সৈকতের বালু কোথা থেকে আসে
সমুদ্রের তীরে ঘুরতে সবারই খুব ভালো লাগে। সাগরের পানি আর পায়ের নিচের নরম বালু—সব মিলিয়ে সময়টা বেশ কাটে। কিন্তু কখনো কি মনে এই প্রশ্নটি এসেছে, সৈকতে এত বালু কেন থাকে? এই বালু আসলে কোথা থেকে আসে? আর এগুলো কেন দেখতে এমন দানাদার হয়?
অনেকেই হয়তো বলবে, সৈকতে তো মানুষ ঘুরতে যায়, এসব নিয়ে ভাবার সময় কোথায়? মূলত সৈকতের এই বালু গুঁড়া হয়ে যাওয়া পাথর, সামুদ্রিক প্রাণীর খোলসের অংশ এবং নানা ধরনের জীবাশ্মর মিশ্রণ। ঢেউয়ের তোড়ে সমুদ্র থেকে বা নদীবাহিত পলি হিসেবে এগুলো তীরে এসে জমা হয়।
বালু হলো পাথর ভেঙে যাওয়ার শেষ অবস্থা। হাজার হাজার বা লাখ লাখ বছর ধরে যখন পাথর রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে ক্ষয়ে এমন মিহি বালুকণায় পরিণত হয়। সব পাথর বা খনিজ উপাদান কিন্তু একইভাবে তৈরি হয় না। তাই সময়ের সঙ্গে যখন পাথর ক্ষয় হতে শুরু করে, তখন কেবল শক্তিশালী উপাদানগুলোই টিকে থাকে। এই টিকে থাকা অংশগুলো দিয়েই মূলত বালু তৈরি হয়।
আশপাশের পরিবেশ আর খনিজ উপাদানের ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয় একেকটি সৈকত। ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডেল অঞ্চলের বালু ধবধবে সাদা।
কিছু খনিজ খুব সহজেই নষ্ট হয়ে যায় বা পচে যায়। কিন্তু কোয়ার্টজ, ফেল্ডস্পার এবং হর্নব্লেন্ডের মতো খনিজগুলো অনেক বেশি শক্তিশালী। এগুলো সহজে ক্ষয় হয় না, তাই শেষ পর্যন্ত এগুলোই টিকে থাকে। পৃথিবীর উপরিভাগে এই শক্তিশালী খনিজগুলো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। সমুদ্রসৈকতের বেশির ভাগ বালু এই কণাগুলো দিয়েই তৈরি। আমাদের চারপাশের সৈকতগুলোতে সাধারণত কোয়ার্টজ বালুই সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যার সঙ্গে কিছুটা ফেল্ডস্পার মিশে থাকে।
কোয়ার্টজ ও ফেল্ডস্পারের মতো খনিজ উপাদানের কারণেই সাধারণত সমুদ্রসৈকতের বালু হালকা বাদামি বা তামাটে রঙের হয়। এই খনিজগুলোতে আয়রন অক্সাইড বা লোহার মরিচার মতো একধরনের দাগ থাকে, যা বালুকে এই বিশেষ রং দেয়। তবে সব জায়গার বালুর রং কিন্তু এক নয়।
আসলে প্রতিটি সৈকতের বালু সেই এলাকার পরিবেশের ওপর নির্ভর করে তৈরি হয়। তাই এক সৈকতের বালুর সঙ্গে অন্য সৈকতের বালুর হুবহু মিল পাওয়া যায় না। অর্থাৎ প্রতিটি সৈকতের বালু মানুষের আঙুলের ছাপের মতো অনন্য।
হাওয়াইয়ের সৈকতগুলো এদের কালো বালুর জন্য পরিচিত। এখানকার বালু তৈরি হয়েছে আগ্নেয়গিরির কালো পাথর থেকে।
বালুর গঠন, রং এবং এর দানাগুলো কতটা বড় বা ছোট হবে, তা নির্ভর করে এগুলো কোন উৎস থেকে এসেছে তার ওপর। শুধু তা–ই নয়, সমুদ্রের ঢেউয়ের ধরন, স্রোত ও দীর্ঘ সময় ধরে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার পরিবর্তনের ফলেও বালুর ধরনে বড় ধরনের বদল আসে।
আশপাশের পরিবেশ আর খনিজ উপাদানের ওপর নির্ভর করেই তৈরি হয় একেকটি সৈকত। ফ্লোরিডার প্যানহ্যান্ডেল অঞ্চলের বালু ধবধবে সাদা। এর কারণ হলো, এখানকার বালুতে কোয়ার্টজ নামক খনিজ উপাদানের পরিমাণ অনেক বেশি।
আবার মিয়ামির দক্ষিণের সৈকতগুলোও কিন্তু সাদা দেখায়। তবে এর কারণ একদম ভিন্ন। সেখানকার বালুতে কোয়ার্টজের বদলে ক্যালসিয়াম কার্বনেট বা সামুদ্রিক প্রাণীর ভাঙা খোলসের পরিমাণ বেশি। সাধারণত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার সৈকতে পাথরের গুঁড়ার চেয়ে শামুক-ঝিনুকের খোলস থেকে তৈরি বালুই বেশি দেখা যায়।
আবার আমাদের কক্সবাজারের সৈকতের বালু কিন্তু ধবধবে সাদা নয়। বরং কিছুটা ধূসর বা সোনালি-বাদামি রঙের। এর কারণ হলো হিমালয় থেকে নেমে আসা পলি আর পাথরের গুঁড়া। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মতো নদীগুলো বছরের পর বছর ধরে যে কাদা ও পলি বয়ে আনে, তা বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ের তোড়ে জমা হয়েই তৈরি হয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম এই বালুকাময় সৈকত। কক্সবাজারের বালুতে কোয়ার্টজের পাশাপাশি ইলমেনাইট আর জিরকন নামের কিছু ভারী খনিজ থাকে বলেই এর রং এমন বিশেষ ধরনের হয়। এই খনিজ উপাদান অত্যন্ত মূল্যবান বলে কক্সবাজারের সৈকতের বালুকে বলা হয় ব্ল্যাক গোল্ড।
প্রায় ১২ হাজার বছর ধরে সমুদ্রের পানি বাড়ার ফলে অনেক নদীর মোহনা তৈরি হয়েছে। এই মোহনাগুলো একধরনের ফাঁদ হিসেবে কাজ করে।
তবে বারমুডার অনেক সৈকতে সাদা বালুর সঙ্গে গোলাপি বা লালচে আভা দেখা যায়। এই সুন্দর রঙের উৎস হলো ফোরামিনিফেরা নামক একধরনের ক্ষুদ্র ও এককোষী সামুদ্রিক প্রাণী। এদের খোলস গোলাপি বা লালচে হওয়ার কারণেই বালু এমন রঙিন দেখায়।
অন্যদিকে হাওয়াইয়ের সৈকতগুলো এদের কালো বালুর জন্য পরিচিত। এখানকার বালু তৈরি হয়েছে আগ্নেয়গিরির কালো পাথর থেকে। এমনকি হাওয়াইয়ের কিছু সৈকতে সবুজ রঙের বালুও দেখা যায়। এর কারণ হলো সেখানে অলিভাইন নামক একধরনের সবুজ খনিজ উপাদানের উপস্থিতি।
সমুদ্রসৈকতে বালুর পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছনে মানুষের তৈরি নানা কারণ রয়েছে। রাস্তাঘাট বা বাঁধ নির্মাণের ফলে স্থলভাগ থেকে বালু আর আগের মতো উপকূলে পৌঁছাতে পারে না। উপকূলরেখা বরাবর উন্নয়নের কারণে বালু চলাচলের প্রাকৃতিক পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষের এসব কর্মকাণ্ডের কারণে পৃথিবীর সৈকতগুলোতে বালু জমার স্বাভাবিক হার প্রায় অর্ধেক কমে গেছে।
আরেকটি বড় কারণ হলো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি। প্রায় ১২ হাজার বছর ধরে সমুদ্রের পানি বাড়ার ফলে অনেক নদীর মোহনা তৈরি হয়েছে। এই মোহনাগুলো একধরনের ফাঁদ হিসেবে কাজ করে। নদী বয়ে আনা বালু উপকূলে পৌঁছানোর আগেই এই বিশাল মোহনাগুলোতে আটকে যায়।
মানুষ বালু আসা আটকে দিলেও সমুদ্রের ঢেউ তো আর থেমে নেই। ঢেউ প্রতিনিয়ত সৈকতের বালু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু নদী থেকে নতুন বালু এসে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না। ফলে সমুদ্রের উপকূল ধীরে ধীরে ভেঙে যাচ্ছে এবং বিশ্বের অনেক বড় বড় সৈকত আকারে ছোট হয়ে আসছে।