অপূর্ণ ইচ্ছা

অলংকরণ: রাকিব রাজ্জাক

আমার নাম আনন্দ। নাম আনন্দ হলেও আমার জীবন ও আমাকে নিয়ে কোনো আনন্দ নেই। আমি নিজের আনন্দটাও অন্যের কাছে প্রকাশ করতে পারি না। আমার পৃথিবীর রংগুলো দেখার খুব ইচ্ছা। কালো রং ছাড়া আর কোনো রংই আমার কাছে পরিচিত না। আমার জানতে ইচ্ছে করে, মানুষ যে বলে গাছের রং সবুজ, আকাশের রং নীল, কিন্তু সেগুলো দেখতে কেমন!

আমার জীবনেও নাকি একসময় আনন্দ ছিল। যখন আমি দেখতে না পেলেও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারতাম। আমার পাঁচ বছর বয়সে কোনো এক রোগের কারণে আমি আমার বাক্‌শক্তিও হারাই। তবে অল্পের জন্য শ্রবণশক্তিটা বেঁচে যায়। অর্থাৎ শুনতে পারি, কিন্তু খুব অল্প। এই তো শুরু হয় আমার জীবনের নিরানন্দের দিন।

আচ্ছা, আমি যে তাদের ইশারা করে কিছু বোঝাতে চাই, তা কি তারা বোঝে? মনে তো হয়, না। কারণ সবাই শুধু আমার সামনে এসে চুপ করে বসে থাকে।

আমাকে জানালার পাশের একটা রুমে রাখা হয়। এই জানালা দিয়ে নাকি সবুজ মাঠ, গাছপালা আর নীল আকাশ দেখা যায়। আমি দেখতে পারি না, বলতে পারি না, কিছু করতেও পারি না; শুধু হুইলচেয়ারে বসে থাকা ছাড়া। তবে কেউ কখনো খুশি হলে বা দুঃখ পেলে আমি কীভাবে যেন তা বুঝতে পারি!

আমাকে যখন কেউ এই জানালার পাশের মাঠে বেড়াতে নিয়ে যায়, আমি তখন বাতাস, আশপাশের বাচ্চাদের চিৎকার আর আমার পেছনে থাকা মানুষটির দুঃখ অনুভব করতে পারি। সে হয়তো মনে মনে ভাবে, আজ যদি আমার আনন্দও ওদের সঙ্গে আনন্দ করতে পারত!

আমি আসলে কিচ্ছু চাই না। শুধু এই পা–গুলোতে সবুজ ঘাসের ছোঁয়া লাগাতে চাই। শুধু একবার নীল আকাশ দেখতে চাই। আমার হুইলচেয়ারের পেছনে থাকা মানুষটার চোখের পানি মুছে একবার দুজন মিলে হাসতে চাই।

আজ আমার কেমন যেন লাগছে! চোখ খুলেই দেখি আমি আমার জানালার পাশের সেই মাঠে শুয়ে আছি। আমি কীভাবে যেন দাঁড়াতে পারছি। সবুজ রং দেখছি, দেখতে পাচ্ছি আকাশের নীল রং। ঘাসে পা রেখেছি। এই প্রথম আমার মধ্যে আনন্দ অনুভব করতে পারছি। আরে! ওই তো, হুইলচেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি! দাঁড়িয়ে আছে ওই যে। সে কি ভাবছে তার ছেলে এখানে কীভাবে এল? প্রথমবার তার ছেলের আনন্দ দেখে তার কেমন লাগছে? আনন্দ দৌড়ে এগিয়ে গেল তার মাকে জড়িয়ে ধরার জন্য। চোখের পলকেই এক চলন্ত ট্রাকের সঙ্গে ধাক্কা খেল সে।

তার সব ইচ্ছা পূরণ হলেও হুইলচেয়ারের পেছনে থাকা মানুষটির চোখের পানি মুছে দেওয়ার ইচ্ছা আর পূরণ হলো না।