১ ট্রিলিয়ন ডলার দিয়ে ইলন মাস্ক যা যা করতে পারবেন
ইলন মাস্ক এখন বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার। বর্তমানে ৯১৩ বিলিয়ন বা ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক ইলনের সম্পদ প্রতিদিন আরও বাড়ছে। তাঁর বর্তমান সম্পদ সুইজারল্যান্ডের পুরো অর্থনীতির চেয়েও বেশি। তিনি মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসের চেয়ে ১৩ গুণের বেশি ধনী। আর একজন সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষ থেকে ১ কোটি ১০ লাখ গুণ বেশি ধনী। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে কী কী ভালো কাজ করা সম্ভব?
তবে এখানে একটি বড় বিষয় মনে রাখা দরকার। মাস্কের সম্পদের সিংহভাগই তাঁর কোম্পানিগুলোর শেয়ারের আকারে রয়েছে। কোনো নগদ টাকা হিসেবে নয়। ঠিক যেমন সাধারণ মানুষের সম্পদ তাদের নিজের বাড়ি বা জমির মূল্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাঁর সম্পদে ১২টি শূন্য থাকলেও তিনি চাইলেই পুরো অর্থ বা এর বড় অংশ হুট করে নগদ টাকায় বদলাতে পারবেন না। কারণ, তা করতে গেলে তাঁর কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম হুট করে কমে যেতে পারে।
অবশ্য তাঁর জন্য খুব একটা আফসোস করার কিছু নেই। মাস্কের মতো ট্রিলিয়নিয়ার ব্যক্তিরা সাধারণত নিজেদের শেয়ার না বেচে বরং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খরচের টাকা জোগাড় করেন। সহজ কথায়, মাস্কের সিন্দুকে হয়তো সত্যি সত্যি এক ট্রিলিয়ন ডলার নগদ জমা নেই, কিন্তু তাঁর কাছে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
ইলন মাস্কের কাছে এমন এক পাহাড়সম সম্পদ রয়েছে, যা তিনি সারা জীবনেও খরচ করে শেষ করতে পারবেন না। এর মানে হলো, চাইলে তিনি তাঁর এই সম্পদের একটি অংশ অন্যদের কল্যাণে ব্যয় করতে পারেন। দুর্ভাগ্যবশত, দানসদকা বা সমাজসেবী হিসেবে ইলন মাস্কের সুনাম খুব একটা ভালো নয়।
একসময় তিনি তাঁর সম্পদের বড় অংশ দান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তিনি প্রতিবছর তাঁর মোট সম্পদের অতি সামান্য অংশই দাতব্যকাজে খরচ করেন। এর একটি বড় অংশ তিনি এমন একটি গোপন দাতব্য তহবিলের মাধ্যমে খরচ করেন, যেটি নগদ টাকা জমিয়ে রাখার দায়ে টানা তিন বছর মার্কিন সরকারের রাজস্ব বিভাগের জরিমানার মুখে পড়েছিল।
তুলনামূলকভাবে কম ধনী হওয়া সত্ত্বেও বিল গেটস এ পর্যন্ত ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থাৎ তাঁর মোট সম্পদের ২০ শতাংশের বেশি দাতব্যকাজে দান করেছেন। অথচ ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার আগে মাস্ক তাঁর সম্পদের ১ শতাংশের কম দান করেছিলেন।
ইলন মাস্ক মাঝেমধ্যে খুব বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেন। বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর করা, কোনো শহরের পানির সংকট মেটানো কিংবা সরকারি কর্মীদের বেতনের ব্যবস্থা করা। সম্প্রতি তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আমেরিকার সব শিশুকে তিনি নিজের কোম্পানির শেয়ার উপহার দেবেন।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এসব প্রতিশ্রুতির একটিও তিনি শেষ পর্যন্ত রাখেননি। বরং তাঁর নানা কর্মকাণ্ডের কারণে উল্টো লাখ লাখ মানুষ বিপদে পড়েছে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন।
ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পর মাস্কের মন হঠাৎ খুব উদার হয়ে যাবে, এমনটা ভাবার কোনো কারণ নেই। তবু তিনি যদি সত্যিই মানবজাতির মঙ্গল নিয়ে কিছু করতে চান, তবে বেশ কিছু দারুণ উদ্যোগ নিতে পারেন।
১. কোটি কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করা
গত বছরের একটি হিসাব অনুযায়ী, সারা পৃথিবী থেকে চরম দারিদ্র্য দূর করতে বছরে মাত্র ৩১৮ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়।
