যুক্তরাষ্ট্রের কিশোর-কিশোরীদের কি বুদ্ধি কমে যাচ্ছে

৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার প্রকাশিত হয় আন্তর্জাতিক শিক্ষা মূল্যায়ন (পিআইএসএ) জরিপ। সাম্প্রতিক সেই জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতার স্কোর আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। এই অবনতির ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ার দক্ষতা গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে।

২০০০ সালে এই পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর গাণিতিক দক্ষতার দিক থেকেও আমেরিকান শিক্ষার্থীরা এখন পর্যন্ত অন্যতম সর্বনিম্ন স্কোরে আটকে আছে। তবে এ যাত্রায় বিজ্ঞানের ফলাফলে তারা নিজেদের আগের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

বিশ্বজুড়ে ১৫ বছর বয়সীদের নিয়ে আয়োজিত এই ‘প্রোগ্রাম ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসেসমেন্ট (পিআইএসএ) পরীক্ষায় সিঙ্গাপুর ও চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের তুলনায় সব সূচক বা মাপকাঠিতেই পিছিয়ে পড়েছে আমেরিকান শিক্ষার্থীরা।

করোনা মহামারি আসার বহু আগে থেকেই আমেরিকান শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফলাফল একটু একটু করে খারাপ হচ্ছিল। তবে নতুন এই রিপোর্ট দেখে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বেশ চিন্তিত। এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি বড় ধাক্কা ও বিপৎসংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক শিক্ষাসচিব মার্গারেট স্পেলিংস এ নিয়ে বেশ চিন্তিত। তিনি বলেন, শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য যেসব পড়াশোনা ও দক্ষতা শেখা খুব দরকার, তারা যেন সেসব ছেড়ে উল্টো পথে হাঁটছে। এটি সত্যিই ভয় পাওয়ার মতো বিষয়। তাই দেরি না করে দ্রুত শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

আরও পড়ুন

কিন্তু সমস্যা কি শুধু আমেরিকাতেই

আসল সত্যিটা হলো, এই বিপদ কিন্তু শুধু এক দেশের নয়। সারা বিশ্বেই চলছে। স্মার্টফোন আর সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর বেশি নির্ভরতা এবং মহামারির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের কারণে কিশোর-কিশোরীদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা দিন দিন কমে যাচ্ছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ সালের পর বিশ্বের অনেক ধনী দেশেই কিশোর-কিশোরীদের পড়ার ও বোঝার ক্ষমতা কমছে। এমনকি ২০১৮ সালের পর বিশ্বজুড়ে গণিতের স্কোরও নামছে নিচের দিকে।

তবে ধনী দেশগুলোর জোট ‘ওইসিডি’র তথ্য অনুযায়ী, অন্যান্য দেশের তুলনায় আমেরিকার শিক্ষার্থীরা এখনো রিডিং আর বিজ্ঞানে বেশ ভালোই করছে। তবে সমস্যা বেঁধেছে গণিত নিয়ে। সেখানে ওদের অবস্থান এখনো একেবারেই মাঝামাঝি।

পেছনে মূল কারণ প্রযুক্তি ও মনোযোগের অভাব

বিশেষজ্ঞরা শিক্ষার্থীদের এমন অবনতির জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহারকে দায়ী করছেন। ইন্টারনেটের প্রভাবে শিশুরা সহজেই মনোযোগ হারিয়ে ফেলছে। আনন্দের জন্য বই পড়ার অভ্যাস হারিয়ে যাচ্ছে।

পিআইসিএর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে দ্রুত ও অসতর্ক পাঠক শিক্ষার্থী অর্থাৎ যারা কোনো রকমে লেখা চোখ বুলিয়ে ভুল উত্তর দেয় তাদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

গত বছর ৯১টি দেশের প্রায় সাড়ে সাত লাখ কিশোর-কিশোরী এই পরীক্ষায় অংশ নেয়। সর্বোচ্চ স্কোর করা দেশের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে সিঙ্গাপুর, জাপান ও কোরিয়া।

চীনও অত্যন্ত ভালো ফলাফল করেছে। তবে তারা শুধু সাংহাই, বেইজিংয়ের মতো ধনী উপকূলীয় অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের এই পরীক্ষায় অংশ নেওয়ায়, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অবশ্য গবেষক ট্রেসি বার্নসের মতে, চীনা শিক্ষার্থীরা মার্কিন শিক্ষার্থীদের চেয়ে গণিতে গড়ে পাঁচ বছর ও বিজ্ঞানে তিন বছরের বেশি এগিয়ে রয়েছে।

আরও পড়ুন

যুক্তরাষ্ট্রের পিছিয়ে পড়ার চিত্র

শিক্ষা খাতে বিপুল অর্থ খরচ করেও বিশ্বমঞ্চে পিছিয়ে পড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। সিঙ্গাপুরে যেখানে ৩৭ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে সর্বোচ্চ নম্বর পায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রে এই হার মাত্র ৮ শতাংশ।

বিজ্ঞানে তারা সুইজারল্যান্ড ও ফিনল্যান্ডের সমপর্যায়ে থাকলেও গত এক দশকে এমন অনেক আমেরিকান কিশোর-কিশোরী তৈরি হয়েছে। যারা একটা সাধারণ বিদ্যুৎ বা পানির বিল পড়ার মতো ন্যূনতম দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।

ওইসিডির প্রধান আন্দ্রেয়াস শ্লাইচারের মতে, এশিয়ার দেশগুলো পিছিয়ে পড়া স্কুলগুলোতে সেরা শিক্ষকদের পাঠিয়ে মানোন্নয়ন নিশ্চিত করে। যার পুরোপুরি বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত ছোট ক্লাসরুমের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়। কিন্তু এশিয়ার সেরা দেশগুলো ক্লাসের আকার বড় রাখলেও শিক্ষক হিসেবে একদম সেরা ব্যক্তিদেরই নিয়োগ দেয়।

ছবি: রয়টার্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উল্টো ব্যবহার

পশ্চিমা বিশ্বে শিক্ষার্থীরা এআই ব্যবহার করে নিজেদের পড়ালেখার কাজ সহজ বা ফাঁকি দেওয়ার জন্য। অন্যদিকে এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলোতে শিক্ষার্থীরা সরাসরি এআই ব্যবহার করে না। সেখানে শিক্ষকেরা এআই ব্যবহার করেন, যাতে শিক্ষার্থীরা আরও গভীরভাবে চিন্তা করতে পারে। পড়াশোনায় কঠোর পরিশ্রমী হয়ে ওঠে।

গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ফলাফলের পেছনে কিছু কারিগরি কারণও রয়েছে। মাত্র ১৪৪টি স্কুলের ৪ হাজার ৬০০ জন শিক্ষার্থী এতে অংশ নিয়েছিল, যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন শিক্ষা বিভাগের কর্মীর সংখ্যা কমিয়ে দেওয়ায় এই পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

সব সীমাবদ্ধতার পরও বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত, আমেরিকান শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় সত্যিই পিছিয়ে পড়ছে। পুরো দেশের জন্য কোনো কেন্দ্রীয় শিক্ষা কর্মসূচি না থাকায় এখন প্রতিটি অঙ্গরাজ্যকেই নিজেদের উদ্যোগে ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা–সংকট সামাল দিতে কারোরই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস
আরও পড়ুন