর বাবার কাছে গিয়ে জেদ ধরলেন, তাঁকেও কিনে দিতে হবে একটা সাইকেল। টেন্ডুলকারের বাবা ছেলেকে

কখনোই কোনো কিছুতে ‘না’ বলতেন না। তিনি টেন্ডুলকারকে কথা দিয়েছিলেন, কিনে দেবেন। কিন্তু কিছুতেই সেই দিনটি আর আসছিল না দেখে ভীষণ জেদ করে বাসা থেকে বের হওয়াই বন্ধ করে দিয়েছিলেন।

টেন্ডুলকার লিখেছেন, ‘আর্থিক দিক দিয়ে মুম্বাইয়ের মতো শহরে চারটি সন্তানকে মানুষ করা খুব সহজ কিছু ছিল না। কিন্তু মা-বাবা কখনোই আমাদের সেই কষ্টটা টের পেতে দেননি। তাঁদের কতটা কষ্ট করতে হবে, এটা না ভেবেই আমি গোঁ ধরে বসলাম, বাইরে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানালাম, যতক্ষণ না আমাকে নতুন একটা সাইকেল কিনে দেওয়া হচ্ছে। এখন শুনতে একটু হাস্যকর লাগছে বটে, কিন্তু আমি পুরো এক সপ্তাহ বাসা থেকে বের হইনি।’

যে ছেলেটা সারা দিন বাইরে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়, খেলে, যার বাসায় ফেরার কথা মনেই থাকে না, গিয়ে ধরে আনতে হয়; সেই ছেলেটা বাসা থেকে বের হচ্ছে না! স্বাভাবিকভাবেই চাপে পড়ে গিয়েছিলেন টেন্ডুলকারের বাবা। এ সময় একটা ভয়ানক দুর্ঘটনাও ঘটান টেন্ডুলকার।

বারান্দার গ্রিলের চৌখুপি দিয়ে মাথা বের করে বাইরে দেখছিলেন, কিন্তু এরপর কিছুতেই আর মাথাটা বের করে আনতে পারেননি। সেখানেই আটকে গিয়েছিল মাথা, প্রায় আধঘণ্টার মতো। মাথায় তেলটেল ঢেলে তার পরই তাঁর মা বের করে আনেন বুকের ধনকে। অবশেষে টেন্ডুলকারের জয় হয়। দেওয়া হয় একটা বাইসাইকেল।

কিন্তু প্রথম দিনেই সাইকেল নিয়ে এক সবজিওয়ালার ভ্যানে গিয়ে ধাক্কা লাগিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসেন। ডান চোখের সামান্য ওপরে একটা স্পোক ঢুকে যায়! সাইকেলটাও একরকম দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ার দশা। চোখের ওপরে আটটা সেলাই দিতে হয় টেন্ডুলকারকে। কিন্তু নিজের চোখের চেয়ে সাইকেলটা নিয়েই বেশি দুশ্চিন্তা হচ্ছিল কিশোর টেন্ডুলকারের।

আবার সুস্থ হয়ে সাইকেল চালানো শুরু করেন। একসময় কলোনির সবচেয়ে দক্ষ সাইকেলচালকে পরিণত হন। সাইকেল নিয়ে বিভিন্ন কারিশমা করে বন্ধুদের চোখ কপালে তুলে দিতেন। যেমন এক চাকায় ১০-১৫ ফুট পর্যন্ত স্লাইড করে যাওয়া। শুধু তা-ই নয়, মহল্লার একটা রেসেও জেতেন টেন্ডুলকার।

ছোটবেলা থেকেই আসলে তিনি ছিলেন চ্যাম্পিয়ন। সেটা আম চুরি হোক, দুষ্টুমি কিংবা সাইকেল চালানো!

প্রথম চায়নিজ খাওয়া

মা তাঁর কাছে পৃথিবীর সেরা রাঁধুনি। ছোটবেলায় খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন। মাও বেশ রেঁধে খাওয়াতেন। আর মায়ের হাতের রান্নার সেই অমৃত স্বাদ এখনো যেন জিবে লেগে আছে শচীন টেন্ডুলকারের।

মায়ের রান্নার কথা বেশ কয়েক জায়গাতেই লিখেছেন। আত্মজীবনী প্লেয়িং ইট মাই ওয়ের এক জায়গায় টেন্ডুলকার লিখেছেন তাঁর প্রথম চায়নিজ খাওয়ার অভিজ্ঞতার মজার গল্পও। আশির দশকের শুরুতে মুম্বাইয়ে চায়নিজ খাবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। নতুন সেই খাবারের স্বাদ নিতে বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে এক রেস্তোরাঁয় গিয়েছিলেন টেন্ডুলকার। সঙ্গে ছিলেন কয়েকজন বড় ভাইও। তখন তাঁর বয়স নয় বছর।

টেন্ডুলকার লিখেছেন, ‘চায়নিজ খাবারের কথা এত শুনেছি, কলোনির বন্ধুরা মিলে ঠিক করলাম সবাই একসঙ্গে মিলে খাব। প্রত্যেকে দশ রুপি করে দিলাম, যেটা সে সময় আমার জন্য ছিল অনেক টাকা। নতুন কিছু করছি ভেবে রোমাঞ্চিত ছিলাম। কিন্তু সেই সন্ধ্যাটা আমার জন্য শেষ পর্যন্ত ভয়াবহ হয়ে গেল, দলের মধ্যে সবচেয়ে ছোট হওয়ার মাশুল গুনতে হলো আমাকে।’

সবার ছোট হওয়ায় টেন্ডুলকার কীভাবে ঠকেছিলেন, সেই মজার গল্প লিখেছেন এভাবে, ‘শুরুতেই আমরা চিকেন আর সুইটকর্ন স্যুপের অর্ডার দিলাম। একটা লম্বা টেবিলে বসেছিলাম আমরা। আমি ছিলাম সবার শেষে। সমস্যা হলো, সবার হাত ঘুরে আমার কাছে পৌঁছানোর পর স্যুপের অল্প একটু মাত্র বাকি ছিল। দলের বড়রা প্রায় সবটুকুই সাবাড় করে দিয়েছে, ছোটদের জন্য রেখেছে অল্প খানিকটা। একই কাণ্ড ঘটল ফ্রাইড রাইস আর চাওমিনের বেলায়, বড়জোর দুই চামচ করে জুটেছে আমার ভাগ্যে!’

(কিশোর আলোর ডিসেম্বর ২০১৪ সংখ্যায় প্রকাশিত)