প্লাস্টিকের বোতলে পানি খেয়ে ভয়ংকর বিপদ ডেকে আনছি কি না

প্লাস্টিক বোতলে পানি পানছবি: সাদ্দাম হোসেন

প্রচণ্ড গরমে স্বস্তি পেতে এখন প্রচুর পানি পান করছেন সবাই। বিশুদ্ধ পানি পেতে পথেঘাটে বোতলের পানিই ভরসা। প্রায় প্রতিটি বোতল তৈরি প্লাস্টিক দিয়ে। প্লাস্টিকের বোতলে এই পানি কতটা ‘বিশুদ্ধ’, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গবেষণা বলছে, প্লাস্টিকের বোতলে আছে মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক এতই ছোট, একজন মানুষের চুলের গড় প্রস্থের এক হাজার ভাগের এক ভাগেরও কম। পানির সঙ্গে এগুলো পরিপাকতন্ত্রের টিস্যু বা ফুসফুসের মাধ্যমে রক্ত ​​প্রবাহে চলে যেতে পারে। প্লাস্টিক থেকে আসা সম্ভাব্য ক্ষতিকারক সিন্থেটিক রাসায়নিক শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে যেতে পারে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্বাভাবিক আকৃতির এক লিটার পানির প্লাস্টিকের বোতলে সাত ধরনের প্লাস্টিক আছে। গড়ে দুই লাখ চল্লিশ হাজার প্লাস্টিকের কণা আছে এক লিটারে! যার মধ্যে নব্বই শতাংশ ন্যানোপ্লাস্টিক। বাকিগুলো মাইক্রোপ্লাস্টিক। মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পলিমারের টুকরা। এর আকৃতি পাঁচ মিলিমিটার থেকে এক ইঞ্চির পঁচিশ হাজার ভাগের এক ভাগ বা এক মাইক্রোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে ন্যানোপ্লাস্টিক এক মিটারের এক বিলিয়ন ভাগের এক ভাগ।

এই গবেষণার ফলাফল থেকে প্লাস্টিকের বোতলে পানি খাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ন্যানোপ্লাস্টিক থেকে বাঁচতে কাচের গ্লাস বা স্টেইনলেস স্টিলের পাত্রে পানি সংরক্ষণ এবং পান করার প্রচলিত ধারণাকে শক্তিশালী করেছে। প্লাস্টিকের প্যাকেটে অন্যান্য খাবার এবং পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সাবধানতা অবলম্বন করার সময় এসেছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।

২০১৮ সালের একটি গবেষণার প্রথমে ৯টি দেশের ১১টি ব্র্যান্ডের বোতলজাত পানি বিশ্লেষণ করে ৯৩ শতাংশ নমুনায় মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিকের অস্তিত্ব পাওয়া গিয়েছিল। ছয় বছর আগের সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, প্রতি লিটার পানিতে গড়ে মানুষের চুলের চেয়ে চওড়া মাইক্রোপ্লাস্টিকের কণা ছিল ১০টি। আর ন্যানো কণা ছিল ৩০০টি। সে সময় এই কণা বিশ্লেষণ করা বা আরও বেশি কণা ছিল কি না, তা পরীক্ষা করার উপায় আবিষ্কার হয়নি। সেই গবেষকদলের একজন সদস্য ছিলেন মেসন। তিনি সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘এমন না যে আমরা জানতাম না ন্যানোপ্লাস্টিক আছে। আমরা কেবল এগুলো বিশ্লেষণ করতে পারিনি।’

নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-দোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির সহযোগী অধ্যাপক বেইজহান ইয়ান

ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সেস জার্নালের জানুয়ারি ২০২৪ সংখ্যায় কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা একটি নতুন প্রযুক্তি আবিষ্কারের কথা বলেছেন। এই প্রযুক্তি বোতলজাত পানিতে ন্যানো পার্টিকেলের রাসায়নিক গঠন দেখতে পারে। এ ছাড়া ন্যানো কণার সংখ্যা গণনা এবং বিশ্লেষণও করতে পারে। দেখা গেছে, প্রতি লিটারে ৩০০-এর পরিবর্তে অনেক বেশি কণা আছে। নতুন গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রি হওয়া ৯টি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পানি বিশ্লেষণ করে বলা হয়েছে, প্লাস্টিকের ন্যানো কণার প্রকৃত সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭০ হাজারের মধ্যে। গবেষকেরা পানির ব্র্যান্ডের নাম গোপন রেখেছে।

এই গবেষণাপত্রের সহলেখক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যামন্ট-দোহার্টি আর্থ অবজারভেটরির সহযোগী অধ্যাপক বেইজহান ইয়ান সিএনএনকে জানিয়েছেন, ‘নতুন প্রযুক্তি দিয়ে পানিতে লাখ লাখ ন্যানো কণা দেখা সম্ভব হয়েছে। সব মাইক্রো কণাকে হিসাবের মধ্যে ধরা হয়নি। মাইক্রো ও ন্যানো প্লাস্টিকের বাইরে জৈব-অজৈব অন্যান্য সাতটি কণাকে গণনার মধ্যে ধরা হয়নি।’

এই গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করা নতুন প্রযুক্তি স্বাস্থ্যের সম্ভাব্য ঝুঁকি ভালোভাবে বোঝার জন্য নতুন গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।

বলা হচ্ছে, বোতলের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শিশুদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ, শিশুদের মস্তিষ্ক ও শরীর বিকাশমান থাকে। বিষাক্ত বস্তুর সংস্পর্শে তাই শিশুরা বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ন্যানোপ্লাস্টিক মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। এর কারণ, ক্ষুদ্র কণা শরীরের অঙ্গগুলোর ভিন্ন ভিন্ন কোষ ও টিস্যুতে আক্রমণ করতে পারে।

