নিষিদ্ধ কফি কীভাবে বিশ্ব জয় করল
সকালে ধোঁয়া ওঠা এক মগ কফি না হলে দিনটাই যেন শুরু হতে চায় না অনেকের। পরীক্ষার আগের রাতে জেগে থাকতে কিংবা বন্ধুদের আড্ডায় কফি ছাড়া অনেকের চলেই না। বিখ্যাত সুরকার বাখ তো কফি নিয়ে একটা গানই লিখেছেন। দার্শনিক, আইনজীবী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এই কালো পানীয়র প্রেমে মগ্ন।
কফি জিনিসটা কিন্তু আজকের নয়। এর জন্ম ইথিওপিয়ায়। তবে ১৫ শতকের দিকে ইয়েমেনে এটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সুফিরা ইবাদতের সময় জেগে থাকার জন্য কফি পান করতেন। কিন্তু কফির এই দারুণ গন্ধ আর ক্যাফেইনের জাদুতে যখন সারা বিশ্ব মগ্ন হতে শুরু করল, তখনই কিছু ক্ষমতাধর শাসকের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। তাঁরা কফিকে ভয় পেতে শুরু করলেন। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি বা নৈতিকতার দোহাই দিয়ে নিষিদ্ধ করতে চাইলেন কফি।
কিন্তু আসল সত্যটা লুকিয়ে ছিল অন্য জায়গায়। কফি হাউসে বসে মানুষ রাজনীতি, সমাজ ও শাসকের সমালোচনা করত। শাসকেরা এটা সহ্য করতে পারতেন না। ইতিহাসে এমন সময়ও গেছে যখন এক কাপ কফি খাওয়ার অপরাধে মানুষকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে! চলো শুনে আসি কফি নিষিদ্ধ হওয়ার সেই রোমহর্ষক চারটি গল্প।
১. আরবে কফির ওপর নিষেধাজ্ঞা
১৫০০ সালের দিকে আরবে কফি বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তীর্থযাত্রী থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজন ক্লান্তি দূর করতে কফি হাউসে ভিড় জমাত। কিন্তু ১৫১১ সালে খাইর বেগ নামে আরবের এক কর্মকর্তা কফির ওপর ক্ষেপে গেলেন। তিনি একদল পণ্ডিতকে জড়ো করলেন এটা প্রমাণ করতে যে কফি শরীরের জন্য খারাপ।
সুলতান মুরাদ ইস্তাম্বুলে সব কফি হাউস নিষিদ্ধ করলেন। শুধু তাই নয়, কেউ যদি জনসমক্ষে কফি খেত, তবে তার শাস্তি ছিল মৃত্যু!
খাইর বেগ দাবি করলেন, কফি মানুষের বুদ্ধি লোপ করে, নেশা ধরিয়ে দেয় ও মানুষকে বাজে কাজে উৎসাহ দেয়। ব্যস, শুরু হলো তাণ্ডব! কফি হাউসগুলো ভেঙে দেওয়া হলো, পুড়িয়ে ফেলা হলো বস্তা বস্তা কফি বিন। যারা লুকিয়ে কফি খাচ্ছিল, তাদের ধরে বেদম প্রহার করা হলো।
খাইর বেগ ভাবলেন, তিনি খুব ভালো কাজ করেছেন। তিনি কায়রোর সুলতান আল-আশরাফ কানসুহ আল-ঘুরির কাছে চিঠি লিখলেন। কিন্তু সুলতান উল্টো তাঁকে ধমক দিলেন! সুলতান বললেন, ‘প্রকাশ্যে কফি খাওয়া বন্ধ থাকুক, কিন্তু কেউ যদি নিজের ঘরে বসে কফি খায়, তবে তাকে বাধা দেওয়া যাবে না।’ খাইর বেগের পরিকল্পনা ভেস্তে গেল। মানুষ আবার ফিরে পেল তাদের প্রিয় কফি।
২. ইস্তাম্বুলে কফি খেলেই গর্দান যেত
আরবের ঘটনার প্রায় ১০০ বছর পরের কথা। অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতান চতুর্থ মুরাদ ছিলেন ভয়ানক শাসক। তিনি কফি হাউসগুলোকে দেখতেন বিদ্রোহের আঁতুড়ঘর হিসেবে। তাঁর ধারণা ছিল, মানুষ কফি হাউসে বসে তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে। তিনি নিজেও যেহেতু বিদ্রোহের মাধ্যমেই ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাই ভয়টা বেশি ছিল।
সুলতান মুরাদ ইস্তাম্বুলে সব কফি হাউস নিষিদ্ধ করলেন। শুধু তাই নয়, কেউ যদি জনসমক্ষে কফি খেত, তবে তার শাস্তি ছিল মৃত্যু! শোনা যায়, সুলতান নাকি ছদ্মবেশে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন। কাউকে যদি কফি বা তামাক খেতে দেখতেন, তবে নিজের হাতেই তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতেন। এক কাপ কফির জন্য জীবন দিতে হতো!
