স্কুলের হোমওয়ার্ক হোক বা কোটি টাকার চুক্তি, সবই সামলাচ্ছে চ্যাটজিপিটি
কাল পরীক্ষা, কিন্তু কিছুই পড়া হয়নি। এখন সাহায্যের জন্য কার কাছে যাবে তুমি? বন্ধুদের কাছে নাকি চ্যাটজিপিটির কাছে? কোনো রকম বিরক্ত না হয়ে যখন কেউ কঠিন পড়াটা সহজে বুঝিয়ে দেয়, তখন তো ভালো লাগবেই। চ্যাটজিপিটি হোক বা অন্য যেকোনো চ্যাটবট, এরা মানুষের বোকা বোকা প্রশ্নেরও চমৎকার উত্তর এনে দেয়। মন খুলে এদের সঙ্গে কথাও বলা যায়। তাই মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী হয়ে উঠছে এসব জনপ্রিয় চ্যাটবট।
যেকোনো প্রশ্নের উত্তর খোঁজা, কোডিং, লেখালেখি কিংবা স্রেফ গল্প করা, সবকিছুতেই এখন চ্যাটবটদের বিশাল চাহিদা। অথচ এই চ্যাটবটগুলো কিন্তু খুব বেশি পুরোনো নয়। ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ওপেনএআই চ্যাটজিপিটি নিয়ে হাজির হয়। চ্যাটবটের দুনিয়ায় রীতিমতো বিপ্লব নিয়ে এসেছিল এটি। দেখতে দেখতে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চ্যাটজিপিটির বয়স তিন বছর হয়ে গেল। এই কয়েক বছরে চ্যাটজিপিটি কি আসলেই সবার ইন্টারনেট বন্ধু হয়ে উঠতে পেরেছে? চ্যাটজিপিটির ব্যবহার নিয়ে পরিসংখ্যানগুলোই–বা কী বলছে?
ব্যবহারে চ্যাটজিপিটি
ওপেনএআই যখন প্রথম চ্যাটজিপিটি বাজারে আনে, তখন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান বলেছিলেন, ‘ভাষাভিত্তিক এই ইন্টারফেসগুলো ভবিষ্যতে খুব বড় একটা জায়গা দখল করতে যাচ্ছে।’ কথাটা তিনি মনে হয় একটু কমিয়েই বলেছিলেন। কারণ, বাজারে আসার সঙ্গে সঙ্গেই চ্যাটজিপিটি রীতিমতো ধামাকা করে দেখায়। হার্ভার্ডের এক গবেষণা বলছে, বাজারে আসার মাত্র এক মাসের মধ্যেই চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছে যায়। আর এক বছরের মাথায় সেই সংখ্যা ছাড়িয়ে যায় ১০ কোটির ঘর।
বর্তমানে চ্যাটজিপিটির সাপ্তাহিক সক্রিয় ব্যবহারকারী প্রায় ৮০ কোটি। মানুষের এত ভালো সাড়া দেখে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও বসে থাকেনি। তারাও নিজেদের চ্যাটবট তৈরির পেছনে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিনিয়োগ করতে শুরু করে। এভাবেই চ্যাটজিপিটির আগমন প্রযুক্তি–দুনিয়ার হিসাব–নিকাশ বদলে দেওয়া শুরু করেছে।
নতুন রূপে জিপিটি
চ্যাটজিপিটি মানুষের হাতে হাতে পৌঁছে যাওয়া শুরু করে এর ৩.৫ ভার্সন দিয়ে। তার আগের জিপিটি ভার্সনগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত ছিল না। জিপিটির ৩.৫ ভার্সনটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। কিন্তু এর অনেক দুর্বলতাও ছিল। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান নিজেও স্বীকার করেছেন যে শুরুতে চ্যাটজিপিটি লেখালেখিতে বেশ পিছিয়ে ছিল। চ্যাটবটটির লেখা এতটাই রোবটের মতো ছিল যে দেখলেই ধরে ফেলা যেত। এরপর ২০২৩ সালে আসে জিপিটি ৪। এর মাধ্যমে চ্যাটজিপিটি আরও দ্রুত নানা ধরনের কাজ করতে সক্ষম হয়।