প্লাস্টিকের বোতল
প্রতীকী ছবি: রয়টার্স

প্লাস্টিক তৈরিতে যে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, প্লাস্টিক শরীরে প্রবেশ করলে রাসায়নিকও প্লাস্টিকের সঙ্গে শরীরে ঢুকে পড়ে। শরীরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় বেশি হওয়ায় ওই রাসায়নিক প্লাস্টিক থেকে বেরিয়ে কোষের মধ্যে চলে যায়। এই রাসায়নিক লিভার, কিডনি এমনকি মস্তিষ্কেও চলে যেতে পারে।

গর্ভের সন্তানও এই রাসায়নিক দিয়ে আক্রান্ত হতে পারে। সন্তানসম্ভবা ইঁদুরের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে, সন্তানসম্ভবা মা ইঁদুর প্লাস্টিকের কণা খাওয়া বা শ্বাস নেওয়ার ২৪ ঘণ্টা পর গর্ভের শিশু ইঁদুরের মস্তিষ্ক, হৃৎপিণ্ড, লিভার, কিডনি ও ফুসফুসে প্লাস্টিকের রাসায়নিক খুঁজে পাওয়া গেছে। বর্তমানে মানুষের গর্ভেও মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। মানুষের ফুসফুসের টিস্যু, মল ও রক্তেও ন্যানোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

এই ন্যানো প্লাস্টিকের মাধ্যমে রাসায়নিক ছাড়াও বিষাক্ত ধাতুও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। আরেকটি গবেষণার বিষয় হলো রাসায়নিক বা বিষাক্ত ধাতু না, প্লাস্টিক পলিমার নিজেই শরীরের ক্ষতি করছে কি না। এখনো মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর পলিমারের প্রভাব গবেষণা করে নিশ্চিতভাবে বোঝা যায়নি। নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় এখন এই গবেষণা শুরু করা সম্ভব হবে। নতুন পদ্ধতি পর্যালোচনা করে পরিবেশে ন্যানোপ্লাস্টিকের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য মানসম্মত পদ্ধতি বের করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

নতুন প্রযুক্তিটি সাত ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত করতে পারে। যেগুলো হলো পলিমাইড, পলিপ্রোপিলিন, পলিথিন, পলিমিথাইল মেথাক্রাইলেট, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, পলিস্টাইরিন ও পলিথিন টেরেফথালেট।

আরও পড়ুন

অন্যান্য গবেষণা থেকে গবেষকেরা আশা করেছিলেন, বোতলের পানিতে থাকা মাইক্রোপ্লাস্টিকের বেশির ভাগ আসে বোতলের ছিদ্র থেকে। যা সাধারণত পিইটি বা পলিথিলিন টেরেফথালেট প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হয়। কিন্তু দেখা গেছে, পানির বোতলে বিভিন্ন রকম ও আকারের প্লাস্টিক থাকে। পিইটি বাদে অন্য কণার আকৃতি ২০০ ন্যানোমিটারেরও কম। গবেষণায় দেখা গেছে, পিইটি প্লাস্টিকের কণা ভেঙে যেতে পারে যদি বোতলের ক্যাপ বারবার খোলা ও বন্ধ করা হয়। তাপ ও চাপের কারণেও এই কণা ভাঙতে পারে।

এই আবিষ্কারের কারণে ন্যানোপ্লাস্টিক নিয়ে সব ধরনের প্রশ্নের উত্তর সহজেই গবেষণা করে বের করা সম্ভব হবে। যেমন বোতলের পানিতে ভাসমান ন্যানোপ্লাস্টি যদি বোতল থেকে না আসে, তবে কোথা থেকে আসে? কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের অনুমান, পানি যে উৎস থেকে বোতলে নেওয়া হয়েছে, সেখান থেকেই আসতে পারে।

আরেকটি প্রশ্ন হলো, বোতলের পানি না সাপ্লাইয়ের পানিতে কম ন্যানোপ্লাস্টিক ও রাসায়নিক থাকে? বেশ কিছু গবেষণায় সাপ্লাইয়ের পানিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের মাত্রা কম থাকার কথা বলা হয়েছে। এই গবেষকেরাও এটি নিয়েও গবেষণা করছেন। তাঁরা নিশ্চিত, প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণা মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে। এর মধ্যে ন্যানো কণা বেশি প্রবেশ করছে। তবে এখনো জানা যায়নি, কোষের ঠিক কোথায় এই কণা যাচ্ছে বা কী ক্ষতি করছে। এ-ও অজানা, এই প্লাস্টিক কণা শরীর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে কি না। নতুন এই প্রযুক্তি মানুষের টিস্যুর নমুনা বিশ্লেষণ করতে পারে। শিগগিরই এই প্রশ্নগুলোর যথাযথ উত্তর পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। এই বিষয়ে প্রচুর ডেটা আছে। যদি একটি কণা একটি নির্দিষ্ট ধরনের কোষে নির্দিষ্ট স্থানে প্রবেশ করে, তবে এটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করাও সম্ভব হবে।

এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে মানুষ প্লাস্টিকের ব্যবহার কমাতে পারে। সুস্থ শিশু আর সুস্থ ভবিষ্যতের জন্য এই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি। চাইলেই প্লাস্টিকের পাত্রে খাবার এবং পানীয় গ্রহণ করা বাদ দেওয়া সম্ভব। প্লাস্টিকের বদলে প্রাকৃতিক বিকল্প খুঁজে পাওয়া সম্ভব। তবে খাবার পানিতে ছড়িয়ে পড়া প্লাস্টিকের কণা নিয়ে ভাবার সময় হয়েছে।

সূত্র: সিএনএন

আরও পড়ুন