ফিরিয়ে দাও

অলংকরণ: সাদিয়া আফরোজ চৌধুরী

সেদিন অনেক দিন পর আমাকে দেখে এক আন্টি বলল, ‘কী, বড় হয়ে গেছ তো অনেক।’ আসলেই তো বড় হয়ে গেছি আমি। ষোলোটা বছর কেটে গেছে জীবন থেকে। এখন আমি বড়, নিজের কাজ নিজে করতে পারি। নিজের হাত দিয়ে খেতে পারি, যখন খুশি বাইরে যেতে পারি। আমি তো স্বাধীন। এটাই তো চাইতাম ছোটবেলায়। অপেক্ষায় থাকতাম, কবে বড় হব। তবু বড় হওয়া এই ছেলের মন অ্যালজেব্রা আর ত্রিকোণমিতির উটকো প্যাঁচ থেকে ছুটে যেতে চায় মীনা কার্টুন, সিসিমপুরের দুনিয়ায়। সেখানে কোনো লোভ নেই, স্বার্থপরতা নেই, নেই দুনিয়ার কঠিন সব বিষয় নিয়ে ভাবনা। তাই তো আজ বন্ধুদের সঙ্গে হইহল্লা করে স্কুলে গেলেও মনে পড়ে যায় বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া সে দিনগুলো। যাওয়ার পথে আইসক্রিমওয়ালা দেখে যখন বলতাম, ‘বাবা আইসক্রিম খাব।’ তখনই বাবা গম্ভীর হয়ে বলত, ‘না, আইসক্রিম খেলে টনসিল হবে।’ কই আজ তো ইচ্ছেমতো আইসক্রিম খেতে পারি, কেউ বারণ করে না। তবু কেন মনে পড়ে সেই দিনগুলো? কেন মনের মাঝে উঁকি দেয় পড়তে না বসায় মায়ের বকুনির কথা? বাসায় চকলেট আনলে কে বেশি পাবে তা নিয়ে ছোট বোনের সঙ্গে মারামারি। ফেসবুকে চ্যাট করতে গিয়ে হঠাৎ চোখের সামনে ভেসে ওঠে মায়ের কোলে শুয়ে রূপকথার গল্পে মুগ্ধ হয়ে যাওয়া বালকটির মুখ। যে ভাবত, আসলেই বুঝি পঙ্খিরাজ আছে পৃথিবীতে। সেও স্বপ্ন দেখত পঙ্খিরাজে চেপে রাক্ষসদের হাত থেকে রক্ষা করবে রাজকুমারীকে। নির্বোধ, সরল আর দুষ্টুমিতে সেরা সেই ছেলেটি আজ আর সে রকম নেই। আজ সে বড় হয়েছে, বুঝতে শিখেছে যে সে কখনো পঙ্খিরাজ পাবে না, হতে পারবে না স্পাইডারম্যান। শত রং-তুলির আঁচড়ে গড়ে ওঠা স্বপ্নিল সেই ছেলেটির জগৎ আজ ঘোলাটে হয়ে গেছে। ঘোলাটে সেই জগতে শত ব্যস্ততার মাঝে ছেলেটি খুঁজে বেড়ায় স্মৃতির পাতায় আঁকা রঙিন সেই অতীতগুলো। ফিরে পেতে চায় মায়ের কোলে গল্প শোনা সে রাতগুলোকে, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়া সেই পথকে। ছোট বোনের সঙ্গে মারামারি করা সেই মুহূর্তগুলোকে। তার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা করে, ফিরিয়ে দাও স্মৃতিতে ভরা আমার শৈশবকে।