ইলন মাস্ক তাঁর মোট সম্পদের এক-চতুর্থাংশের একটু বেশি খরচ করলেই বিশ্বের প্রায় কোটি কোটি মানুষের প্রতিদিনের খাবার, নিরাপদ আশ্রয় ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করে দিতে পারেন। এত বিশাল পরিমাণ টাকা দান করার পরও তাঁর কাছে প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলার থাকবে। আর যেভাবে তাঁর সম্পদ বাড়ছে, তাতে তিনি অনেক বছর ধরে এই ভালো কাজটি চালিয়ে যেতে পারবেন।
২. যুক্তরাষ্ট্রের সব চিকিৎসাঋণ পরিশোধ করা
আমেরিকার প্রতি তিনজন মানুষের মধ্যে একজনের চিকিৎসা বিল বকেয়া রয়েছে। ক্যানসারের মতো মারাত্মক রোগ ধরা পড়ার পর এই বাড়তি ঋণের বোঝা অনেক পরিবারকে মুহূর্তেই সর্বস্বান্ত করে দেয়। বর্তমানে আমেরিকানদের ওপর প্রায় ২২০ বিলিয়ন ডলারের চিকিৎসাঋণ জমে আছে। টাকার অভাবে অনেক পরিবার ঠিকমতো খেতেই পারে না, আবার খরচের ভয়ে অনেকে সময়মতো চিকিৎসকও দেখাতে যায় না।
ইলন মাস্ক দাবি করেন, তাঁর কোম্পানির তৈরি রোবট একদিন চিকিৎসাসেবায় বিরাট পরিবর্তন আনবে। কিন্তু তিনি চাইলে এখনই আমেরিকার সব মানুষের চিকিৎসা বিল মিটিয়ে দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে হাত লাগাতে পারেন।
৩. সবার জন্য প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষার খরচ দেওয়া
আমেরিকার অনেক মা–বাবাকে ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনা ও দেখাশোনা করার জন্য প্রতিবছর হাজার হাজার ডলার খরচ করতে হয়। এটি অনেক সময় তাঁদের মোট আয়ের ১৫ শতাংশের বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, সব শিশুর জন্য প্রাক্-প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা দরকার। এটি হলে শিশু ও কর্মজীবী পরিবারগুলো অনেক উপকৃত হবে।
পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন স্কুল ঘর বানানোসহ সারা দেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা চালু করতে ১০ বছরে প্রায় ৩৫১ বিলিয়ন ডলার খরচ হবে। এই হিসাব অনুযায়ী, মাস্ক একা মানুষই তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই বিশাল পড়াশোনার খরচ চালিয়ে যেতে পারবেন।
৪. বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে বাঁচানো
পৃথিবীর প্রায় অর্ধেক মানুষ অর্থাৎ প্রায় ৪১০ কোটি মানুষ এমন সব জায়গায় বাস করে, যেখানে তীব্র গরম, খরা ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মারাত্মক ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে গরিব ও উন্নয়নশীল দেশের মানুষই বেশি। নিরাপদ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় এসি, ঘরবাড়ি রক্ষা বা সেচব্যবস্থার মতো আধুনিক সুবিধা কেনার সামর্থ্য তাদের নেই।
পৃথিবীর প্রতিটি দেশকে এই চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের হাত থেকে রক্ষা করতে বছরে কত টাকা খরচ হতে পারে? আনুমানিক ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা প্রায় ইলন মাস্কের মোট সম্পদের সমান।
৫. পৃথিবী থেকে ক্ষুধা দূর করা
কয়েক বছর আগে ইলন মাস্ক জাতিসংঘের ওয়ার্ল্ড ফুড প্রোগ্রামকে ছয় বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের টেসলা শেয়ার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে তিনি শর্ত দিয়েছিলেন, এই টাকা দিয়ে কীভাবে বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর করা সম্ভব, তার একটি সঠিক হিসাব তাঁকে দেখাতে হবে। সংস্থাটি কয়েক দিনের মধ্যেই একটি দারুণ পরিকল্পনা জমা দেয়। সেখানে তারা দেখায়, মাত্র ৬ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার খরচ করে চরম অনাহারে থাকা ৪ কোটি ২০ লাখ মানুষকে খাবার দেওয়া সম্ভব। কিন্তু শেষ পর্যন্ত মাস্ক তাঁর সেই প্রতিশ্রুতি রাখেননি।
