আলসে বিড়াল আর পাজি তেলাপোকার গল্প

উজ্জ্বল নীল রঙের শরীর আর সবুজ চোখের একটা অলস বিড়াল, নাম অগি। পুরো বিড়ালজীবন সম্পর্কে তার একটাই দর্শন, খাব, টিভি দেখব, আবার খাব, আবার টিভি দেখব, আর সারাক্ষণ অলসতা করব! জীবন সম্পর্কে এর চেয়ে বেশি উচ্চাশা তার নেই!

দুনিয়ার সব দর্শনের বিপরীত দর্শন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। সেই স্বাভাবিকতাকে টিকিয়ে রাখতেই তাই খোদ অগির বাড়িতেই ভেন্টিলেটরের ভেতর ধ্বংসযজ্ঞের ফিকিরে ব্যস্ত থাকে তিনটা তেলাপোকা, সম্পর্কে তারা একে অপরের ভাই এবং ‘ভাইগিরি’তে তারা সর্বদা দুপায়ে খাড়া!

তিন তেলাপোকার জীবনের একটাই লক্ষ্য, অগির ফ্রিজের খাবারে হানা দাও, অগির মুখের খাবার ছিনিয়ে নাও, খাবার টেবিল থেকে ঘুমানোর বিছানা, টিভির রিমোট থেকে টয়লেটের কমোড, সর্বত্র নিজেদের দখল রাখো। মোদ্দাকথা, নিজেদের নাক কেটে হলেও অগির আলসে জীবনটাকে বিষিয়ে তোলা।

অগির জীবনকে সর্বদা বিষিয়ে তুলতে ব্যস্ত এই ভাইদলের অঘোষিত নেতা হলো বড় ভাই জোয়ি। দলের যত সব আজগুবি পরিকল্পনা তার মাথা থেকেই আসে। যদিও তার অন্য দুই সদস্য তার এসব পরিকল্পনাকে গাধার বুদ্ধি এবং হাস্যকর হিসেবে আখ্যায়িত করে। তবু জোয়ির তাতে কচুটা যায় আসে!

মার্কি হলো এই ভাইদের মধ্য উচ্চতায় সবচেয়ে লম্বা, আর বুদ্ধিতে সবার চেয়ে খাটো! যদিও মোটা বুদ্ধি, তবু মোটা বুদ্ধি, মুখে বিকট দুর্গন্ধ আর বই পড়ে পড়ে নিজেই নিজেকে সেরা ভেবে নিয়ে নিজের জীবনকে সে দিব্যি হেসেখেলে উড়িয়ে যাচ্ছে এবং এসব নিয়ে তার কোনো অভিযোগও নেই।

এই দলের সবচেয়ে ছোট ও মোটা সদস্য হলো ডি ডি। ডি ডিকে তোমরা সবাই চেনো, ওই যে তোমার ক্লাসের ওই বন্ধুটি আছে না, যে সারাক্ষণ খালি খাই খাই করে, খাদ্য–অখাদ্য কোনোটাতে যার অরুচি নেই, সেটাই হলো ডি ডি। খাদ্যরসিক এই তেলাপোকার খিদে পেলে তাকে সুপারম্যানও থামাতে পারবে না!

তো এই তিন তেলপোকা আর দুনিয়ার সবচেয়ে আলসে বিড়াল অগিকে নিয়েই ফরাসি অ্যানিমেটর ও স্ক্রিনরাইটার জিন ইয়েভস রেইমবাউড তৈরি করে ফেলেন দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পাওয়া অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস।

আরও পড়ুন

অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস–এর প্রথম পর্ব মুক্তি পায় ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বরে, কিন্তু তার মাস তিনেক আগেই লাং ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে জিন ইয়েভস মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুতে থেমে থাকেনি তাঁর সৃষ্টি। অলিভার জাঁ মারি ও থমাস জাবোর পরিচালনায় জাইলাম অ্যান্ড গোমাউন্ট ফিল্ম কোম্পানি থেকে একের পর এক বের হতে থাকে অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস–এর পর্ব। ৭টা সিজন মিলিয়ে যা এখন পর্যন্ত ৫০১টা পর্বে নটআউট আছে।

বিড়াল–তেলাপোকার এই মজার পর্বগুলো লুফে নিতে দেরি করেনি গোটা বিশ্ব। অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস মূলত ফ্রান্সের টিভি সিরিজ হলেও বর্তমানে সারা বিশ্বেই ব্যাপক জনপ্রিয় আলসে বিড়াল আর দুষ্টু তেলাপোকারা!

