তিমি কি মানুষকে গিলে ফেলতে পারে
বাস্তবে স্পার্ম তিমির পক্ষে একজন মানুষকে পুরোপুরি গিলে ফেলা সম্ভব। তবে এমন ঘটনা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।
স্পার্ম তিমির পক্ষে দুর্ঘটনাবশত একজন মানুষকে গিলে ফেলা একেবারে অসম্ভব নয়। তবে এর জন্য খুব বড় আকারের পূর্ণ বয়স্ক পুরুষ স্পার্ম তিমি প্রয়োজন হবে। তিমিটির দৈর্ঘ্য অন্তত ১৮ মিটার হতে হবে। মানে সাধারণত আমরা যে আকারের স্পার্ম তিমি দেখি, এর চেয়ে অনেক বড় হতে হবে।
অন্য বড় তিমিদের ক্ষেত্রে অবশ্য মানুষকে পুরোপুরি গিলে ফেলা অনেক কঠিন। যেমন ফিন তিমির দৈর্ঘ্য ২৬ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। কিন্তু এত বড় শরীরের তুলনায় এদের খাদ্যনালি আশ্চর্যজনকভাবে সরু। সমুদ্রতীরে ভেসে আসা তিমির মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করে দেখা গেছে, ফিন তিমির গলার ভেতরে নিজের হাতই খুব বেশি দূর পর্যন্ত ঢোকানো যায় না। তাই একজন মানুষের সেখানে পুরোপুরি ঢুকে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
এর কারণ, ফিন তিমি বেলিন তিমিদের একটি প্রজাতি। এদের খাদ্যতালিকায় পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট প্রাণীর কয়েকটি আছে। যেমন ক্রিল, ছোট মাছ ও প্ল্যাঙ্কটন। মুখের ভেতরে থাকা চালুনির মতো অংশ দিয়ে সমুদ্রের পানি ছেঁকে এসব প্রাণী আলাদা করে নেয় এই তিমি। ফলে এদের খাবারটা অনেকটা মাছের তৈরি ঘন তরলের মতো হয়ে যায়। গবেষকদের ভাষায়, ব্যাপারটা যেন ঘন মিল্কশেক পান করার মতো।
তবে বেলিন তিমির মুখে মানুষ দুর্ঘটনাক্রমে চলে যাওয়ার ঘটনা একেবারে নেই, তা নয়। ২০১৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে একটি ব্রাইডস তিমি বন্য প্রাণীর ছবি তুলছিলেন এমন এক আলোকচিত্রীকে অল্প সময়ের জন্য মুখে তুলে নিয়েছিল। পরে অবশ্য তিমিটি তাঁকে মুখ থেকে বের করে দেয়। তবে এসব ঘটনা মানুষের ওপর তিমির ইচ্ছাকৃত আক্রমণ নয়। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী শেন জেরোর মতে, তিমি আসলে নিজের খাবার ধরার চেষ্টা করছিল, আর মানুষটি সম্ভবত ভুল করে এর পথে পড়ে গিয়েছিলেন।
স্পার্ম তিমির ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা আলাদা। এরা সমুদ্রের সবচেয়ে বড় প্রাণীদের কয়েকটিকে শিকার করে। এদের পছন্দের খাবারের মধ্যে আছে দৈত্যাকার স্কুইড ও কলসাল স্কুইড। কলসাল স্কুইড শুঁড়সহ ১৪ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এর ওজন কয়েক শ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
গবেষকেরা মনে করেন, বন্দী অবস্থায় বেলুগা তিমির খাবার ধরার পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করে স্পার্ম তিমি কীভাবে শিকার মুখে নেয়, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। স্পার্ম তিমি গলার ভেতরের হাইওয়েড নামের একটি হাড় নিচের দিকে নামিয়ে মুখের ভেতর চাপ কমিয়ে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হয়। একই সময়ে তাদের জিব পেছনের দিকে সরে যায়। ফলে অনেকটা পিস্টনের মতো একটি ব্যবস্থা তৈরি হয়। এতে মুখের ভেতর কম চাপের জায়গা তৈরি হয়ে পানি এবং এর সঙ্গে থাকা অসতর্ক শিকার তিমির মুখে ঢুকে পড়ে। একই সঙ্গে তিমির গলা ও খাদ্যনালির প্রবেশপথও কিছুটা প্রশস্ত হয়।
এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যোগ হয়। স্পার্ম তিমির স্বরযন্ত্র বা কণ্ঠনালি অন্যান্য বিশাল তিমির তুলনায় বাঁ দিকে অবস্থান করে। ফলে এদের গলা তুলনামূলকভাবে অনেক চওড়া। এ কারণে এরা বড় আকারের শিকারও একবারে মুখের ভেতরে নিতে পারে।
তবে স্পার্ম তিমি ঠিক এভাবেই শিকার গিলে ফেলে কি না, তা নিশ্চিতভাবে কেউ দেখেনি। এই বিশাল ও রহস্যময় প্রাণীগুলো যখন স্কুইড শিকার করে পানির ওপরে উঠে আসে, তখন গবেষকেরা এদের মুখ থেকে সত্যি সত্যি স্কুইডের বড় বড় টুকরা ঝুলতে দেখেছেন। কখনো আবার তিমির পেছনে ভাসতে থাকা স্কুইডের টুকরাও দেখা যায়।
আর মানুষকে গিলে ফেলা স্পার্ম তিমির স্বাভাবিক আচরণও নয়। সিনেমায় এমন ঘটনা দেখা দারুণ রোমাঞ্চকর হলেও বাস্তবে মানুষের আশপাশে স্পার্ম তিমি সাধারণত খুবই শান্ত ও কোমল আচরণ করে, যদি মানুষ তাদের বিরক্ত না করে। তাই শারীরিকভাবে একজন মানুষকে গিলে ফেলা সম্ভব হলেও তিমির আচরণ এবং তাদের গভীর সমুদ্রের প্রাণী শিকারের অভ্যাস বিবেচনা করলে এমন ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত, অত্যন্ত কম’।
দুর্ঘটনাক্রমে স্পার্ম তিমির মুখে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও খুব কম। কারণ, খাবারের সন্ধানে এসব তিমি সমুদ্রের দুই কিলোমিটারের বেশি গভীরে ডুব দিতে পারে। ডুবুরিরা সাধারণত এত গভীরে যেতে পারেন না।
মজার বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত একজন মানুষকে পুরোপুরি গিলে ফেলেছে, এমন ঘটনার নিশ্চিত প্রমাণ রয়েছে শুধু একটি প্রাণীর ক্ষেত্রে। সেটি হলো রেটিকুলেটেড পাইথন বা অজগর। ইন্দোনেশিয়ায় এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
অন্য সাপের মতো এই অজগরও এর নমনীয় মাথা ও চোয়ালের কারণে নিজের মাথার তুলনায় অনেক বড় শিকার গিলে ফেলতে পারে। তাদের মাথার খুলিতে একাধিক জোড়া থাকার কারণে চোয়াল অনেক বেশি নড়াচড়া করতে পারে। এ ছাড়া নিচের চোয়ালের নরম ও প্রসারণশীল টিস্যু এদের এমনভাবে চোয়াল ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে, যাতে মাথার চেয়েও অনেক বড় শিকারকে মুখের ভেতরে নেওয়া সম্ভব হয়।
তবু একজন মানুষকে গিলে ফেলা সাপের জন্যও সহজ নয়। জীববিজ্ঞানী ব্রুস জেইনের মতে, একজন মানুষকে গিলতে হলে সাপটির মাথা থেকে পা পর্যন্ত একদিক ধরে গিলতে হবে। মানুষের হাত-পা ছড়িয়ে থাকলে সেগুলো সাপের মুখের কোণে আটকে যেতে পারে। তার ওপর মানুষের চওড়া ও শক্ত কাঁধও সাপের মুখের ভেতরে নেওয়া কঠিন।
জেইনের মতে, অজগরের মানুষ শিকার করার ঘটনাও অত্যন্ত বিরল। কারণ, কোনো প্রাণীর কোনো কাজ করার শারীরিক সক্ষমতা থাকলেই যে সে বাস্তবে সেই কাজটি করবে, এমন নয়।
সূত্র: সায়েন্স নিউজ