রাজকীয় দায়িত্ব পালনের সঙ্গে এই ডাচ রাজা বাণিজ্যিক বিমানও চালান
তুমি যদি কোনো বিমানে উঠে জানলে যে তোমাকে আজ উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একটি দেশের রাজা, তাহলে কেমন লাগত? অবাক হয়ে যেতে? নেদারল্যান্ডসের হাজার হাজার যাত্রীর ক্ষেত্রে ঠিক এ ব্যাপারই ঘটেছে। তাঁরা বিমানে উঠেছেন, আসনে বসেছেন, জানালা দিয়ে মেঘ দেখেছেন আর ককপিটে চুপচাপ বসে বিমান চালিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার।
রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার ১৯৯৬ সাল থেকে কেএলএম রয়্যাল ডাচ এয়ারলাইনসে পার্টটাইম কো-পাইলট হিসেবে কাজ করে আসছিলেন। মানে প্রায় ৩০ বছর! এত বছর ধরে তিনি রাজকীয় সব দায়িত্ব—সংসদ অধিবেশন, রাষ্ট্রীয় সফর, জাতীয় অনুষ্ঠান সামলেছেন। আর ফাঁকে ফাঁকে ছুটে গেছেন বিমানবন্দরে। পাইলটের পোশাক পরে বসে পড়েছেন ককপিটে। বিমানে ঘোষণার সময় কখনো নিজের পরিচয় দেননি। শুধু বলেছেন, ‘আমি আজকের কো-পাইলট।’ ব্যস, এটুকুই।
শুরুতে তিনি ওড়াতেন ফকার ৭০ বিমান। কেএলএমের আঞ্চলিক শাখা সিটিহপারে এই ছোট বিমানটি ইউরোপের বিভিন্ন ছোট রুটে চলাচল করত। ২০১৩ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসের রাজা হলেন, কিন্তু তাতে ককপিটের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এতটুকু কমেনি। তারপর ২০১৭ সালে ফকার ৭০ বাতিল হয়ে যাওয়ার পর তিনি নতুন প্রশিক্ষণ নিলেন এবং উঠে পড়লেন বোয়িং ৭৩৭-এ। এরপর টানা ৯ বছর এই বিমানই চালিয়েছেন তিনি।
এই দীর্ঘ যাত্রায় রাজার বিমানে ছিলেন সমুদ্রসৈকতে ছুটি কাটাতে যাওয়া সাধারণ নাগরিক, কেউ ছুটছিলেন প্রিয় ফুটবল দলের ম্যাচ দেখতে। আর ছোট্ট শিশুরা যাচ্ছিল ফিনল্যান্ডের ল্যাপল্যান্ডে, সান্তা ক্লসের সঙ্গে দেখা করতে। তাদের কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি যে যিনি তাদের মেঘের ওপর দিয়ে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, তিনি একটি দেশের রাজা। রাজা নিজেও বলেছেন, এই বিচিত্র সব মানুষ নিয়ে আকাশে ওড়াটাই তাঁর কাছে সবচেয়ে আনন্দের ছিল।
১১ মার্চ রাজা উইলেম-আলেকজান্ডার বোয়িং ৭৩৭-এ তাঁর শেষ বাণিজ্যিক ফ্লাইটটি সম্পন্ন করলেন। কারণটা একটু অন্য রকম। কেএলএম তার পুরোনো বোয়িং ৭৩৭ বহর সরিয়ে এখন নতুন এয়ারবাস A321neo আনছে। ২০২১ সালে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। নতুন এই বিমানগুলো পুরোনোগুলোর চেয়ে প্রায় ১৫ শতাংশ কম জ্বালানি পোড়ায়, শব্দদূষণ কমায় প্রায় ৫০ শতাংশ এবং একসঙ্গে বেশি যাত্রীও বহন করতে পারে। তাই পুরো বহরই বদলে ফেলছে কেএলএম।
তবে এটা কিন্তু রাজার আকাশযাত্রার শেষ নয়। তিনি এখন A321neo বিমানে প্রশিক্ষণ নেবেন, যাতে কেএলএমের নতুন বহরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উড়তে পারেন। এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের সরকারি বিমান বোয়িং ৭৩৭-৭০০ বিজনেস জেটও চালান তিনি। রাজা একবার বলেছিলেন, ‘যদি রাজপরিবারে জন্ম না নিতাম, তাহলে সারা জীবন পাইলট হিসেবেই কাটাতাম। বড় বড় বিমান ওড়াতাম।’ সেই স্বপ্ন তিনি আধাআধি পূরণ করে ফেলেছেন বলাই যায়। বোয়িং ৭৩৭-এর সঙ্গে বিদায়, কিন্তু রাজার জন্য আকাশ এখনো খোলা।
সূত্র: এভিয়েশন এটুজেড