পেপার কাটের যন্ত্রণা এত তীব্র কেন
শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও কাগজে হাত কেটে যেতে পারে। অফিসে কাজ করার সময়, পড়ার টেবিলে বই বা খাতা পাতা ওলটানোর সময় কিংবা কোনো নতুন কাগজ ঠিক করার মুহূর্তে হঠাৎ করেই আঙুল কেটে যেতে পারে। এই ছোট ও হালকা কাটাছেঁড়া তেমন বড় কোনো বিপদ না আনলেও, কাজ করার সময় এটি বেশ অস্বস্তি ও জ্বালাপোড়া তৈরি করে। এমন পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিকভাবে কী করা উচিত বা ঘরে বসেই–বা কীভাবে এর যত্ন নেওয়া যায়, তা জেনে রাখা খুব জরুরি। কিন্তু ঠিক কী কারণে এই ছোট একটা আঘাতে এত বেশি ব্যথা হয়, তা কি কখনো ভেবে দেখেছ?
বেশি ব্যথা লাগার কারণ
আমাদের পুরো শরীরে শত শত স্নায়ু বা নার্ভ ছড়িয়ে আছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, হাত ও আঙুলের মাথায় এই স্নায়ুর শেষপ্রান্তগুলো খুব কাছাকাছি ও ঘন হয়ে সাজানো থাকে। শরীরের অন্য যেকোনো জায়গার চেয়ে আমাদের আঙুলে স্পর্শ বা ব্যথা পাওয়ার অনুভূতি বোঝার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। ২০১৪ সালের এক গবেষণাতেও এই তথ্য প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু হাত ও আঙুলে স্নায়ুর ঘনত্ব অনেক বেশি থাকে, তাই কাগজ দিয়ে একটুখানি কাটলেও তাতে ব্যথা অনেক বেশি লাগে।
পাশাপাশি, হাত ও আঙুলের ভেতরে রক্তনালি বা কৈশিক নালিগুলোও খুব ঘন হয়ে থাকে। এই কারণে কাগজ দিয়ে কাটলে বেশ ভালো রকমের রক্তপাতও হতে পারে। তবে কিছু শারীরিক সমস্যার কারণে কাগজের কাটার ক্ষত আরও বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে কিংবা শুকাতে অনেক বেশি সময় নিতে পারে।
নিউরোপ্যাথির মতো সমস্যা থাকলে শরীরের ব্যথার অনুভূতি পুরো বদলে যেতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, নিউরোপ্যাথিতে আক্রান্ত ব্যক্তি বুঝতেই পারেন না যে তার আঙুল কেটে গেছে। আর চিকিৎসা না হওয়ায় সেই ছোট কাটা থেকেই পরে বড় কোনো ঝামেলা তৈরি হতে পারে। তাই এই ধরনের সমস্যা থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
এ ছাড়া ডায়াবেটিস থাকলে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে কিংবা স্নায়ুর নানা জটিলতা থাকলে কাগজের কাটার মতো ছোটখাটো ক্ষতও সহজে শুকাতে চায় না। এই সমস্যাগুলো শরীরের স্বাভাবিক নিরাময় ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। তাই এমন কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে কাগজের আঁচড়ে আঙুল কাটলেও দ্রুত ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলা জরুরি।
কাগজে আঙুল কাটলে ঘরে বসে যেভাবে যত্ন নেবে
কাগজে আঙুল কেটে যাওয়া খুব বড় কোনো দুর্ঘটনা নয়। সাধারণত কোনো চিকিৎসা ছাড়াই দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে এটি আপনাআপনি ভালো হয়ে যায়। তবে ক্ষত দ্রুত ও ভালোভাবে সারিয়ে তুলতে ঘরে বসেই তুমি কিছু সহজ পদক্ষেপ নিতে পারো।
হাত পরিষ্কার রাখা
কাগজ দিয়ে আঙুল কেটে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নাও। এতে ক্ষতের ময়লা দূর হয় এবং ইনফেকশন বা জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি কমে যায়। ক্ষত পুরোপুরি না শুকানো পর্যন্ত হাত পরিষ্কার রাখার এই অভ্যাস বজায় রেখো।
