বৃষ্টির ঘ্রাণ ভালো লাগে কেন
অনেকে বৃষ্টি খুব পছন্দ করেন। পৃথিবীতে জীবন টিকিয়ে রাখার জন্য বৃষ্টি অপরিহার্য। ইতিহাসের শুরু থেকেই বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ফসলের ভালো ফলনের জন্য বৃষ্টিকে স্বাগত জানিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, সেই সম্পর্কের কারণেই এখনো অনেক মানুষ বৃষ্টির পর যে বিশেষ ঘ্রাণটা পান, তা উপভোগ করেন।
বৃষ্টির পর ভেজা মাটির গন্ধ এত মনোরম যে সারা বিশ্বের সুগন্ধি ও সাবান প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো কৃত্রিমভাবে এটি তৈরির চেষ্টা করে। বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টির গন্ধের প্রতি আমাদের এই ভালোবাসা এসেছে পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে। প্রাচীনকালে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য বৃষ্টির ওপর নির্ভর করত, তাই বৃষ্টির গন্ধ তাদের কাছে ছিল স্বস্তির প্রতীক।
তবে মজার বিষয় হলো, এই সুগন্ধ কিন্তু বৃষ্টির পানির নিজের নয়। বরং বৃষ্টির ফোঁটা যখন শুকনা মাটিতে পড়ে, তখন মাটির ভেতরে থাকা ছোট ছোট বাতাসের বুদবুদ ফেটে যায়। এর ফলে মাটিতে থাকা ব্যাকটেরিয়া ও উদ্ভিদের তেল এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক রাসায়নিক পদার্থ অ্যারোসল বা ক্ষুদ্র কণা আকারে বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। তখন এই উপাদানগুলো বাতাসে মিশে গিয়ে সেই পরিচিত সোঁদা গন্ধ তৈরি করে।
দীর্ঘদিন খরা বা রোদের পর বৃষ্টি নামলে যে বিশেষ গন্ধ পাওয়া যায়, বিজ্ঞানের ভাষায় তাকে বলা হয় পেট্রিকোর, অর্থাৎ বৃষ্টির পরের ঘ্রাণ। ১৯৬৪ সালে দুই অস্ট্রেলীয় বিজ্ঞানী নেচার জার্নালে প্রথম এই শব্দ ব্যবহার করেন। গ্রিক শব্দ পেট্রা—যার অর্থ পাথর এবং ইচোর—যার অর্থ দেবতাদের ধমনির নির্যাস থেকে নামটি এসেছে। গবেষকেরা ভারতের শুষ্ক অঞ্চলে গবেষণা চালিয়ে দেখেন, বৃষ্টির সোঁদা গন্ধের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করে।
প্রথমটি মাটিতে ‘অ্যাকটিনোমাইসেটস’ নামে একধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। মাটি শুকিয়ে গেলে এই ব্যাকটেরিয়াগুলো একধরনের উপজাত তৈরি করে। বৃষ্টির ফোঁটা যখন মাটিতে পড়ে, তখন সেই রাসায়নিক উপাদানগুলো বাতাসে মিশে গিয়ে পেট্রিকোর বা সোঁদা গন্ধ তৈরি করে।
দ্বিতীয় শুষ্ক আবহাওয়ায় অনেক গাছপালা একধরনের তেল নিঃসরণ করে। বৃষ্টির সময় স্টিয়ারিক অ্যাসিড ও পামিটিক অ্যাসিডের মতো উপাদানগুলো বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। এটি বৃষ্টির গন্ধে মাটির মতো একটি মিষ্টি ভাব যোগ করে।
শেষটা হলো ওজোন গ্যাসের প্রভাব। অনেক সময় বৃষ্টি আসার আগেই আমরা বৃষ্টির গন্ধ পাই। এর কারণ হলো ওজোন। বজ্রপাতের সময় বাতাসের অক্সিজেন ও নাইট্রোজেন অণুগুলো ভেঙে গিয়ে নতুন রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে ওজোন গ্যাস তৈরি করে। এই গ্যাসের গন্ধ কিছুটা ক্লোরিনের মতো। আসন্ন ঝড়ের বাতাস যখন এই ওজোনকে মাটির কাছাকাছি নিয়ে আসে, তখন আমরা বুঝতে পারি যে বৃষ্টি আসছে।
বৃষ্টিই একমাত্র প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, যা বাতাসে ঘ্রাণ তৈরি করে। বজ্রপাতও বায়ুমণ্ডলে এক ভিন্ন ধরনের গন্ধ সৃষ্টি করে, যা আমরা প্রায়ই ঝড়ের আগে পেয়ে থাকি। এই গন্ধের পেছনে রয়েছে এক বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া।
যখন বজ্রপাত বায়ুমণ্ডলের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এর প্রচণ্ড শক্তি বাতাসে থাকা নাইট্রোজেন ও অক্সিজেন অণুগুলোকে ভেঙে দেয়। ভেঙে যাওয়া এই অণুগুলো তখন একে অপরের সঙ্গে নতুনভাবে যুক্ত হয়। এই প্রক্রিয়ায় নাইট্রিক অক্সাইড এবং একটি অক্সিজেন পরমাণু তৈরি হয়। এরপর এই অক্সিজেন পরমাণুগুলো বায়ুমণ্ডলে থাকা অন্যান্য অক্সিজেন অণুগুলোর সঙ্গে বিক্রিয়া করে ওজোন (O) তৈরি করে।
ওজোন (O) হলো অক্সিজেনের একটি কম স্থিতিশীল অবস্থা। এটি আমাদের পরিচিত অক্সিজেনের (O) চেয়ে ভিন্ন। ঝড়ের সময় বাতাসের তীব্র নিম্নমুখী প্রবাহ বা ডাউনড্রাফ্ট এই নতুন গঠিত ওজোনকে বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে ঠেলে নিয়ে আসে। তখন আমরা এই গন্ধ পেয়ে থাকি। ওজোনের ঘ্রাণ কিছুটা ধাতব (metallic) গন্ধের। এই ধাতব গন্ধই আমাদের বলে দেয় শীঘ্রই বৃষ্টি আসছে বা বজ্রসহ ঝড় শুরু হতে চলেছে।