আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের সঙ্গে ৮ বছরের শিশুর তৈরি পুতুল কেন

এই বিশেষ খেলনাটি কোনো দোকান থেকে কেনা হয়নি। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার ৮ বছর বয়সী শিশু লুকাস ইয়ের তৈরি একটি নকশা করা পুতুলছবি: নাসা

প্রায় ৫৪ বছর পর মানুষ আবার চাঁদের এত কাছে গেল। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে রকেটটি উৎক্ষেপণ হয় ২ এপ্রিল। উড্ডয়নের প্রায় আট মিনিট পর যখন রকেটের ইঞ্জিনগুলো বন্ধ হয়ে গেল, তখন ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতর একটি ছোট নরম খেলনা ভাসতে দেখা গেল। এই খেলনাটি দেখেই নভোচারীরা বুঝতে পারেন যে তাঁরা পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ ছাড়িয়ে ওজনহীন অবস্থায় পৌঁছেছেন। মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘জিরো-জি ইন্ডিকেটর’ বা শূন্য মাধ্যাকর্ষণ নির্দেশক বলা হয়।

এই বিশেষ খেলনাটি কোনো দোকান থেকে কেনা হয়নি। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার ৮ বছর বয়সী শিশু লুকাস ইয়ের তৈরি একটি নকশা করা পুতুল। নাসা আয়োজিত একটি প্রতিযোগিতায় হাজার হাজার প্রতিযোগীকে হারিয়ে লুকাস এই সুযোগ পেয়েছে। তার তৈরি খেলনাটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘রাইজ’ (Rise)। এটি দেখতে গোলাকার হাসিমুখো চাঁদের মতো। যার মাথায় একটি বেসবল ক্যাপ আছে এবং তাতে পৃথিবীর অর্ধেক অংশ দেখা যাচ্ছে।

ক্যালিফোর্নিয়ার ৮ বছর বয়সী শিশু লুকাস ইয়ের তৈরি একটি নকশা করা পুতুল
ছবি: নাসা

লুকাসের এই পুতুল মূলত ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৮ মিশনের সময় তোলা বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির একটি প্রতীকী সম্মান। আর্টেমিস ২–এর নভোচারী ক্রিস্টিনা কচ লুকাসকে বিজয়ী ঘোষণা করার সময় বলেন, ‘এই ছোট্ট খেলনাটি তাঁদের সবার মন জয় করে নিয়েছে।’ প্রায় ২ হাজার ৬০০ নকশা থেকে এই পুতুলের নকশা নির্বাচিত হয়েছে।

আরও পড়ুন
বাড়িতে থাকা একটি আইপ্যাডে হঠাৎ ই–মেইলের মেসেজ চলে আসে। লুকাসের বড় ভাই অলিভার সেটি দেখে ফেলে।

লুকাসের তৈরি এই খেলনায় মহাকাশ অভিযানের বেশ কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে অ্যাপোলো ও আর্টেমিস এই দুটি আলাদা অভিযানের দুটি মহাকাশযানের ছবি দেওয়া আছে। এ ছাড়া এতে কালপুরুষ নক্ষত্রপুঞ্জের মতো করে সাজানো কিছু নক্ষত্র রয়েছে। এর কারণ, আর্টেমিস অভিযানের মহাকাশযানটির নাম রাখা হয়েছে ‘ওরিয়ন’, যার অর্থ কালপুরুষ। খেলনাটির পেছনে একটি পায়ের ছাপও দেওয়া হয়েছে। এটি মূলত চাঁদের মাটিতে নীল আর্মস্ট্রংয়ের রাখা সেই প্রথম ঐতিহাসিক পায়ের ছাপকে মনে করিয়ে দেয়।

মহাকাশে লুকাসের তৈরি জিরো-জি ইন্ডিকেটর পুতুল
ছবি: নাসা

নাসা আনুষ্ঠানিকভাবে বিজয়ী ঘোষণার আগেই লুকাসের মা–বাবাকে ই–মেইল পাঠায়। তারা চেয়েছিল লুকাসকে সারপ্রাইজ দেবে। কিন্তু তাদের সেই পরিকল্পনা আর কাজ করেনি। বাড়িতে থাকা একটি আইপ্যাডে হঠাৎ ই–মেইলের মেসেজ চলে আসে। লুকাসের বড় ভাই অলিভার সেটি দেখে ফেলে। সে সঙ্গে সঙ্গেই লুকাসকে সব জানিয়ে দেয়। এভাবেই বড় কোনো ঘোষণার আগেই লুকাস তার বিজয়ী হওয়ার খবর পেয়ে যায়।

নিজের এই বিরাট সাফল্যের খবর শুনে লুকাস অনেক বেশি অবাক হয়েছিল। সে মোটেও ভাবেনি যে তার তৈরি খেলনাটিই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে। যখন সে খবরটি প্রথম শুনল, তখন সে কী বলেছিল? লুকাসের ভাষায়, ‘আমি খুব, খুব, খুব, খুব, খুব অবাক হয়েছিলাম।’

আরও পড়ুন

অন্যান্য অনেক শিশুর মতোই ৮ বছর বয়সী লুকাস মহাকাশ নিয়ে খুব আগ্রহী। সে সৌরজগতের বাইরের দিকের বামন গ্রহগুলোর নাম খুব দ্রুত বলে দিতে পারে। লুকাস এরিস, প্লুটো, মাকেমাকে, সেডনা বা হাউমিয়া ছাড়াও মহাকাশে আরও অনেক বামন গ্রহের নাম জানে যা হয়তো আমরা জানি না।

লুকাসের এই পুতুল মূলত ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো ৮ মিশনের সময় তোলা বিখ্যাত ‘আর্থরাইজ’ ছবির একটি প্রতীকী সম্মান
ছবি: নাসা

প্রায় এক বছর আগে লুকাসের মা ইন্টারনেটে জিরো-জি ইন্ডিকেটর তৈরির একটি প্রতিযোগিতার বিজ্ঞাপন দেখতে পান। নাসা ও ফ্রিল্যান্সার নামক একটি প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত প্রতিযোগিতাটি সব বয়সের মানুষের জন্য উন্মুক্ত ছিল। বিশ্বের ৫০টির বেশি দেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ এতে অংশ নেয়। ফিনল্যান্ড, পেরু বা কানাডার মতো দেশ থেকেও অনেক চমৎকার নকশা জমা পড়েছিল।

লুকাসের তৈরি এই খেলনায় মহাকাশ অভিযানের বেশ কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে অ্যাপোলো ও আর্টেমিস এই দুটি আলাদা অভিযানের দুটি মহাকাশযানের ছবি দেওয়া আছে।

লুকাস প্রথমে বিখ্যাত স্টার ওয়ার্স মুভি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে একটি নকশা করেছিল। তার ভাবনা ছিল, একটি বেবি ইয়োডা খেলনার সঙ্গে একটি হেলমেট সুতো দিয়ে বাঁধা থাকবে। মহাকাশে ওজনহীন অবস্থায় যখন সেগুলো ভাসবে, তখন মনে হবে যেন ইয়োডা তার বিশেষ শক্তি বা ‘ফোর্স’ ব্যবহার করে হেলমেটটিকে কাছে টানছে। কিন্তু নাসার পক্ষ থেকে জানানো হয়, মুভির চরিত্রের নকশা ব্যবহার করলে আইনি বা মেধাস্বত্ব সমস্যা হতে পারে। তাই লুকাসকে সেই ভাবনাটি বাদ দিতে হয়।

এরপর লুকাস যখন নতুন কিছু ভাবছিল, তখন সে বিখ্যাত আর্থরাইজ ছবিটি দেখে। চাঁদের দিগন্তে পৃথিবীর উদয় হওয়ার সেই ছবি থেকেই তার মাথায় ‘রাইজ’ পুতুলটির ধারণা আসে। প্রতিযোগিতায় শুধু নকশা বা স্কেচ জমা দিতে বলা হয়েছিল। কিন্তু লুকাস তার পরিবারের সাহায্যে একটি প্রোটোটাইপ মডেল তৈরি করে ফেলে। এই মডেলের মাথা বানাতে সে একটি সাধারণ ড্রায়ার বল ব্যবহার করেছিল। এভাবেই জন্ম হয় আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারীদের এই ছোট্ট সঙ্গী।

আরও পড়ুন
লুকাস বড় হয়ে নাসার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী হতে চায়। তার স্বপ্ন হলো বড় হয়ে সে মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘোরার জন্য কোনো মহাকাশ স্টেশনের নকশা তৈরি করবে।

মহাকাশে শূন্য মাধ্যাকর্ষণ নির্দেশক খেলনা পাঠানোর প্রথা শুরু হয়েছিল একদম প্রথম মহাকাশযাত্রার সময় থেকেই। ১৯৬১ সালে প্রথম সোভিয়েত নভোচারী ইউরি গ্যাগারিন নিজের সঙ্গে একটি ছোট পুতুল নিয়ে গিয়েছিলেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের নভোচারীরাও এই ঐতিহ্য পালন করা শুরু করেছেন।

যখন স্পেসএক্সের ‘ক্রু ড্রাগন’ মহাকাশযানটি প্রথমবার কোনো মানুষ ছাড়াই পরীক্ষামূলকভাবে পাঠানো হয়, তখন সেটিতে ‘লিটল আর্থ বাডি’ নামের একটি ছোট খেলনা ছিল। এরপর যখন নভোচারী বব বেনকেন ও ডগ হার্লি মহাকাশে যান, তাঁরা এই প্রথাটি ধরে রাখতে চান। তাঁদের দুই ছেলে ডাইনোসর খুব পছন্দ করত। তাই তাঁরা তাঁদের সঙ্গে ‘ট্রেমর’ নামের একটি নীল বেগুনি রঙের ডাইনোসর খেলনা নিয়ে গিয়েছিলেন।

লুকাস বড় হয়ে নাসার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী হতে চায়। তার স্বপ্ন হলো বড় হয়ে সে মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘোরার জন্য কোনো মহাকাশ স্টেশনের নকশা তৈরি করবে
ছবি: নাসা

আর্টেমিস ২ মিশনের জন্য এখন ‘রাইজ’ নামের বিশেষ খেলনাটি তৈরি করা হয়েছে। এই মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যান জানান, খেলনাটির নিচে একটি চেইন বা জিপার দেওয়া পকেট আছে। এর ভেতরে একটি ছোট চিপ রাখা হয়েছে। সেটিতে ৫৬ লাখের বেশি মানুষের নাম থাকবে, যারা এই চন্দ্রাভিযানের অংশ হতে চেয়েছেন।

লুকাস বড় হয়ে নাসার ইঞ্জিনিয়ার বা প্রকৌশলী হতে চায়। তার স্বপ্ন হলো বড় হয়ে সে মঙ্গল গ্রহের চারপাশে ঘোরার জন্য কোনো মহাকাশ স্টেশনের নকশা তৈরি করবে। যারা এই ‘রাইজ’ খেলনাটি কিনতে চাও, তাদের জন্য খবর হলো নাসা এখনই এই নকশার কোনো বাণিজ্যিক লাইসেন্স দেওয়ার পরিকল্পনা করেনি।

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, দ্য গার্ডিয়ান, নিউইয়র্ক পোস্ট

আরও পড়ুন