খাবার খাওয়ার আগে দেহকে মস্তিষ্ক কীভাবে প্রস্তুত করে

তুমি প্রথম গ্রাস মুখে তোলার আগেই তোমার মস্তিষ্ক তোমার শরীরকে খাবারের জন্য একদম প্রস্তুত করে ফেলে।মডেল: নাজিফা, ছবি: কবির হোসেন

স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছ। দরজার ওপাশ থেকেই নাকে এল তোমার প্রিয় কোনো খাবারের দারুণ গন্ধ! সঙ্গে সঙ্গে তোমার জিবে জল চলে এল। পেটের ভেতর হয়তো শুরু হলো গুড়গুড় শব্দ। কিন্তু তুমি তো এখনো এক গ্রাস খাবারও মুখে তোলোনি, তাহলে তোমার শরীর কীভাবে বুঝল যে দারুণ কোনো খাবার আসছে তোমার সামনে?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, তুমি প্রথম গ্রাস মুখে তোলার আগেই তোমার মস্তিষ্ক তোমার শরীরকে খাবারের জন্য একদম প্রস্তুত করে ফেলে। চুলায় রান্না হওয়া খাবারের গন্ধ মস্তিষ্ক থেকে সিগন্যাল পাঠায় সোজা তোমার অগ্ন্যাশয়ে। আর অগ্ন্যাশয় তখন রক্তে ইনসুলিন ছাড়তে শুরু করে। বিজ্ঞান সাময়িকী নেচার মেটাবলিজমে প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই চমকপ্রদ তথ্য।

বিষয়টা একটু বিশদে বোঝা যাক। তোমার মস্তিষ্কের যে অংশ তোমার খিদে নিয়ন্ত্রণ করে, তার নাম হাইপোথ্যালামাস। এখানেই থাকে এক বিশেষ ধরনের নিউরন। এদের নাম প্রো-ওপিওমেলানোকর্টিন বা পিওএমসি নিউরন। এদের কাজ হলো, তোমার পেট ভরেছে কি না, তার হিসাব রাখা। বিজ্ঞানীরা আগে থেকেই জানতেন, খাবার খাওয়ার সময় এরা জেগে ওঠে। কিন্তু নতুন গবেষণায় দেখা গেল, খাবার খাওয়ার আগেই, শুধু খাবারের গন্ধেই এই স্নায়ুকোষগুলো সতেজ হয়ে যায়!

আরও পড়ুন

কিন্তু এই নিউরনগুলো এত আগেভাগে কীভাবে সতেজ হয়? এর পেছনের জাদুকরি উপাদানটির নাম গ্লাইকোজেন। এটি আমাদের শরীরে শক্তি জমিয়ে রাখার একটি পদ্ধতি। একে তুমি স্মার্টফোনের পাওয়ার ব্যাংকের সঙ্গে তুলনা করতে পারো। শরীর যখনই শক্তির অভাব বোধ করে, তখন এই গ্লাইকোজেন ভেঙে গ্লুকোজ তৈরি হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা দেখেছেন, এই পিওএমসি নিউরনগুলোর ভেতরে গ্লাইকোজেনের ছোট ছোট পকেট থাকে। খাবারের গন্ধ পেলেই এগুলো চালু হয়ে যায় এবং শরীরকে আগাম প্রস্তুত করার জন্য শক্তি জোগায়।

বিষয়টা আরও ভালোভাবে বোঝার জন্য বিজ্ঞানীরা ইঁদুরের ওপর একটি পরীক্ষাও করেছেন। তাঁরা একটি তারের জালের ওপাশে কিছু ইঁদুরকে খাবার দেন। ইঁদুরগুলো খাবার দেখতে পাচ্ছিল, গন্ধও পাচ্ছিল, কিন্তু খেতে পারছিল না। বিজ্ঞানীরা দেখলেন, শুধু গন্ধ পেয়েই ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কে গ্লাইকোজেন তৈরির কাজ শুরু হয়ে গেছে!

এরপর বিজ্ঞানীরা জিনগত পরিবর্তন করে এমন কিছু ইঁদুর তৈরি করলেন, যাদের মস্তিষ্কের ওই বিশেষ নিউরনগুলোতে গ্লাইকোজেন তৈরির কোনো ব্যবস্থা নেই। দেখা গেল, খাবারের গন্ধ পেলেও এসব ইঁদুরের শরীর কোনো ইনসুলিন তৈরি করছে না! শুধু তা-ই নয়, এরা খাবার নিয়ে খুব একটা আগ্রহও দেখাচ্ছে না।

আরও পড়ুন

গবেষণায় আরও একটা মজার ব্যাপার বেরিয়ে এসেছে। ব্রেনের এই বিশেষ নিউরনগুলো চোখের দেখার চেয়ে নাকের গন্ধের সঙ্গে বেশি যুক্ত। অর্থাৎ শুধু খাবার দেখার চেয়ে খাবারের দারুণ গন্ধেই তোমার শরীর বেশি রিঅ্যাক্ট করে!

ভাবতে পারো, খাবার খাওয়ার কাজ খাব, এটা নিয়ে এত কিছু জানার দরকার কী? দরকার আছে। জানো নিশ্চয়, অতিরিক্ত ওজন এখন বিশ্বজুড়েই এক বড় সমস্যা। অতিরিক্ত ওজন হওয়াটা পেটের চেয়ে মস্তিষ্কের রোগই বেশি!

মস্তিষ্কের এই সার্কিট যখন ঠিকমতো কাজ করে না, তখনই মানুষের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে। খাবার আসার আগেই শরীর যদি ইনসুলিন তৈরি করে প্রস্তুত না থাকে, তবে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা এলোমেলো হয়ে যায়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরের এই আগাম প্রস্তুতির সিস্টেম কাজ করে না, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা মারাত্মক মোটা হয়ে যায় এবং তাদের ডায়াবেটিসের লক্ষণ দেখা দেয়।

বিজ্ঞানীরা আগে ভাবতেন, ব্রেনের গ্লাইকোজেন শুধু অ্যাস্ট্রোসাইট নামে একধরনের সাহায্যকারী কোষেই থাকে। কিন্তু এই গবেষণা প্রমাণ করল, নিউরনের ভেতরে থাকা গ্লাইকোজেন আমাদের খিদে ও বিপাক প্রক্রিয়ায় বিশাল ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, মস্তিষ্কের এই মেকানিজম কাজে লাগিয়ে ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ওজন কমানো এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য দারুণ সব ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হবে!

সূত্র: ফিউচারটি ডট অর্গ

আরও পড়ুন