৩. সুইডেনে কফি নিষিদ্ধ হয় পাঁচবার
ইউরোপে কফি ঢুকতে একটু সময় নিয়েছিল। কিন্তু একবার ঢোকার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সুইডেনের রাজা তৃতীয় গুস্তাভ কফিকে এতটাই সন্দেহ করতেন যে তিনি অদ্ভুত এক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। গল্প প্রচলিত আছে, তিনি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই যমজ ভাইকে বেছে নেন। একজনকে সারা জীবন শুধু কফি খেতে বাধ্য করেন, আরেকজনকে চা। রাজা দেখতে চেয়েছিলেন, কে আগে মারা যায়। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, ওই দুই ভাই রাজার চেয়েও বেশি দিন বেঁচে ছিলেন! ১৭৯২ সালে রাজা নিজেই আততায়ীর হাতে নিহত হন।
অবশ্য গবেষক মিকাল সালামনির মতে, যমজ ভাইদের এই গল্পটা একটা মিথ বা গুজব। তবে সুইডেন যে কফি নিষিদ্ধ করেছিল, সেটা সত্যি। ১৭৫৬ থেকে ১৮১৭ সালের মধ্যে মোট পাঁচবার কফি নিষিদ্ধ করা হয়! এর মূল কারণ ছিল অর্থনীতি। অন্য দেশ থেকে কফি আমদানি করতে গিয়ে দেশের অনেক টাকা বাইরে চলে যেত। পুলিশ তখন হন্যে হয়ে কফি বিক্রেতা ও পানকারীদের খুঁজত। সামান্য কফি পেলেই জরিমানা, এমনকি জেলও খাটতে হতো।
৪. প্রুশিয়ার বাহিনী
১৭৭৭ সাল। প্রুশিয়ার মানে বর্তমান জার্মানি ও পোল্যান্ডের অংশ। সেখানকার রাজা ফ্রেডরিখ দ্য গ্রেট এক অদ্ভুত ফরমান জারি করলেন। তিনি বললেন, ‘আমার প্রজারা এত বেশি কফি খাচ্ছে যে দেশের টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। এটা জঘন্য! সাধারণ মানুষের কফি খাওয়ার দরকার নেই, তারা বিয়ার খাবে।’
রাজা কফি আমদানির ওপর বিশাল কর বসালেন এবং সাধারণ মানুষের জন্য কফি রোস্ট করা নিষিদ্ধ করলেন। ফলে মানুষ লুকিয়ে কফি খাওয়া শুরু করল। চোরাকারবারিদের ধরার জন্য রাজা এক বিশেষ গোপন বাহিনী গঠন করলেন। তাদের বলা হতো কফি স্নিফার।
সুইডেনের রাজা তৃতীয় গুস্তাভ কফিকে এতটাই সন্দেহ করতেন যে তিনি অদ্ভুত এক পরীক্ষা চালিয়েছিলেন।
তারা ছিল মূলত যুদ্ধফেরত সৈনিক। তাদের কাজ ছিল রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো এবং নাক দিয়ে শুঁকে বের করা যে কোন বাড়ি থেকে কফির ঘ্রাণ আসছে। যদি কাউকে ধরা যেত, তবে তাকে মোটা অঙ্কের জরিমানা করা হতো। আর সেই জরিমানার চার ভাগের এক ভাগ পেত ওই স্নিফাররা। বুঝতেই পারছ, পুরস্কারের লোভে তারা কতটা তৎপর ছিল!
আজকের দিনে কোনো সরকার কফি নিষিদ্ধ করার কথা চিন্তাও করতে পারবে না। বড়জোর ডাক্তাররা বলতে পারেন, ‘দিনে দুই কাপের বেশি খাবে না।’ এখন কফি নিয়ে একটাই সমস্যা, এর দাম বেড়ে যাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কফির উৎপাদন কমছে আর বাড়ছে দাম। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, মানুষ কফির জন্য জেল খেটেছে, এমনকি জীবনও দিয়েছে। তাই দাম বাড়লেও কফির মগ হাতে আড্ডাটা বোধহয় আর থামবে না।