মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বুনো মৌমাছিদের তাড়িয়ে দিচ্ছে মধু মৌমাছি

ফুলে ফুলে ঘুরে মধু ও পরাগরেণু সংগ্রহ করে মৌমাছি। কিন্তু খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে এক প্রজাতির মৌমাছি যদি অন্যদের তাড়িয়ে দেয়, তাহলে কী হবে? নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, মধু সংগ্রহের জন্য পালন করা মৌমাছিরা ফুল থেকে বুনো মৌমাছি ও অন্যান্য পরাগবাহী পতঙ্গকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে খাবার সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বুনো মৌমাছি।

যুক্তরাজ্যের অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ক্যামব্রিজশায়ার এলাকায় দুই বছর ধরে এই গবেষণা করেছেন। তাঁরা কাঁটাঝোপ ও আইভিগাছের ফুলে খাবার সংগ্রহ করতে আসা পাঁচ ধরনের পতঙ্গের মধ্যে প্রায় ৩০০টি মুখোমুখি হওয়ার ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। এসব পতঙ্গের মধ্যে ছিল মধু মৌমাছি, ভোমরা, একা বাস করা মৌমাছি, হোভারফ্লাই এবং অন্যান্য মাছি, প্রজাপতি, গুবরেপোকা ও বোলতা।

গবেষকেরা লক্ষ করেন, প্রতিবার মুখোমুখি হওয়ার ঘটনায় কোন পতঙ্গ ফুলে থাকা খাবার সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছে, কোনটি সরে যাচ্ছে এবং কখন তারা একই ফুলের সম্পদ ভাগ করে নিচ্ছে। দেখা যায়, দুই ধরনের গাছের ফুলেই বেশির ভাগ প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছে মধু মৌমাছি। যেসব এলাকায় মধু মৌমাছির সংখ্যা বেশি, সেখানে ভোমরা ও অন্যান্য বুনো পরাগবাহী পতঙ্গের সংখ্যা তুলনামূলক কম পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন

আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, মধু মৌমাছি বেশি পরিমাণে ফুলের মধু ও পরাগরেণু সংগ্রহ করে ফেলায় অন্য পতঙ্গের খাবার কমে যেতে পারে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, এরা সরাসরি অন্য পতঙ্গকে ধাক্কা দিয়ে বা তাড়া করেও ফুল থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। গবেষকেরা এ ধরনের প্রতিযোগিতাকে বলেন ‘ইন্টারফেরেন্স কম্পিটিশন’ বা সরাসরি বাধা দিয়ে প্রতিযোগিতা।

গবেষণার প্রধান লেখক ও অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ভিক্টোরিয়া বাকল জানান, কাঁটাঝোপের ফুলে অন্য পতঙ্গেরা ২৮ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে এবং আইভি ফুলে ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ ক্ষেত্রে মধু মৌমাছিকে এড়িয়ে চলেছে। আবার মধু মৌমাছি যেসব প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়েছে, তার প্রায় ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে এরা অন্য পতঙ্গকে ধাক্কা দিয়ে বা তাড়া করে সরিয়ে দিয়েছে।

ভোমরারাও অন্য পতঙ্গকে ফুল থেকে সরিয়ে দিতে পারে। তবে গবেষকদের ধারণা, ভোমরারা ইচ্ছা করে এমনটা করে না। সরু জায়গায় ওড়ার সময় এদের তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে অন্য পতঙ্গের সঙ্গে ধাক্কা লেগে যেতে পারে। অন্যদিকে মধু মৌমাছির ক্ষেত্রে অন্য পতঙ্গকে সরিয়ে দেওয়ার আচরণটি অনেক বেশি উদ্দেশ্যপূর্ণ বলে মনে হয়েছে গবেষকদের।

মধু মৌমাছির সামাজিক জীবনও এ আচরণের একটি কারণ হতে পারে। মৌচাকে কিছু মৌমাছি পাহারাদারের দায়িত্ব পালন করে। যারা মৌচাক ও বাচ্চাদের রক্ষা করতে হুমকি মোকাবিলা করে। গবেষকদের ধারণা, এ ধরনের আচরণ দেখানোর সক্ষমতা ফুলে খাবার সংগ্রহের সময়ও কাজে লাগতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে সব বুনো মৌমাছি যে মধু মৌমাছির কাছে হেরে যায়, তা নয়। আইভি মৌমাছি নামের একটি প্রজাতিকে মধু মৌমাছিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে এবং তাড়া করতে দেখা গেছে। যুক্তরাজ্যে এই প্রজাতির উপস্থিতি প্রথম নথিবদ্ধ হয় ২০০১ সালে। এরা মূলত আইভিগাছের ফুলের মধু সংগ্রহ করে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, তাপমাত্রা বাড়লে পতঙ্গগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতাও বাড়ে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হলো, বেশি গরমে ফুলের মধু শুকিয়ে যেতে পারে এবং গাছ তাপজনিত চাপে পড়ে। ফলে খাবারের জন্য পতঙ্গগুলোর প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হয়। যুক্তরাজ্যে ২০৮০ সালের মধ্যে গ্রীষ্মের গড় তাপমাত্রা সর্বোচ্চ ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতিযোগিতা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে।

মধু মৌমাছি পালন জনপ্রিয় হওয়ায় যুক্তরাজ্যে এদের সংখ্যা বেড়েছে। ২০১০ সালে দেশটিতে নিবন্ধিত মৌচাষির সংখ্যা ছিল ১৯ হাজার। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ হাজারে। মৌমাছি বাঁচানোর উদ্যোগ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অনেকেই শখের বশে মৌচাক তৈরি করছেন। তবে বেশি সংখ্যায় মধু মৌমাছি পালন করলে বুনো পরাগবাহী পতঙ্গের খাবার নিয়ে প্রতিযোগিতা বাড়তে পারে। এ ছাড়া তাদের মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ফুল কম বা মৌচাকের ঘনত্ব বেশি।

গবেষকেরা বলছেন, বুনো পরাগবাহী পতঙ্গকে কীভাবে আরও ভালোভাবে রক্ষা করা যায়, তা জানতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। কারণ, ফুলের পরাগায়নে এসব পতঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাদের সংখ্যা কমে গেলে উদ্ভিদের বংশবিস্তারসহ পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
আরও পড়ুন