আর সবশেষে এই তো, ২০২৬ সালের ৫ মার্চ এল জিপিটি ৫.৪ ভার্সন। এই ভার্সন আবার দুই রকমের। একটি প্রো ভার্সন আর অন্যটি থিঙ্কিং বা গভীরভাবে চিন্তা করার ভার্সন। সবচেয়ে নতুন ৫.৪ ভার্সনে চ্যাটজিপিটি ধাপে ধাপে কাজ করায় বেশ পারদর্শী হয়ে উঠেছে। তথ্য সংগ্রহ করা, তথ্য সাজানো, জটিল হিসাব–নিকাশ, স্প্রেডশিট তৈরি থেকে শুরু করে পেশাদারি বিভিন্ন কাজে এই মডেল দারুণ সফল।
যখন জিপিটি ৫ বাজারে আসে, তখন অনেক ব্যবহারকারী একটি অদ্ভুত সমস্যার কথা জানান। অনেকেই বলেন, জিপিটি ৫–এর চেয়ে তাদের জিপিটি ৪–এর ‘ব্যক্তিত্ব’ বেশি পছন্দ। এ কারণে জিপিটি ৫–এর প্রো ব্যবহারকারীদের জন্য জিপিটি ৪ মডেল ব্যবহার করার সুযোগও করে দেওয়া হয়। সম্প্রতি স্যাম অল্টম্যান জানিয়েছেন যে জিপিটি ৫.৪–এ আবার চ্যাটজিপিটির সেই আকর্ষণীয় ‘ব্যক্তিত্ব’ ফিরিয়ে আনা হয়েছে।
এত কিছুর পরও জিপিটি ৫.৪–এর কিছু দুর্বলতা কিন্তু থেকেই গেছে। ব্যবহারকারীরা জানাচ্ছেন, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের কিছু প্রশ্নে এখনো ভুল উত্তর দেয় চ্যাটজিপিটি। যেমন একজন জিপিটিকে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘আমার গাড়ি ধুতে কারওয়াশে যাওয়া লাগবে। কারওয়াশটি ১০০ মিটার দূরে। এখন আমি কি হেঁটে যাব নাকি গাড়ি চালিয়ে?’ জিপিটি তাঁকে দিব্যি হেঁটে যেতে বলেছে! কিন্তু গাড়ি ধোয়ার জন্য যে গাড়িটাও চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে, সেই সাধারণ বিষয় জিপিটি ধরতেই পারেনি। বোঝাই যাচ্ছে, কিছু জায়গায় চ্যাটজিপিটির অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে।
কাদের হাতে জিপিটি
ওপেনএআইয়ের তথ্য নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা খেয়াল করেছেন, জিপিটি ব্যবহারে নারী ও পুরুষের অনুপাত আসলে কেমন। এই হিসাব বের করা হয় ব্যবহারকারীদের নামের প্রথম অংশ যাচাই করে। চ্যাটজিপিটি উন্মোচনের প্রথম কয়েক মাসে এর ৮০ শতাংশ ব্যবহারকারীই ছিলেন পুরুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিপিটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। বর্তমানে জিপিটি ব্যবহারকারীদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা পুরুষদেরও ছাড়িয়ে গেছে।
এখন ২০২৬ সালে এসে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ কোটি বার্তা সামাল দেয় চ্যাটজিপিটি। এই চ্যাটবটকে যে শুধু স্টুডিও ঘিবলি স্টাইলের ছবি আঁকতে আর ডায়েট প্ল্যান বানাতেই ব্যবহার করা হয়, তা কিন্তু নয়। চ্যাটজিপিটি ২০২৫ সালের মধ্যেই ১০ লাখ প্রিমিয়াম ব্যবহারকারী পেয়ে গেছে। এখন ১০ লাখের বেশি গ্রাহক টাকা দিয়ে জিপিটির প্রো ভার্সন ব্যবহার করছেন নিজেদের অফিসের কাজে কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনে। শুধু তা–ই নয়, সাধারণ নানা প্রয়োজনে কিংবা গল্প করতেও অনেকে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেন। বর্তমানে জিপিটির কাছে ৭০ শতাংশ বার্তাই অফিসের কাজ নয়; বরং অন্যান্য বিষয় নিয়ে আসে।
এখন ১৫০টির বেশি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে জিপিটি। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, ব্রাজিল এবং জার্মানিতে জিপিটির সবচেয়ে বেশি ব্যবহারকারী রয়েছেন। এই বিপুল জনপ্রিয়তা ওপেনএআইয়ের বাজারমূল্য নিয়ে গেছে প্রায় ৮০ হাজার কোটি ডলারে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওপেনএআই বিশ্বের সবচেয়ে দামি কোম্পানিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।
জিপিটির প্রতিযোগী
যুদ্ধের ময়দানেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আছে। লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন চালানো, ফলাফল বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ কিংবা সাইবার অ্যাটাকসহ বিভিন্ন কাজে আসে এআই। যুদ্ধে এআইয়ের প্রয়োজন দেখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনী বিভিন্ন এআই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক চুক্তি ছিল অ্যানথ্রোপিক নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। অ্যানথ্রোপিক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এবং তাদের ক্লড নামে একটি চ্যাটবট আছে।
সম্প্রতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে তথ্য সুরক্ষা এবং মানবিক কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর কিছু দাবি নাকচ করে দেয় অ্যানথ্রোপিক। মানবিক দিক বিবেচনা করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বেশ বাহবা পেয়েছে তারা। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রোষানলে পড়ে। অ্যানথ্রোপিকের সঙ্গে সব রকম সামরিক চুক্তি বাতিল করার নির্দেশ দেন ট্রাম্প। এতে অ্যানথ্রোপিক হারায় ২০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি।
ওপেনএআই হলো অ্যানথ্রোপিকের অন্যতম প্রতিযোগী। প্রথমে স্যাম অল্টম্যান অ্যানথ্রোপিকের সাহসী সিদ্ধান্তের প্রশংসাও করেন। কিন্তু এর কিছুদিনের মধ্যেই ওপেনএআই যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বিভাগের সঙ্গে সেই ২০ কোটি ডলারের চুক্তিতে সই করে বসে। এতে গ্রাহকদের তোপের মুখে পড়েছে ওপেনএআই। সেই চুক্তি ঘোষণার পর চ্যাটজিপিটি আনইনস্টলের হার প্রায় ৩০০ শতাংশ বেড়ে যায়। অনেকেই নৈতিক কারণে চ্যাটজিপিটি থেকে ক্লডে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
ওপেনএআইয়ের অনেক কর্মীও এই চুক্তির সঙ্গে একমত নন। ওপেনএআইয়ের একজন গবেষণা বিজ্ঞানী, এইডান ম্যাকলাফলিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ‘আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি না যে এই চুক্তি করার দরকার ছিল।’ ওপেনএআইয়ের আরেকজন কর্মী সিএনএনকে বলেছেন, পেন্টাগনের চুক্তি প্রত্যাখ্যান করার কারণে তাদের অনেকেই অ্যানথ্রোপিককে ‘সত্যিই সম্মান’ করেন।
ওপেনএআইয়ের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে তাদের করা চুক্তিটি অনেক শর্তের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে। তাদের চুক্তিটি অ্যানথ্রোপিকের চুক্তির চেয়ে আলাদা এবং ওপেনএআই নৈতিকতার দিকে অটুট রয়েছে। এত সব টানাপোড়েন সামনে চ্যাটজিপিটির জন্য কেমন দিন নিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার পালা।