বিলুপ্তির মুখে থাকা কুমিরকে বাঁচাতে কম্বোডিয়া যা করছে
একসময় মনে করা হয়েছিল, বুনো সিয়ামিজ কুমির হয়তো পৃথিবী থেকেই হারিয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকে কম্বোডিয়ার সংরক্ষণবিদদের ধারণা ছিল, দেশটিতে এই কুমির আর নেই। শিকার আর মাছ ধরার কারণে বিশ শতকজুড়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় এই প্রজাতির সংখ্যা ভয়াবহভাবে কমে গিয়েছিল। কিন্তু দূরবর্তী কার্ডামম পাহাড়ের জলাভূমির আশপাশের কিছু আদিবাসী গ্রামে তখনো অন্য রকম গল্প শোনা যেত। সেখানকার চোরং সম্প্রদায়ের মানুষ বলতেন, তাঁরা এখনো বুনো সিয়ামিজ কুমির দেখতে পান।
২০০০ সালে গবেষকেরা ওই এলাকায় প্রাণীটির খোঁজ করতে গেলে স্থানীয় মানুষের দেওয়া তথ্য কাজে লাগে। তাঁদের দেখানো জায়গাগুলোতেই গবেষকেরা সিয়ামিজ কুমিরের অস্তিত্বের প্রমাণ পান। অর্থাৎ যে কুমিরকে প্রায় হারিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছিল, সেটি তখনো বেঁচে ছিল। এর পর থেকেই এই প্রজাতিকে রক্ষা করার চেষ্টা আরও জোরালো হয়।
চোরং সম্প্রদায়ের মানুষ প্রকৃতি, বন ও বিভিন্ন পবিত্র প্রাণীর সঙ্গে গভীর সম্পর্কের বিশ্বাস নিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানে বসবাস করছেন। তাঁদের কাছে সিয়ামিজ কুমির নদী ও বনের রক্ষক। তাই কুমিরগুলোর কোথায় চলাফেরা, কোথায় বাসা বানায়, এসব তথ্য স্থানীয় মানুষের জানা ছিল। সংরক্ষণবিদেরা বলছেন, কুমিরকে বাঁচানোর কাজে তাঁদের অংশগ্রহণ খুব গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি সেই প্রচেষ্টার বড় ফল পাওয়া গেছে। কম্বোডিয়ার উত্তরাঞ্চলের কার্ডামম পাহাড়ের শেষ প্রান্তে অবস্থিত পুরসাত প্রদেশের ৩১৫ হেক্টর জলাভূমিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেনেটিক সংরক্ষণ এলাকা’ ঘোষণা করা হয়েছে। গত ২২ জুলাই দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় এলাকাটিকে এই বিশেষ মর্যাদা দেয়। সেখানে অন্তত ৪০টি সিয়ামিজ কুমির রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কেন একটি নির্দিষ্ট এলাকার কুমিরকে আলাদাভাবে সংরক্ষণ করতে হবে? এর পেছনে আছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সিয়ামিজ কুমির এখনো মারাত্মকভাবে বিপন্ন প্রাণী। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থার লাল তালিকায় এই প্রজাতিকে ‘মহাবিপন্ন’ হিসেবে রাখা হয়েছে। আবাসস্থল ধ্বংস, শিকার এবং খামারে পালিত অন্য প্রজাতির কুমিরের সঙ্গে প্রজননের কারণে প্রকৃতিতে বিশুদ্ধ সিয়ামিজ কুমিরের সংখ্যা কমে গেছে।
বুনো কুমিরের ছোট ছোট দল যদি একে অন্যের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহলে একই বংশের কাছাকাছি প্রাণীদের মধ্যে প্রজনন বাড়তে পারে। এতে জিনগত বৈচিত্র্য কমে যায়। ফলে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা বা সফলভাবে বংশবিস্তার করার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে। তাই কার্ডামম পাহাড়ের এই জলাভূমিকে সংরক্ষণবিদেরা সিয়ামিজ কুমিরের জন্য একধরনের ‘জিনের ব্যাংক’ হিসেবে দেখছেন। এই এলাকার কুমিরের সংখ্যা সুস্থভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে মালয়েশিয়া, মিয়ানমার ও ইন্দোনেশিয়ার মতো জায়গায়ও এই প্রজাতিকে ফিরিয়ে আনার কাজে এখানকার কুমিরের জিনগত বৈচিত্র্য কাজে লাগতে পারে। এসব দেশে বুনো সিয়ামিজ কুমির সম্ভবত এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।
