সাদিকুলের শালিক কথা বলতে শিখল কী করে
২ অক্টোবর ২০২৬, শুক্রবার বেলা ১১টা। ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ, বিরহলি গ্রাম। আবদুস সোবহানের উঠানে ইটের স্তূপ। তার ওপর ধুন্দুলের লতা। হঠাৎ দুটি শালিক উড়ে এসে বসল। ডাকল, ‘সাদিক, সাদিক।’ কেউ সাড়া দিল না। এবার ডাকল, ‘মা, বাবা; মা, বাবা।’ বাড়ির কর্তা এগিয়ে আসতেই শালিক দুটি বলে উঠল, ‘কুটুম, কুটুম।’ তারপর উড়ে গেল পাশের গাছে।
এ দৃশ্য এ বাড়িতে নতুন নয়। পাঁচ বছর ধরে এই দুটি পাখির ঠিকানা এখানেই—খাঁচায় নয়, খোলা উঠানে। পরিবার তাদের নাম রেখেছে ‘ময়না’। ‘ময়না’ ডাকলেই ছুটে আসে।
ছানা অবস্থায় তাদের এনেছিলেন আবদুস সোবহানের ছেলে সাদিকুল ইসলাম, হরিপুর থেকে। বন্দী করে রাখেননি। খাবার দিয়েছেন, নিরাপদ আশ্রয় দিয়েছেন, আর সঙ্গ দিয়েছেন। মানুষের মুখের কাছে থেকে থেকে ধীরে ধীরে বাড়ির সঙ্গে মিশে গেছে। দুই বছর বয়সের দিকে প্রথম এরা কথা বলে। এখন বলে ‘সাদিক’, ‘মা’, ‘বাবা’, ‘ভাই’, ‘ভাবি’, ‘আল্লাহ’। সাদিকুল কাজ থেকে ফিরলে ডাকে ‘সাদি…কুল’। অচেনা মুখ দেখলে ‘কুটুম, কুটুম’ বলে জানিয়ে দেয়, বাড়িতে নতুন কেউ এসেছে। মুরগির ডাকও নকল করে। দূরে উড়ে গেলেও কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে। সামনের চা-দোকানের খদ্দেরেরা এদের মুড়ি-বিস্কুট দেয়, কেউ নতুন শব্দ শেখানোর চেষ্টা করে। কিনতে চাইলে সাদিকুলের জবাব সোজা, ‘এত সাধের পাখি কি বিক্রি করা যায়!’
কথাটা আসলে কীভাবে শেখে
পাখির গলায় মানুষের মতো স্বরযন্ত্র নেই। আছে সিরিংক্স। শ্বাসনালির নিচে একটা বাদ্যযন্ত্রের মতো অঙ্গ। পেশি টিপে টিপে তারা নানা সুর বানায়। শালিক স্টারলিং গোত্রের পাখি। এই গোত্র অনুকরণে দড়, যা বারবার শোনে, তা মনে রাখে, তারপর নিজের গলায় ফিরিয়ে দেয়। অর্থ বোঝে না। ‘মা’ বললে মায়ের মুখ মনে পড়ে না। শুধু সেই শব্দটা আবার বলে। তবু বাড়ির লোকের কানে লাগে, যেন ডাকছে।
ময়না আর শালিক এক গোত্রের, এক গণের নয়। যে পাখিকে আমরা ময়না বলি, পাহাড়ি ময়না, তার গলা নরম, শব্দ পরিষ্কার, বাক্যও ধরে রাখে। শালিকের গলা খসখসে। শেখে কম। কিন্তু ছোট থেকে মানুষের কাছে থাকলে ‘মা’, ‘বাবা’, ‘কুটুম’—এগুলো স্পষ্টই তুলতে পারে। সাদিকুলের শালিক তার প্রমাণ।
সিদ্দিকা বেগম বলেন, ‘লালন-পালন করতে করতে পাখিগুলোর প্রতি মায়া জমে গেছে। ওরাও আমাদের ছেড়ে কোথাও যায় না।’ আবদুস সোবহান বলেন, সন্তানকে যেভাবে বড় করেছেন, শালিকজোড়াকেও সেভাবেই।
খাবার আর নিরাপত্তা পেলে শালিক সেই উঠানকেই ঘর করে নেয়। আর ঘরের মানুষের কথা, রোজ শুনতে শুনতে, একসময় নিজের ডাকে মিশিয়ে দেয়।
শালিকের বৈজ্ঞানিক নাম Acridotheres tristis। পাহাড়ি ময়নার বৈজ্ঞানিক নাম Gracula religiosa। দুটোই ‘Sturnidae’ গোত্রের। সাদিকুলের উঠানের পাখি শালিক। ‘ময়না’ তাদের আদরের নাম।