মজার মানুষ কাজী নজরুল ইসলাম

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ছিলেন খুব রসিক মানুষ। কাছের মানুষের সঙ্গে মজার মজার সব ঘটনা আছে। এখানে থাকল তাঁকে ঘিরে পাঁচটি মজার ঘটনা।
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

গজল লেখা

নজরুল তখন প্রচুর হামদ, নাত, গজল লিখছিলেন। সেগুলো খুব জনপ্রিয়ও হচ্ছিল। একদিন সকালে লোকসংগীতশিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ নজরুলের বাসায় গেলেন। দুই দিন আগে নজরুল তাঁকে একটি গজল লিখে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেটা নিতে এসেছেন। এভাবেই বাউন্ডুলে নজরুলকে ধরেবেঁধে অনেকে লেখা আদায় করতেন।

আব্বাসউদ্দীন দেখলেন, গভীর মনোযোগে নজরুল কী যেন লিখছেন। শিল্পীকে দেখে নজরুল ইশারায় বসতে বললেন। অনেকক্ষণ বসে রইলেন। দুপুরে জোহরের নামাজের সময় হয়ে গেল। তবু কবি কিছু বলছেন না। আব্বাসউদ্দীন উসখুস করতে লাগলেন।

নজরুল এবার বললেন, ‘কী, তাড়া আছে? যেতে হবে?’ আব্বাসউদ্দীন জানালেন, তাড়া নেই। কিন্তু জোহরের নামাজ পড়তে হবে। আজ তিনি এসেছেন গজল নেওয়ার জন্য। না নিয়ে ফিরবেন না।

নামাজের কথা শুনে নজরুল একটি পরিষ্কার চাদর বের করে দিলেন। আব্বাসউদ্দীন নামাজ পড়তে লাগলেন। নজরুল আবার লেখায় মনোযোগ দিলেন।

নামাজ পড়া শেষ হলে আব্বাসউদ্দীনের হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিলেন নজরুল। হাসতে হাসতে বললেন, ‘এই নাও তোমার গজল।’

আব্বাসউদ্দীনের নামাজ পড়ার সময়টুকুতে একটি নতুন গজল লিখে ফেলেছিলেন কবি নজরুল।

কৌশলে আম খাওয়া

এমনই এক গ্রীষ্মের দুপুরে নজরুল সপরিবারে গরুরগাড়িতে করে যাচ্ছিলেন। অনেক দূরের পথ। বেজায় গরমে নাভিশ্বাস অবস্থা সবার। পথে এক আমবাগান দেখে বিশ্রাম নিতে সবাই থামলেন। বাগানে আমগুলো তখন সবে পাকছে। রং আসছে। নজরুলের খুব লোভ হলো।

এক নারী বাগান পাহারা দিচ্ছিলেন। তাঁর সঙ্গে নজরুল জুড়ে দিলেন গল্প। কথায় কথায় জেনে নিলেন, ওই নারীর স্বামী বাগানের মালিকের বাড়িতে পাকা আম পৌঁছে দিতে গেছেন। নজরুল অবাক ভাব করে বললেন, ‘মাসি, আমরা তো সেই বাড়ি থেকেই আসছি। কিন্তু সেখানে তো ও রকম কাউকে দেখলাম না! আমি ও বাড়ির বড়মিয়ার ছোট জামাইয়ের ভাই। আজ চলে যাচ্ছি। বড়মিয়া বললেন, বাগান দিয়ে গেলে আম নিয়ে যেয়ো। তাই তো থামলাম। আচ্ছা মাসি, কোন গাছের আম মিষ্টি বলো তো!’

নজরুলের আর কিছু করতে হলো না। মাসিই সব ব্যবস্থা করে দিলেন।

ইলিশ আর বিড়ালের কামড়

বর্তমান বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে একবার নিখিলবঙ্গ মুসলিম সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে নজরুল এসেছিলেন। কবির সম্মানে দুপুরে এক বাংলোতে ভোজের আয়োজন হয়েছে। কবির সঙ্গে আরও অনেকে খেতে বসেছিলেন। প্রথমে কবির পাতে এক টুকরা ইলিশ দেওয়া হলো। পদ্মার ইলিশ খেয়ে কবি খুব প্রশংসা করলেন। ইলিশের ব্যাপক প্রশংসা শুনে খাবার পরিবেশনকারী ছেলেটি তাঁকে আরেক টুকরা ইলিশ দিলেন। সেটিও কবি খেলেন তৃপ্তিসহকারে। তৃতীয় টুকরা ইলিশ দিতে ছেলেটি কাছে আসতেই কবি এবার বলে উঠলেন, ‘আরে, করছ কী? এত মাছ খেলে শেষকালে আমাকে বিড়ালে কামড়াবে যে!’

উলটো বিয়ের প্রস্তাব

নজরুলের বাড়ির প্রতিবেশীর মেয়ের বিয়ে। বেশ ধুমধাম আয়োজন। বিয়েবাড়ি ভর্তি মানুষ। কিন্তু নজরুলকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। এ অবস্থায় নজরুল এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটালেন। রোগাপটকা একটি ঘোড়া জোগাড় করলেন, তার ওপর বসালেন বিদঘুটে চেহারার এক লোককে। তাঁর মুখভর্তি দাড়িগোঁফ। পোশাকও শতছিন্ন, ধূলিমলিন।

সেই লোককে নজরুল নিয়ে গেলেন বিয়েবাড়িতে। প্রতিবেশী বাড়ির গিন্নিকে ডেকে বললেন, ‘মাইজি, তোমার মেয়ের জন্য বর এনেছি। পছন্দ হয়নি?’

গিন্নিও কম যান না। উলটো রসিকতা করে বললেন, ‘আমি তো বাপু ভেবে রেখেছি তোমার সঙ্গেই আমার মেয়ের বিয়ে দেব।’

অত মানুষের সামনে এই প্রস্তাব শুনে নজরুল লাজে লাল হলেন। ঘোড়াসহ লোকটিকে রেখেই চম্পট দিলেন বিয়েবাড়ির ত্রিসীমানা থেকে।

গান গাই, তাই পান খাই

নজরুল খুব পান খেতে ভালোবাসতেন। আর গানও গাইতেন খুব ভালো। সারা রাত নজরুল গান গেয়ে চলেছেন, মুগ্ধ হয়ে শুনছেন শ্রোতারা, একসময় এ ছিল চেনা দৃশ্য। গানের ফাঁকে ফাঁকে চলত পান খাওয়া।

একদিন এক গানের আসরে চা-মুড়ি খেয়ে নজরুল মুখে পান ঢুকাতে যাবেন, এই সময় একটি ছোট্ট মেয়ে মিষ্টি হেসে প্রশ্ন করে বসল, ‘তুমি এত পান খাও কেন?’

প্রশ্ন শুনে নজরুলের সে কী হাসি! হো হো করে হাসতে হাসতেই মেয়েটিকে মিষ্টি স্বরে উত্তর দিলেন, ‘গান গাই যে!’

সূত্র: আব্বাসউদ্দীন আহমদের দিনলিপি ও আমার শিল্পীজীবনের কথা, তাপস রায়ের ‘নজরুলের রসিকতা’ (প্রথম আলো, ২২ মে ২০১৭)