কুমির বাঁচানোর এই কাজ অবশ্য এক দিনে শুরু হয়নি। ২০১১ সালে সংরক্ষণ সংস্থা ফনা অ্যান্ড ফ্লোরা ইন্টারন্যাশনাল সিয়ামিজ কুমিরের একটি প্রজননকেন্দ্র তৈরি করে। লক্ষ্য ছিল জিনগতভাবে বিশুদ্ধ সিয়ামিজ কুমিরের সংখ্যা বাড়ানো এবং পরে তাদের নিরাপদ নদী ও জলাভূমিতে ছেড়ে দেওয়া।
এর পর থেকে ২৪৬টি সিয়ামিজ কুমিরকে বনে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০২৪ সালের পরেই ছাড়া হয়েছে ১০০টি। বর্তমানে ওই প্রজননকেন্দ্রে প্যারেন্টসসহ ৬৪৮টি কুমির রয়েছে। এর মধ্যে ৭১টি কুমির প্রজননে সক্ষম। ৫৪টি স্ত্রী কুমির ও ১৭টি পুরুষ কুমির। একটি ছোট কুমিরকে বনে ছেড়ে দেওয়ার মতো বয়স ও আকারে পৌঁছাতে সাধারণত তিন থেকে চার বছর সময় লাগে।
কুমিরগুলোকে শুধু ছেড়ে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। কিছু কুমিরের শরীরে শব্দের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায় এমন ছোট যন্ত্র লাগানো হয়। এর সাহায্যে সংরক্ষণবিদেরা জানতে পারেন, কুমিরগুলো কোথায় যাচ্ছে বা কোন এলাকায় বেশি সময় কাটাচ্ছে। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে কুমির ও এদের আবাসস্থল আরও ভালোভাবে রক্ষা করা যায়।
এ কাজে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন স্থানীয় মানুষ। চোরং সম্প্রদায়ের স্থানীয় পাহারাদারেরা কুমিরের সম্ভাব্য বাসা খুঁজে বের করেন, নদীর ওপর নজর রাখেন, অবৈধ মাছ ধরা ও শিকার বন্ধে টহল দেন এবং কোনো বিপদের খবর সরকারি কর্মকর্তাদের জানান। অর্থাৎ কুমিরগুলোর নিরাপত্তার প্রথম সারির পাহারাদার তাঁরাই।
২০২৪ সালে এই পাহারাদারদের নজরেই পাওয়া যায় অসাধারণ এক ঘটনা। কার্ডামম পাহাড়ে পাঁচটি বুনো সিয়ামিজ কুমিরের বাসা খুঁজে পাওয়া যায়। ওই বাসাগুলোতে মোট ১০৬টি ডিম ছিল। স্থানীয় মানুষের নজরদারিতে সেখান থেকে ৬০টি কুমিরছানা বের হয়ে আসে। এই শতাব্দীতে বুনো পরিবেশে সিয়ামিজ কুমিরের এটিই সবচেয়ে বড় নথিবদ্ধ প্রজননের ঘটনা।
সংরক্ষণকর্মীদের মতে, স্থানীয় মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া এই কাজ সফল করা সম্ভব হতো না। কারণ, চোরং সম্প্রদায়ের মানুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম কুমিরগুলোর সঙ্গে একই পরিবেশে বসবাস করছেন। নদীর পাশে তাঁদের চাষাবাদ করতে হয়। কখনো কুমির এসে তাঁদের ফসলও নষ্ট করে। তবু কুমিরের ওপর তাঁদের রাগ নেই। বরং দীর্ঘদিন পাশাপাশি থাকার কারণে প্রাণীগুলোর আচরণ সম্পর্কে তাঁদের ভালো ধারণা তৈরি হয়েছে।
চোরং সম্প্রদায়ের এক স্থানীয় পাহারাদার সিম খমাও বলেন, তাঁরা কুমিরকে ভয় পান না। কারণ, তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই প্রাণীগুলো সেখানে আছে। তাঁরা কুমিরকে বোঝেন এবং জানেন কীভাবে তাদের সঙ্গে একই পরিবেশে থাকতে হয়।
সিয়ামিজ কুমিরের সঙ্গে কম্বোডিয়ার সম্পর্ক অবশ্য আরও পুরোনো। দেশটির ঐতিহ্যেও এই প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। আংকর ওয়াটে একসময় কুমির রাখা হতো। কম্বোডিয়ার প্রাচীন মন্দিরের দেয়ালের পাথরের খোদাইয়েও কুমিরের ছবি দেখা যায়।
একসময় যে প্রাণীকে কম্বোডিয়ার বনে আর দেখা যাবে না বলে মনে করা হয়েছিল, এখন সেই প্রাণীকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। নতুন সংরক্ষণ এলাকা, প্রজননকেন্দ্র, কুমিরের ওপর নজরদারি আর স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ, সব মিলিয়ে সিয়ামিজ কুমিরের জন্য নতুন আশার দরজা খুলেছে।
হয়তো একদিন কার্ডামম পাহাড়ের জলাভূমিতে সিয়ামিজ কুমিরের সংখ্যা এত বাড়বে যে এদের আর ‘হারিয়ে যাওয়া প্রাণী’ বলে মনে হবে না। সে অপেক্ষাতেই চলছে কুমির বাঁচানোর এই দীর্ঘ লড়াই।