যুদ্ধে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের খরচ কত
মধ্যপ্রাচ্যে এবার যুদ্ধ অনেকটাই অস্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছে। যুদ্ধে হামলা সাধারণত রাতের বেলায় হয়। এবার যুদ্ধের শুরুই হয়েছে দিনের আলোয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে ইরানের রাজধানী তেহরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এই যুদ্ধ। যুদ্ধে এখন বিরতি চলছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, ইরান চুক্তিতে রাজি না হলে আবারও হামলা হবে।
যুদ্ধবিরতির আগে প্রতিদিনই ইরানে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, আসলে এত যে হামলা, আক্রমণ, এতে খরচ কত হয়। বাস্তবতা হলো, যুদ্ধে ঠিক কত খরচ হয় এর প্রকৃত হিসাব পাওয়া যায় না। ২১ বছর ধরে চলা আফগান যুদ্ধের খরচ জানা গেছে সেই যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয় এক গবেষণায় জানিয়েছিল, ২০২০ সাল পর্যন্ত আফগান যুদ্ধে ৯৭ হাজার ৮০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
যা হোক, ইরান যুদ্ধের হিসাবে আসা যাক। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের তথ্য অনুসারে, এই যুদ্ধে ২৩ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৪ হাজার ড্রোন ব্যবহার করেছে ইরান। শুধু ইসরায়েল নয়, মধ্যপ্রাচ্য বা উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যেকটা বন্ধু দেশে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে। সৌদি আরবে ৭৪০টি, আরব আমিরাতে ১ হাজার ৮৩৫টি, কুয়েতে ২৪৬টি, বাহরাইনে ২৫৩টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। আর ইসরায়েলে চালিয়েছে ৯৩০টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা।
যুদ্ধের খরচ হিসাব করাটা জটিল। কারণ, হামলা ঠেকানোর হিসাবটাও একটু জটিল। ড্রোন ঠেকানোর চেয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো কঠিন ও খরচ বেশি।
ইরানের একেকটা ড্রোন বানাতে খরচ হয় ২০ থেকে ৩৫ হাজার ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত গণমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, একটি ড্রোন ঠেকাতে খরচ প্রায় ২ লাখ ডলার। কারণ, একটা ড্রোন ঠেকাতে দুটি থেকে তিনটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের হিসাব অনুসারে, ইরানের ড্রোন ছুড়তে খরচ কমপক্ষে দেড় হাজার কোটি টাকা। আর তা ঠেকাতে ওই ২৩ মার্চ পর্যন্ত খরচ হয়েছে অন্তত ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এই টাকাটা আসলে কত টাকা? বাংলাদেশে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পে খরচ ১৬ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ২৩ মার্চ পর্যন্ত শুধু ড্রোন ঠেকাতে একটি সেতু বানানোর অর্ধেক টাকা খরচ করতে হয়েছে।
যুদ্ধের খরচ হিসাব করাটা জটিল। কারণ, হামলা ঠেকানোর হিসাবটাও একটু জটিল। ড্রোন ঠেকানোর চেয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানো কঠিন ও খরচ বেশি। বিশেষজ্ঞরা বলেন, একটা ড্রোন ঠেকাতে যে খরচ হয় তার ১০ গুণ খরচ হয় ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে। ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর একটা হিসাব পাওয়া যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে থেকে। তারা বলছে, এই যুদ্ধ শুরুর পর প্রথম তিন দিনে ৭০০ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে শুধু প্যাট্রিয়ট অ্যাডভান্স ক্যাপাবিলিটি-৩ দিয়ে। এর একটা ক্ষেপণাস্ত্র বানাতে ও ছুড়তে মোট খরচ ৪০ লাখ ডলার। অর্থাৎ তিন দিনে প্যাট্রিয়টে খরচ ৩৩ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। পদ্মা সেতু বানাতে বাংলাদেশের খরচ হয়েছে ৩০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ প্যাট্রিয়টের তিন দিনের খরচ দিয়ে একটা সেতু বানিয়ে ফেলা সম্ভব। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল তো শুধু একটা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ব্যবহার করছে না। তাদের আয়রন ডোম আছে, সবচেয়ে দামি থাডও আছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ময়দানে। আর এই থাডের একটা প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের দাম ১ কোটি ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৪০ কোটি টাকা থেকে ১৮০ কোটি টাকা। বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য ব্যয় হয় ১০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ থাডের একটি প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের অর্থ দিয়ে বাংলাদেশের একটি হাসপাতালের পুরো চিকিৎসা ব্যয় মেটানো সম্ভব।
ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র আসলে এত অর্থ খরচ করছে নিজেদের জয়ী প্রমাণের জন্য, নিজের সক্ষমতা বোঝানোর জন্য।
আবার শুধু ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকানো বা ড্রোন হামলা ঠেকানোতে পুরো অর্থ ব্যয় হয় এমনটা তো নয়। এই যে রণতরি আছে, যুদ্ধবিমান আছে, সেনারা আছেন, এসবের পেছনেও তো অর্থ খরচ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের তথ্য অনুসারে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রই এই যুদ্ধে প্রতিদিন ২০০ কোটি ডলার খরচ করেছে। বাংলাদেশের সর্বশেষ বাজেট ছিল প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ যুদ্ধে আমেরিকার ৩৫ দিনের খরচের সমান বাংলাদেশের গোটা বাজেট।
ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র আসলে এত অর্থ খরচ করছে নিজেদের জয়ী প্রমাণের জন্য, নিজের সক্ষমতা বোঝানোর জন্য। কিন্তু যুদ্ধে তো কেউ জেতে না। সবাই হারে। কারণ, দিন শেষে যুদ্ধে শুধু মৃত্যু হয় মানুষের। ইরানের মিনাবের ওই স্কুলের কথা চিন্তা করে দেখো। এক দিনে সেখানে প্রায় ২০০ জন মারা গেছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু।