পূর্ণিমায় কেন মন আবেগপ্রবণ হয়
চাঁদের আকর্ষণ বলের কারণে সাগরে জোয়ার-ভাটা তৈরি হয়। পাশাপাশি চাঁদ পৃথিবীর আবহাওয়া স্বাভাবিক রাখতে ভূমিকা রাখে। কিন্তু চাঁদের এই আকর্ষণে কি মানুষের মন বা আচরণেও প্রভাব ফেলে?
অনেকেরই বিশ্বাস, পূর্ণিমার রাতে মানুষের মনে আবেগ বেড়ে যায়। কেউ হয়তো হঠাৎ অনেক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে, আবার কারও আচরণে দেখা যায় খামখেয়ালিপনা। এমনকি হাসপাতালেও পূর্ণিমার রাতে রোগীদের অস্থিরতা বেড়ে যাওয়ার কথাও বলেন অনেক নার্স ও ডাক্তার।
বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনেই নানা রকম কৌতূহল ও সন্দেহ রয়েছে। কিন্তু এর পেছনে কি সত্যিই কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে, নাকি এটি শুধু একটি পুরোনো ভুল ধারণা?
আসল সত্যিটা কী, সে বিষয়ে কথা বলেছেন দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার। যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের বেডরক রিকভারি সেন্টারের প্রধান চিকিৎসক ডাক্তার অ্যামি ফিটজপ্যাট্রিক। তিনি জানান, চাঁদের সঙ্গে মানুষের মন বা আচরণের পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক বিজ্ঞান মানতে নারাজ। বহু বছর ধরে এ নিয়ে অনেক গবেষণা হলেও চাঁদের এমন প্রভাবের পক্ষে কোনো প্রমাণ মেলেনি।
একই কথা বলেন মনোবিদ ডাক্তার ম্যাক্স ডশে। চাঁদের বিভিন্ন সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগী বা মানুষের মেজাজ পর্যবেক্ষণ করে গবেষকেরা বিশেষ কোনো মিল পাননি। বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের কারণে মানুষের মন বা অনুভূতিতে বড় কোনো পরিবর্তন হওয়া প্রায় অসম্ভব।
তাহলে মানুষ কেন এমনটা ভাবে? ডাক্তার অ্যামি ফিটজপ্যাট্রিক এর একটি সহজ কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। পূর্ণিমার রাতে কোনো অদ্ভুত ঘটনা বা দুর্ঘটনা ঘটলে মানুষ সেটাকে চাঁদের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। কিন্তু অন্য সাধারণ দিনে একই ঘটনা ঘটলে কেউ আর সেটা মনে রাখে না। এভাবেই মানুষের মনে ভুল ধারণার সৃষ্টি হয়, যার পেছনে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তাহলে পূর্ণিমার রাতে মানুষ কেন হঠাৎ বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে? চাঁদ যদি সরাসরি মন খারাপ বা আবেগ বাড়াতে না পারে, তবে কেন এত মানুষ এমনটা অনুভব করেন? এটা কি কেবল মনের ভুল, নাকি প্লেসিবো ইফেক্ট?
প্লেসিবো ইফেক্ট (Placebo Effect) হলো এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার, যেখানে আসলে কোনো আসল ওষুধ না দিলেও একজন রোগী কেবল ওষুধ খাচ্ছি এবং ভালো হয়ে যাব, এই বিশ্বাসের জোরেই সুস্থ বোধ করতে শুরু করেন।
ডাক্তার অ্যামি ফিটজপ্যাট্রিক এর সহজ একটি কারণ বলেছেন। আমাদের মনের আগের কিছু ধারণা আমাদের ভাবনাকে বদলে দেয়। যদি আগে থেকেই কেউ ধরে নেয় পূর্ণিমার রাতে মন খারাপ হবে, তবে সাধারণ কোনো কারণে মন খারাপ হলেও তিনি ধরে নেবেন সেটা চাঁদের জন্যই হচ্ছে। অর্থাৎ, নিজের মন খারাপের সব দোষ চাঁদের ওপর চলে যায়।
তবে ডাক্তার ম্যাক্স ডশে বলেন, মন খারাপের এই অনুভূতি কিন্তু মিথ্যা নয়। এটি একদম সত্যি। কিন্তু এর মূল কারণ চাঁদ নয়। বরং পূর্ণিমা নিয়ে আমাদের মনের বিশ্বাস।
এর পেছনে আরেকটি বাস্তব কারণও থাকতে পারে। পূর্ণিমার রাতে জোছনার আলো জানালা দিয়ে ঘরে আসে। আবার এই আলো উপভোগ করতে গিয়ে অনেকের ঘুমানোর সময়েও এলোমেলো হয়ে যায়। এতে রাতের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। আর ঘুম ঠিকমতো না হলে পরদিন মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা মন খারাপ লাগা খুবই স্বাভাবিক।
অর্থাৎ চাঁদ নিজে সরাসরি আমাদের মনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না। চিন্তা, বিশ্বাস আর ঘুম কম হওয়ার কারণেই মূলত এমনটা ঘটে।
তবে প্রাণীদের মধ্যে চাঁদের কিছু প্রভাব সত্যি সত্যি দেখা যায়। প্রতিবছর পূর্ণিমার রাতের পর সামুদ্রিক প্রাণী প্রবাল একসঙ্গে পানিতে ডিম ছাড়ে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একধরনের প্রবালের মধ্যে আলো চেনার বিশেষ জিন থাকে, যা পূর্ণিমার আলো পেলেই বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনার বনে থাকা আজারার বানর রাতের বেলা চলাফেরা করে। পূর্ণিমার রাতে বেশি আলো থাকায় এরা সারা রাত খুব সক্রিয় থাকে। ফলে দেখা যায়, এর পরদিন সকালে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু অমাবস্যার রাতে কিংবা চন্দ্রগ্রহণের সময় যখন চারপাশ অন্ধকার থাকে, তখন এরা রাতে কোথাও না গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। এমন তথ্য পাওয়া গেছে ২০১০ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায়।
চাঁদের আলোয় শিকারি প্রাণীদের চোখে পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে। তাই পূর্ণিমার রাতে ছোট ছোট শিকারি প্রাণী কম বের হয়। ২০০৬ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু শিকার নয়, নেকড়ের মতো শিকারি প্রাণীরাও পূর্ণিমার রাতে অন্ধকারের তুলনায় অনেক কম চলাফেলা করে।