বাস্তবিকভাবে পৃথিবী থেকে চিরতরে ক্ষুধা দূর করতে এর চেয়ে অনেক বেশি অর্থের প্রয়োজন। জাতিসংঘের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে ক্ষুধা পুরোপুরি মেটাতে বছরে প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার দরকার। অর্থাৎ মোট ৪৬৫ বিলিয়ন ডলার হলে এটি সম্ভব, যা ইলন মাস্কের মোট সম্পদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
৬. ক্যানসার ও মারাত্মক রোগের গবেষণায় টাকা দেওয়া
ক্যানসার বা স্মৃতি হারানোর মতো কঠিন রোগের টিকা ও ওষুধ আবিষ্কার করতে প্রচুর গবেষণার প্রয়োজন হয়। গবেষণায় পর্যাপ্ত টাকা দিলে নতুন নতুন চিকিৎসা উদ্ভাবন করা সম্ভব। ২০২৩ সালে আমেরিকা চিকিৎসা ও গবেষণার পেছনে প্রায় ৯৯৩ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে।
আমেরিকায় গবেষণার জন্য বরাদ্দ করা টাকার যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা মাস্কের একার সম্পদ দিয়েই মেটানো সম্ভব। এতে টাকার অভাবে আটকে থাকা অনেক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা আবার শুরু করা যাবে।
৭. সবার জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা
সারা পৃথিবীতে প্রায় ৪০০ কোটির বেশি মানুষের ঘরে বিশুদ্ধ খাবার পানি নেই। দূষিত পানি পান করার কারণে এরা কলেরা বা আমাশয়ের মতো মারাত্মক রোগে ভোগে।
সবার ঘরে ঘরে পরিষ্কার পানি ও উন্নত টয়লেট সুবিধা পৌঁছে দিতে ভালো পাইপলাইন, ফিল্টার ও নলকূপ বসাতে হবে। জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বের প্রত্যেক মানুষের জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করতে বছরে প্রায় ১১৪ বিলিয়ন ডলার লাগবে। ইলন মাস্ক চাইলে একাই টানা ১০ বছর এই বিপুল খরচ চালিয়ে যেতে পারেন।
৮. মানুষের ঘরের অভাব মেটানো
আমেরিকায় ঘরবাড়ি না থাকা বা গৃহহীন মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এতে সাড়ে সাত লাখের বেশি মানুষ কষ্টে দিন কাটায়। এই আবাসন সমস্যা মেটাতে বছরে ১০ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে।
আমেরিকার ঘরবাড়ির সংকট দূর করতে ২০ লাখ নতুন বাড়ি তৈরি করা দরকার। পাঁচ বছরে এর পেছনে প্রায় ৯৫ বিলিয়ন ডলার খরচ হতে পারে। মাস্ক চাইলে অনায়াসেই এত মানুষের মাথার ওপর ছাদের ব্যবস্থা করে দিতে পারেন।
৯. যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া চিরতরে দূর করা
যক্ষ্মা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ানক ছোঁয়াচে রোগগুলোর একটি। প্রতিবছর প্রায় ১ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয় এবং প্রায় ১৫ লাখ মানুষ মারা যায়। ২০৩০ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে যক্ষ্মা চিরতরে বিদায় করতে প্রায় ২৫০ বিলিয়ন ডলার দরকার।
ইলন মাস্ক তাঁর অঢেল সম্পদের ছোট্ট একটি অংশ খরচ করেই যক্ষ্মা দূর করার কাজে সাহায্য করতে পারেন। এর সঙ্গে বছরে মাত্র ৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার খরচ করে ম্যালেরিয়া রোগটিও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব।
১০. পৃথিবীর সব মানুষকে টাকা ভাগ করে দেওয়া
এটি বেশ মজার একটি হিসাব। মাস্কের মোট সম্পদ থেকে ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার যদি পৃথিবীর ৮২০ কোটি মানুষের মধ্যে সমানভাবে ভাগ করে দেওয়া হয়, তবে সবাই প্রায় ১৪৬ ডলার বা প্রায় ১৮ হাজার টাকা) করে পাবেন।
আমেরিকার মানুষের কাছে এই টাকায় হয়তো এক সপ্তাহের বাজার হবে। কিন্তু আফ্রিকার জাম্বিয়ার মতো দেশের মানুষের জন্য এই টাকা জীবন বদলে দিতে পারে। যেখানে মানুষ দিনে দুই ডলারের কম আয় করে, সেখানে এই সামান্য টাকায় তাদের কয়েক মাসের খাবার, বাড়িভাড়া ও স্কুলের বেতন দেওয়া সম্ভব হবে।