৬০ হাজার বছর আগে মানুষ বিষ দিয়ে শিকার করেছে, গবেষণায় নতুন তথ্য
এখন তো আমাদের কাছে বিষয়টা একদম স্বাভাবিক। আগুন জ্বালানো, গুহার দেয়ালে ছবি আঁকা বা চাকা আবিষ্কারের মতো আমরা জানি যে মানুষ একসময় তিরের মাথায় বিষ মাখিয়ে শিকার করত। কিন্তু মানুষ প্রথম কবে বুঝতে পেরেছে যে তিরে বিষ মাখিয়ে দূর থেকেই প্রাণীকে ঘায়েল করা যায়? নতুন এক গবেষণা জানাচ্ছে, এই কৌশল মানুষ শিখেছে আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক আগে।
দক্ষিণ আফ্রিকার মাটির নিচে পাওয়া ৬০ হাজার বছরের পুরোনো তিরের মাথায় বিজ্ঞানীরা বিষের চিহ্ন পেয়েছেন। এর আগে বিষ ব্যবহারের যে প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, তার বয়স প্রায় ৩৫ হাজার বছর। সে হিসাবে এই আবিষ্কার মানব ইতিহাসে বিষমাখানো অস্ত্র ব্যবহারের সময়সীমাকে একলাফে আরও প্রায় ২৫ হাজার বছর পিছিয়ে দিল। স্টকহোম ইউনিভার্সিটির প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী অধ্যাপক সভেন ইসাকসনের নেতৃত্বে গবেষক দলটি সায়েন্স অ্যাডভান্সেস জার্নালে এই ফল প্রকাশ করেছে।
ইসাকসনের কথায়, এটা একটা বিশাল পরিবর্তন। হতে পারে, মানুষ এরও আগে বিষ ব্যবহার করত। এখন পর্যন্ত এটিই সবচেয়ে পুরোনো প্রমাণ। তাঁর মতে, এই আবিষ্কার দেখায় যে প্রাচীন হোমো স্যাপিয়েন্সদের চিন্তাশক্তি আধুনিক মানুষের কাছাকাছিই ছিল।
তিরের টুকরাগুলো আসলে নতুন করে পাওয়া নয়। ১৯৮৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার পূর্বাঞ্চলের উমলাতুজানা রক শেল্টার থেকে এগুলো উদ্ধার করা হয়েছিল। উমলাতুজানা রক শেল্টারের স্তরে স্তরে জমে আছে হাজার হাজার বছরের মানব বসবাসের চিহ্ন। বহু বছর পর গবেষকদের চোখে পড়েছে যে কোয়ার্টজ পাথরের তৈরি কয়েকটি তিরের মাথা অস্বাভাবিকরকম ছোট। এই ছোট আকারই ইঙ্গিত দেয়, এগুলো হয়তো জোরে আঘাত করার জন্য নয়, বরং বিষ দ্রুত শরীরে ঢোকানোর জন্য বানানো হয়েছিল।
এরপর শুরু হয় সূক্ষ্ম রাসায়নিক ও অণু-পর্যায়ের পরীক্ষা। এতেই দুটি বিষাক্ত যৌগ ধরা পড়ে। বুফানিড্রিন ও এপিবুফানিসিন নামে দুটি বিষের উৎস সম্ভবত বুফোন ডিস্টিচা নামের এক উদ্ভিদ, যাকে স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘বুশম্যানস পয়জন বাল্ব’। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখনো এই গাছের বিষ দক্ষিণ আফ্রিকার সান ও খোই জনগোষ্ঠীর কিছু ঐতিহ্যবাহী শিকারপদ্ধতিতে ব্যবহৃত হয়। এই বিষ শিকারকে সঙ্গে সঙ্গে মেরে ফেলে না, বরং ধীরে ধীরে দুর্বল করে, যেন শিকারি সহজে শিকারকে অনুসরণ করতে পারেন।
এমন বিষ ব্যবহার করা মানে শুধু তির বা অস্ত্রে মাখানো নয়। এর পেছনে দরকার ছিল স্থানীয় গাছপালা নিয়ে গভীর জ্ঞান। কোন অংশ কতটা বিষাক্ত আর ঠিক কতটা দিলে শিকার অচল হবে, এসব হিসাব দরকার হয়েছে। ইসাকসনের মতে, এর জন্য মস্তিষ্কে উন্নত কার্যকর স্মৃতি দরকার। প্রাচীন শিকারিকে আগে থেকে ভাবতে হয়েছে, এই তিরের ডগায় ওই গাছের অংশ লাগালে কত সময়ের মধ্যে মাংস পাওয়া যাবে।
ডেনমার্কের আরহুস ইউনিভার্সিটির প্রত্নতত্ত্ববিদ ফেলিক্স রিডে এই আবিষ্কারকে ‘অসাধারণ’ বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি সম্ভবত এখন পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে বিষ ব্যবহারের সবচেয়ে পুরোনো প্রমাণ। একই সঙ্গে এই গবেষণা দেখিয়েছে যে অতি প্রাচীন পাথরের অস্ত্রের গায়ে লেগে থাকা ক্ষুদ্র অবশিষ্টাংশ থেকেও বিষের নমুনা উদ্ধার করা সম্ভব।
৬০ হাজার বছর আগে বিষের ব্যবহার প্রমাণ করে, তখনকার মানুষ আমাদের মতোই জটিল ছিল।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস