আবারও চাঁদে গেল মানুষ
ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে তখন স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিট। বাংলাদেশে তখন ২ এপ্রিল ভোর। ১০ থেকে ১ পর্যন্ত কাউন্টডাউন শেষ হতেই নাসার সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট স্পেস লঞ্চ সিস্টেমের (এসএলএস) ইঞ্জিনগুলো চালু হয়। সফলভাবে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয় আর্টেমিস ২ মহাকাশযানটি। চারজন নভোচারীকে নিয়ে এই মহাকাশযান এখন চাঁদের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। ১৯৭২ সালের পর এই প্রথম মানুষ পৃথিবীর কক্ষপথ ছাড়িয়ে মহাকাশে এত দূরে ভ্রমণ করছে।
বুধবারের এই উৎক্ষেপণ নাসার জন্য একটি বড় সাফল্য। এই মিশনের মাধ্যমে চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানো ও ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে নভোচারী পাঠানোর পথ তৈরি হবে। ৩২ তলা সমান উঁচু বিশাল এসএলএস রকেট কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে উড্ডয়ন করে। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি সরাসরি দেখার জন্য সেখানে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়।
আর্টেমিস ২ মিশনের নভোচারী দলে রয়েছেন নাসার রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কচ ও কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির জেরেমি হ্যানসেন। তাঁরা মহাকাশে প্রায় ১০ দিন সময় কাটাবেন। এই সময়ের মধ্যে তাঁরা এমন এক দূরত্বে পৌঁছাবেন, যেখানে গত কয়েক দশকে কোনো মানুষ যায়নি।
উৎক্ষেপণ পরিচালক চার্লি ব্ল্যাকওয়েল-থম্পসন এই অভিযানের গুরুত্ব তুলে ধরে নভোচারীদের শুভকামনা জানান। উড্ডয়নের মাত্র পাঁচ মিনিট পরেই কমান্ডার ওয়াইজম্যান মহাকাশযান থেকে চাঁদকে দেখতে পান ও জানান যে তাঁরা ঠিক লক্ষ্যপথেই এগিয়ে যাচ্ছেন।
উৎক্ষেপণের আগে রকেটের জ্বালানি ও কারিগরি প্রস্তুতি
রকেট উৎক্ষেপণের আগের কয়েক ঘণ্টা ছিল বেশ উত্তেজনার। এই সময়ে রকেটে হাইড্রোজেন জ্বালানি ভরা শুরু হয়। রকেট প্রস্তুতির এই ধাপটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, চলতি বছরের শুরুতে একবার পরীক্ষা করার সময় জ্বালানি লিকেজ হয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। সেই সমস্যার কারণে তখন অভিযান অনেক দিন পিছিয়ে দিতে হয়েছিল।
তবে নাসার জন্য স্বস্তির বিষয় হলো, এবার কোনো বড় ধরনের হাইড্রোজেন লিকেজ পাওয়া যায়নি। উৎক্ষেপণ দলটি সফলভাবে রকেটে প্রায় ২৬ লাখ লিটার জ্বালানি ভরে। এই কাজটুকু কোনো ঝামেলা ছাড়াই শেষ হওয়ায় নভোচারীদের রকেটে ওঠার পথ সহজ হয়ে যায়।
অবশ্য উৎক্ষেপণের ঠিক আগে নাসাকে কিছু কারিগরি সমস্যার সমাধান করতে হয়েছিল। একটি সমস্যা ছিল রকেটের ফ্লাইট-টার্মিনেশন সিস্টেমে কমান্ড। এই সিস্টেমটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে রকেট যদি ভুল পথে গিয়ে কোনো জনবহুল এলাকার জন্য বিপদ তৈরি করে, তবে এটি রকেটটিকে নিজে থেকেই ধ্বংস করে দেবে।
নাসার প্রকৌশলীরা এই সমস্যাটি দ্রুত সমাধান করেন। এ ছাড়া ওরিয়ন ক্যাপসুলের একটি ব্যাটারির তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে গিয়েছিল। তাঁরা সেই ব্যাটারির সমস্যারও সমাধান করেন। এই ছোটখাটো কারিগরি জটিলতাগুলো উৎক্ষেপণে কোনো বাধা তৈরি করতে পারেনি।
এরপর কী হবে
মহাকাশযাত্রার প্রথম এক থেকে দুই দিন নভোচারীরা পৃথিবীর উচ্চ কক্ষপথে থেকে মহাকাশযানের সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করবেন। ওরিয়ন ক্যাপসুলের ভেতর বাতাস ও তাপমাত্রা ঠিক রাখার ব্যবস্থা অর্থাৎ লাইফ সাপোর্ট, ইঞ্জিন চালনা, দিকনির্ণয় ও যোগাযোগব্যবস্থা ঠিক আছে কি না তা যাচাই করবেন। এই পরীক্ষাগুলো শেষ হলে ওরিয়ন ক্যাপসুল ইঞ্জিন চালু করে পৃথিবীর কক্ষপথ ছেড়ে চাঁদের দিকে যাত্রা শুরু করবে। নাসা বিজ্ঞানীরা একে নাম দিয়েছেন ট্রান্সলুনার ইনজেকশন।
চাঁদের দিকে পৌঁছাতে মহাকাশযানটির কয়েক দিন সময় লাগবে। এই সময়ে পৃথিবী থেকে দূরে যাওয়ার পাশাপাশি নভোচারীরা নিয়মিত সব যন্ত্রপাতি পর্যবেক্ষণ করবেন। এরপর ওরিয়ন চাঁদকে সরাসরি প্রদক্ষিণ না করে এর পেছন দিক দিয়ে ঘুরে আসবে। একে বলা হয় ফ্রি-রিটার্ন পথ। এই পদ্ধতিতে চাঁদ ও পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ব্যবহার করা হয়। ফলে খুব কম জ্বালানি খরচ করেই মহাকাশযানটি আবার পৃথিবীর দিকে ফিরে আসতে পারে। এই সময়েই ওরিয়ন পৃথিবী থেকে এর সবচেয়ে বেশি দূরত্বে পৌঁছাবে।
চাঁদ পার হওয়ার পর পৃথিবীতে ফিরে আসতে আরও কয়েক দিন সময় লাগবে। ফেরার পথেও নভোচারীরা বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন কারিগরি পরীক্ষা চালিয়ে যাবেন। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় ওরিয়ন ক্যাপসুলের গতি থাকবে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার ২৩৩ কিলোমিটার। এরপর এটি প্যারাস্যুটের সাহায্যে প্রশান্ত মহাসাগরে নামবে ও উদ্ধারকারী দল নভোচারীদের উদ্ধার করবে।
নাসার অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরা যখন শেষবার চাঁদে গিয়েছিলেন, তখন বর্তমান বিশ্বের অর্ধেক মানুষেরই জন্ম হয়নি। তাই আর্টেমিস মিশনকে নতুন প্রজন্মের চন্দ্রাভিযান বলা হচ্ছে। নাসার বিজ্ঞান মিশন প্রধান নিকি ফক্স বলেন, ‘অনেকেরই অ্যাপোলো মিশনের কথা মনে নেই, কারণ তারা তখন জন্মায়নি। তাই এই আর্টেমিস মিশনটিই হলো এই প্রজন্মের জন্য নতুন এক অ্যাপোলো।’