হারানো শব্দের খোঁজ

অলংকরণ: রাকিব রাজ্জাক

এক মৌন অথচ রোমাঞ্চিত বিকেলে চুপচাপ বসে ওল্টাচ্ছিলাম গল্পের বইয়ের পাতা। তবে মন যেন গল্পের বইয়ের পাতায় আশ্রয় করে নিতে পারল না। পঞ্চদশ পাতার অক্ষরগুলো নিরুদ্দেশ কোনো পাখির মতো আমার অবাক-নিভৃত মনটাকে কোনোরূপ সাড়া না দিয়েই যেন উড়ে যেতে লাগল নীল আকাশে। বাধা দিলাম না আমি। তবে মনটা হয়ে উঠল বিষণ্ন।

ঠিক এই সময় বিষণ্ন মনটাকে নাড়া দিতে জানালার পাশের গাছটার ডালে ডেকে উঠল একটা পাখি। আমার মন যেন পেয়ে গেল ওই অক্ষরগুলোর ঠিকানা।

পাখিটার ডাকে আমার মন আর সায় না দিয়ে পারল না। পাখিটাকে কাছে ডাকলাম।

- এই পাখি, শুনছ?

পাখিটা একটু স্তম্ভিত ভাব নিয়ে আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যে সে যেন আমাকে চেনেই না। অথচ গত পরশু দিনই এত বড় একটা বিপদ থেকে বাঁচালাম!

সেদিন স্কুল থেকে ফিরছিলাম। ভর দুপুরবেলা। বাসার কাছাকাছি আসতেই একটা ঘটনা আমার চোখে পড়ল। আমাদের ফলবাগানটার একটা গাছে বসে একটা পাখি (মানে এই পাখিটি) একটা মধুর গান ধরেছিল। সেই মধুর গানের প্রশংসা তো করতেই হয়। তো আমি গাছটার দিকে এগিয়ে গেলাম। প্রায় কাছেই চলে এসেছি। এবার একটা ভীতিকর জিনিস আমার চোখে পড়ল। একটা সাপ গাছটা বেয়ে পাখিটাকে খাবার জন্য উঠছিল।

যদি সাপটা গাছ বেয়ে উঠে পাখিটাকে খেয়ে নেয়!এখন কী করা যায়!

এখন আমি যদি পাখিটাকে বাঁচাতে চাই, তাহলে একটাই উপায় আছে। সেটা হলো সাপটাকে হাত দিয়ে ধরে ছুড়ে ফেলে দেওয়া। কারণ পাখিটা একমনা হয়ে শুধু গান গাচ্ছিল।

এসব ভেবেই আমি সেই দুঃসহ কাজটি করে ফেললাম। সাপটা মাথা ধরে দূরে ছুড়ে ফেললাম। তবে একটু হলেই সাপটা আমাকে কামড়ে দিত! তখন হয়তো আমি কাতরাতে কাতরাতে ওখানেই শেষ হয়ে যেতাম বা বেঁচে যেতাম। কিন্তু পাখিটাকে অমন অবস্থায় ছেড়ে দিলে সে তো বাঁচত না।

পাখিটাকে বাঁচাতে এত বড় একটা ঝুঁকি নেওয়ার পরও তার কোনো প্রতিদান পেলাম না!

তবে কিছুক্ষণ ধৈর্য ধরেই সেই প্রতিদান পেয়ে গেলাম।

সে বলে উঠল, ও, চিনতে পেরছি! তুমিই তো আমার জীবন বাঁচিয়েছিলে; নিজের জীবন বাজি রেখে! আমি জানি এ ঋণ কোনো দিনও শেষ হবে না। তবে খানিকটা মনে হয় শোধ হতে পারে। আমিই তোমার বইয়ের সেই অক্ষরগুলো, যেগুলোকে তুমি ফিরে পেতে চাও। আমি রাজি!

আমার মন সেগুলোকে জড়িয়ে নিতে পারল না। সে নিজেই পাখিটার অক্ষরে জড়িয়ে গেল।

লেখক: শিক্ষার্থী, পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চবিদ্যালয়, রংপুর।