ব্যান্ডেজ লাগিয়ে রাখা
ছোটখাটো কাটাছেঁড়া খোলা রাখলেও সমস্যা নেই। তবে ক্ষতটি যদি একটু বড় হয় বা বেশি ব্যথা করে, তবে ব্যান্ডেজ করে রাখতে পারো। এটি ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া থেকে ক্ষতকে রক্ষা করবে। বিশেষ করে সারা দিন কিবোর্ড বা দরজার হাতল ধরার সময় ব্যান্ডেজ ব্যবহার করা বেশ জরুরি। এ ছাড়া এটি ক্ষতস্থানকে নতুন করে ছড়ে যাওয়া থেকেও বাঁচায়। প্রতিদিন নিয়মিত ব্যান্ডেজ বদলে ফেলবে, আর ভেজা বা নোংরা হলে তো অবশ্যই পাল্টাতে হবে।
গ্লাভস পরা
আঙুল কেটে গেলে দৈনন্দিন কিছু কাজ করার সময় গ্লাভস পরে নেওয়া বেশ বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে বাসনপত্র ধোয়া, রান্নাবান্না করা কিংবা বাগান করার মতো কাজগুলো করার সময় গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত। গ্লাভস পরলে ক্ষতে কোনো ধরনের জীবাণু বা পানি যাওয়ার ভয় থাকে না, ফলে ক্ষতটি খুব দ্রুত সেরে ওঠে।
কখন ডাক্তারের কাছে যাবে
কয়েক দিন ধরে ক্ষতস্থানের দিকে অবশ্যই খেয়াল রাখবে। যদি দেখতে পাও ক্ষতস্থানের লালচে ভাব বেড়ে গেছে, ফুলে গেছে, ব্যথা কমার বদলে আরও বেড়ে গেছে, পুঁজ বা পানি পড়ছে কিংবা ক্ষতস্থান গরম অনুভূত হচ্ছে তবে দেরি না করে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেবে। কারণ এই লক্ষণগুলো স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেয় যে ত্বকে ইনফেকশন বা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।
কাগজে কাটা রোধ করার সহজ উপায়
হঠাৎ করে কাগজ দিয়ে আঙুল কেটে যেতে পারে। তবে কিছু সাবধানতা মানলে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে ফেলা সম্ভব।
ত্বক শুষ্ক থাকলে কাগজের ধারে তা খুব সহজেই কেটে যায়। তাই হাত নরম ও আর্দ্র রাখতে হ্যান্ড ক্রিম, লোশন বা বাম ব্যবহার করো। বিশেষ করে ঠান্ডা আবহাওয়া বা হাত ধোয়ার পর এটি বেশি দরকার।
প্রতিদিন যদি অনেক কাগজ নিয়ে কাজ করতে হয়, তবে ল্যাটেক্স গ্লাভস পরে নিতে পারো। এটি তোমার ত্বক ও কাগজের মধ্যে সুরক্ষার ঢাল হিসেবে কাজ করবে।
তাড়াহুড়া করে কাজে কিছু করতে গেলে সাধারণত কাগজের ধারে ত্বক কেটে যায়। তাই কোনো রকম তাড়াহুড়া না করে ধীরস্থিরভাবে কাগজ নাড়াচাড়া করার অভ্যাস করো। হাত দিয়ে খাম বা কাগজ না ছিঁড়ে সব সময় লেটার ওপেনার ব্যবহার করতে পারো। এতে আঙুল কেটে যাওয়ার কোনো ভয় থাকে না।
শেষ কথা
কাগজে হাত বা আঙুল কেটে যাওয়া একটি সাধারণ ঘটনা। তবে হাতের আঙুলে স্নায়ুর ঘনত্ব অনেক বেশি থাকায় সামান্য কাটার পরেই বেশ ভালো রকম ব্যথা হয়। সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই এই ক্ষত সেরে যায়। সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে অ্যান্টিবায়োটিক মলম লাগিয়ে রাখলে এবং প্রয়োজনে ব্যান্ডেজ ব্যবহার করলে দ্রুত আরাম পাওয়া যায়। তবে ব্যথা না কমলে কিংবা ক্ষতস্থানে কোনো সমস্যা দেখা দিলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবে।