অস্বাস্থ্যকর খাবারের স্বাদ স্বাস্থ্যকর খাবারের চেয়ে ভালো লাগে কেন
ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বার্গার, পটেটো চিপস, পিৎজা, কোমল পানীয়, চিকেন ফ্রাই কিংবা কুকিজ—নামগুলো শুনলেই খেতে ইচ্ছা করে, তাই না? খাবারগুলো দেখতে ও স্বাদে আলাদা হলেও এগুলোর মধ্যে একটি মিল আছে। এগুলোর সব কটিতেই থাকে প্রচুর লবণ, বাড়তি চিনি ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা সম্পৃক্ত চর্বি। এসব উপাদান খাবারকে সুস্বাদু করে তোলে এবং বারবার খাওয়ার ইচ্ছা জাগাতে পারে।
কিন্তু অস্বাস্থ্যকর খাবার এত সুস্বাদু লাগে কেন? স্বাস্থ্যকর খাবারের চেয়ে এগুলোই–বা বেশি আকর্ষণীয় মনে হয় কেন? আর পছন্দের খাবার না ছেড়েও কীভাবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা যায়?
চর্বি, লবণ আর চিনি থাকলেই কি খাবার বেশি মজার হয়
লবণ, চিনি ও চর্বি খাবারের স্বাদ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব উপাদানের সঙ্গে খাবারের গন্ধ, মচমচে ভাব ও মুখে অনুভূত গঠনেরও সম্পর্ক রয়েছে। যেমন গরম–গরম ফ্রেঞ্চ ফ্রাইয়ের বাইরের মচমচে আবরণ আর ভেতরের নরম অংশ কিংবা চকলেট কেকের মিষ্টি স্বাদ আমাদের আকৃষ্ট করে। ফলে এমন খাবার দেখলে বা গন্ধ পেলে খেতে ইচ্ছা হতে পারে।
এর পেছনে মস্তিষ্কেরও ভূমিকা রয়েছে। কোনো সুস্বাদু খাবার খেয়ে ভালো লাগলে মস্তিষ্ক সেই অভিজ্ঞতা মনে রাখে। খাবার খাওয়ার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিনসহ বিভিন্ন রাসায়নিকের কার্যক্রমে পরিবর্তন ঘটে। ডোপামিন আনন্দ ও পুরস্কার পাওয়ার অনুভূতির পাশাপাশি কোনো কিছু পাওয়ার আগ্রহের সঙ্গেও যুক্ত। তাই আগে কোনো খাবার খেয়ে ভালো লাগলে পরে আবার সেটি খেতে ইচ্ছা করতে পারে।
মানসিক চাপ, মন খারাপ কিংবা ব্যস্ততার সময়ও আমরা অনেকেই পছন্দের খাবারের দিকে ঝুঁকি। এক টুকরা কেক বা চিজবার্গার খেলে সাময়িকভাবে ভালো লাগতে পারে। আবার সহজে পাওয়া যায় বলে ব্যস্ততার মধ্যে ফাস্ট ফুড বা প্যাকেটজাত খাবার বেছে নিই। এভাবে স্বাদ, অভ্যাস, মানসিক অবস্থা ও খাবারের সহজলভ্যতা একসঙ্গে আমাদের খাদ্যাভ্যাসকে প্রভাবিত করে।
অস্বাস্থ্যকর খাবার কেন এত আকর্ষণীয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরাও গবেষণা করছেন। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাক ইনস্টিটিউটের গবেষকেরা রান্না ও প্রক্রিয়াজাত খাবারে তৈরি হওয়া কিছু রাসায়নিক যৌগ নিয়ে গবেষণা করেন। এগুলোকে বলা হয় ‘অ্যাডভান্সড গ্লাইকেশন অ্যান্ড প্রোডাক্টস’ বা এজিইস। চিনি ও প্রোটিনের মতো উপাদান তাপের সংস্পর্শে এলে এসব যৌগ তৈরি হতে পারে। খাবার ভাজা, পোড়ানো বা বেক করার সময়ও এগুলোর সৃষ্টি হয়। কিছু এজিইস কীভাবে খাবার গ্রহণের প্রবণতাকে প্রভাবিত করে, গবেষকেরা তা খতিয়ে দেখেছেন। তবে গবেষণাটির গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগুলো করা হয়েছিল কৃমির ওপর। তাই এর ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রেও একইভাবে প্রযোজ্য, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। চিনি, লবণ বা চর্বি অল্প পরিমাণে খেলেই তা ক্ষতিকর হয়ে যায় না। সমস্যা তৈরি হয় যখন নিয়মিত অতিরিক্ত পরিমাণে এসব উপাদান খাওয়া হয় এবং তার ফলে প্রয়োজনীয় পুষ্টিকর খাবার খাদ্যতালিকা থেকে বাদ পড়ে যায়।
অস্বাস্থ্যকর খাবার বেশি খেলে কি সমস্যা হয়
নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার খাওয়া এবং শারীরিক পরিশ্রম কম করার ফলে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া অতিরিক্ত লবণ, বাড়তি চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার বেশি খাওয়ার অভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে কয়েকটি স্বাস্থ্যসমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
প্রথমত, রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কোলেস্টেরল শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় একটি চর্বিজাতীয় পদার্থ। কোষ তৈরি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে এটি লাগে। তবে রক্তে এলডিএল বা ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি হলে রক্তনালির দেয়ালে চর্বিজাতীয় পদার্থ জমতে পারে। এতে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খাওয়া এই ঝুঁকির একটি কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত লবণ খেলে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ে। চিপস, ইনস্ট্যান্ট নুডলস, প্রক্রিয়াজাত মাংস ও অন্যান্য প্যাকেটজাত খাবারে অনেক সময় প্রচুর লবণ থাকে। রান্নায় বাড়তি লবণ ব্যবহার করলেও একই সমস্যা হতে পারে। দীর্ঘদিন উচ্চ রক্তচাপ থাকলে হৃদ্যন্ত্র।
কিডনি ও রক্তনালি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে
তৃতীয়ত, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও অতিরিক্ত ওজন টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আমাদের অগ্ন্যাশয় থেকে ইনসুলিন নামের হরমোন তৈরি হয়। এই হরমোন রক্তের গ্লুকোজকে শরীরের কোষে প্রবেশ করে শক্তি হিসেবে ব্যবহারে সাহায্য করে। কিন্তু শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি যথাযথ সাড়া না দিলে তাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলে। এর ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে এবং একপর্যায়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হতে পারে। বংশগত বৈশিষ্ট্য, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অতিরিক্ত ওজনসহ বিভিন্ন বিষয় এই ঝুঁকিকে প্রভাবিত করে। ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে কিডনি, চোখ, স্নায়ু ও হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হতে পারে।
পছন্দের খাবারও খাবে, স্বাস্থ্যকরও থাকবে
স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে পছন্দের সব খাবার একেবারে বাদ দিতে হবে, এমন নয়। মাঝেমধ্যে পিৎজা, বার্গার বা মিষ্টি খাওয়া যায়। তবে প্রতিদিনের খাবারে পুষ্টিকর উপাদানের প্রাধান্য থাকা জরুরি। সে জন্য কয়েকটি সহজ অভ্যাস গড়ে তুলতে পারো।
প্রথমত, কেনাকাটার সময় তাজা ফলমূল, শাকসবজি, মাছ, ডাল, ডিম, বাদাম ও পূর্ণ শস্যের মতো খাবার বেশি রাখো। সাদা চালের পাশাপাশি লাল চাল বা লাল আটার মতো পূর্ণ শস্যও খাদ্যতালিকায় রাখতে পারো। প্যাকেটজাত খাবার কেনার সময় পুষ্টিমান ও উপাদানের তালিকা দেখে নাও। বিশেষ করে খাবারে কতটা লবণ, বাড়তি চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি রয়েছে, তা খেয়াল করো। শুধু উপাদানের সংখ্যা কম হলেই কোনো খাবার স্বাস্থ্যকর হবে, এমন নয়।
দ্বিতীয়ত, রান্নায় স্বাস্থ্যকর বিকল্প বেছে নাও। সবজি ও মাছ ভাজার বদলে ভাপে সেদ্ধ করা বা অল্প তেলে রান্না করা যেতে পারে। খাবারে স্বাদ বাড়াতে অতিরিক্ত লবণের বদলে লেবুর রস, রসুন, আদা ও বিভিন্ন মসলা ব্যবহার করা যায়। মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করলে প্রতিবার কেক বা পেস্ট্রির বদলে তাজা ফল খেতে পারো।
তৃতীয়ত, খাবারের পরিমাণ ও ভারসাম্যের দিকে নজর দাও। প্লেটে শাকসবজি, প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং ভাত বা রুটির মতো শর্করাজাতীয় খাবার পরিমিত পরিমাণে রাখো। আঁশযুক্ত খাবার পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। ধীরে ধীরে খেলে পেট ভরে যাওয়ার অনুভূতি বুঝতে সুবিধা হয়। পাশাপাশি নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চার অভ্যাস গড়ে তোলো।
মনে রেখো, স্বাস্থ্যকর খাবার মানেই বিস্বাদ খাবার নয়। সঠিক উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতি বেছে নিলে পুষ্টিকর খাবারও সুস্বাদু হতে পারে। পছন্দের খাবার উপভোগ করার পাশাপাশি প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবারের ভারসাম্য বজায় রাখাই সুস্থ থাকার সবচেয়ে ভালো উপায়।