কী এমন মজা আছে অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস–এর, যে দুনিয়াসুদ্ধ কার্টুনপ্রিয় মানুষের মনে এভাবে জায়গা করে নিল? সেটার উত্তর আছে অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস–এর প্রতিটি পর্বেই।

অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস হলো বিড়াল আর তেলাপোকার এমন সব খুনসুটির গল্প, যা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বন্ধু-বান্ধব কিংবা আশপাশের সবার মধ্যে বাস্তবে বা কল্পনাতে লেগেই থাকে।

এই যে যেমন ধরো অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস: দ্য ম্যাজিক পেন পর্বের কথা। এক ডাইনি বুড়ি তার জাদুর ঝাড়ুতে করে উড়ে যাচ্ছিল অগির বাড়ির ঠিক ওপর দিয়ে। অসাবধানে তার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা পেনসিল পড়ে একেবারে ডি ডির কাছে। ডি ডি তার স্বভাববশত সেটা কামড় দিয়ে খেতে গিয়ে না পেরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আবিষ্কার করে, সেটা একটা জাদুর পেনসিল! পেনসিল দিয়ে যেটাই আঁকা হয়, সেটাই বাস্তব হয়ে যায়। এই পেনসিল জোয়ির হাতে পড়তেই তার মাথায় মুহূর্তে অগিকে বিরক্ত করার কুটবুদ্ধি খেলে যায়। সে অস্ত্রধারী সৈন্য এঁকে লেলিয়ে দেয় অগির ওপর! অগিও কম যায় না, ইরেজার নিয়ে সেও রুখে দাঁড়ায় তেলাপোকা বাহিনীকে! তারপর? তারপর সে এক মজার যুদ্ধ, দেখতে দেখতে হাসির চোটে পেট ব্যথা হয়ে যেতে বাধ্য!

আরেক দিনের কথা, অগি তার জীবনের সব শক্তি ও মনোযোগ কাজে লাগিয়ে রোজকার রুটিনমাফিক তার বাড়ির উঠানে বসে বালিশ মাথায় ঝিঁমুচ্ছিল। এমন সময় তার কাছে এক বাক্স চকলেট পার্সেল আসে। বাক্স খুলে সবে সে একটা চকলেটে কামড় দিতে যাবে, অমনি হাজির পাজির পাঝাড়া তেলাপোকা বাহিনী। চকলেটের বাক্স নিয়ে মুহূর্তে হাওয়া তারা! চকলেট উদ্ধারে অগিকেও অলসতা ভুলে নেমে পড়তে হয় অভিযানে!

এ রকম ছোট ছোট দুর্দান্ত সব মজার পর্ব নিয়ে অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেস এখন দুনিয়ার সবচেয়ে প্রিয় কার্টুন সিরিজগুলোর একটি।

শুধু অগি আর তিন তেলাপোকাই নয়, পুরো সিরিজ আরও অনেক মজার চরিত্র দিয়ে ভরপুর। অগির চাচাতো ভাই জ্যাক, সে মূলত মিলিটারিতে আছে। ছুটি পেলেই সে অগির বাড়িতে চলে আসে এবং তেলাপোকার হাত থেকে অগিকে বাঁচাতে গিয়ে বারবার আরও ঘট পাকিয়ে ফেলে!

এ ছাড়া অগির বাড়ির একপাশের পড়শি বুলডগ বব আর আরেক পাশের পড়শি অলিভিয়ার। বব মূলত পড়শির তাবত ব্যাপার নিয়ে খিটমিট করে বাড়ি মাথায় তোলা পড়শির প্রতিরূপ, আর অলিভিয়া হলো পাশের বাড়ির সে–ই, যাকে দেখলেই অগির চোখে হার্টশেপ জেগে ওঠে!

এ রকম আরও মজার মজার চরিত্র নিয়ে পুরো অগি অ্যান্ড দ্য ককরোচেসই একটা মজার ডিব্বা। ডিব্বা একবার খুললে আর ঢাকনা লাগাতেই ইচ্ছা করে না। এই ডিব্বায়ই বুঁদ হয়ে থাকতে থাকতে কখন যে মজায় মজায় সময় চলে যায়, টেরই পাওয়া যায় না। তোমরা যারা এখনো এই অলস বিড়াল আর তিন পাজি তেলাপোকার কার্টুনগুলো দেখোনি, তারা জলদি দেখে ফেলো। নয়তো কার্টুন দেখার অর্ধেক মজা থেকেই হয়তো বঞ্চিত হয়ে যাবে!

আরও পড়ুন