ড্রোন প্রযুক্তিতে ইরান এত শক্তিশালী হলো কীভাবে
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জেরে সংঘাত চলেছে গোটা মধ্যপ্রাচ্যে। এই যুদ্ধে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়ে বেশি ব্যবহার করছে ড্রোন। দেশটির ড্রোন সক্ষমতা চমক দিয়েছে গোটা বিশ্বকেই। তবে এই সক্ষমতা এক দিনে এই পর্যায়ে আসেনি। প্রায় ৪০ বছরের চেষ্টায় ড্রোন প্রযুক্তিকে এই পর্যায়ে এনেছে ইরান।
১৯৭৯ সাল। ইরানে নতুন সরকার। নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা হয়েছে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হয় ইরাকের। সেই সময় ইরানের হাতে ছিল আসলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কেনা অস্ত্র। কারণ, ইসলামিক রেভোল্যুশনারির আগে ইরানে ক্ষমতায় ছিল শাহ পাহলোভির সরকার। তাঁর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুত্ব ছিল। তিনি বিমানবাহিনীর জন্য ব্যাপক পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম কিনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে। এই কারণে যুদ্ধের প্রথম দিকে ইরান ভালো করছিল। কিন্তু ইরাক পরে উন্নত রাডার ব্যবহার করে ইরানের বিমান লক্ষ্য করে হামলা চালাতে শুরু করলে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপরই ইরানের সরকারের মনে হয়, এমন কিছু দরকার, যা যুদ্ধবিমানের মতো; কিন্তু বিমান নয় এবং যেটাতে মানুষ থাকবে না, কিন্তু হামলা চালানো যাবে, খরচও হবে কম।
প্রথম দিকের যে আবাবিল, সেটা কয়েক মাইল দূরে হামলা চালাতে পারত। আবার এটা কোনো একটি স্থান থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। মানোন্নয়নের কারণে পরের দিকে আবাবিল অবিশ্বাস্য অস্ত্র হয়ে ওঠে।
এ জন্যই ড্রোনের পেছনে বিনিয়োগ শুরু করে ইরান। ১৯৮৪ সালে ইসফাহান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম পাইলট ছাড়া বিমান বানানোর এক্সপেরিমেন্ট শুরু করে। আবার এটাও বলা হয়, সেই সময় আইআরজিসি ড্রোন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করে। তবে যেটাই হোক বা যারাই করুক বা দুই পক্ষ মিলিয়েই করুক, ইরানের বানানোর ড্রোন যাত্রা শুরু হয়।
১৯৮৪ সালের দিকে যখন এই ড্রোন বানানো শুরু হয়, তখনো কিন্তু ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ চলছিল। আর সেই সময় ইরানের স্যাটেলাইট ছিল না। ফলে তারা চাইলেও ইরাকের সেনাদের ওপর নজরদারি করতে পারত না। তবে দ্রুত তারা মোহাজির-১ ড্রোন বানিয়ে ফেলে। এই ড্রোন ব্যবহার করে ইরাকের বাহিনীর ওপর নজরদারি চালায় ইরান। এর পরের বছর আবাবিল নামের একটি ড্রোন বানায় ইরান। এটা দিয়ে হামলাও চালায় ইরাকে। এরপর ১৯৮৬ থেকে আবাবিলের উৎপাদন বাড়ানো হয় এবং মানোন্নয়নের কাজও চলতে থাকে। প্রথম দিকের যে আবাবিল, সেটা কয়েক মাইল দূরে হামলা চালাতে পারত। আবার এটা কোনো একটি স্থান থেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হতো। মানোন্নয়নের কারণে পরের দিকে আবাবিল অবিশ্বাস্য অস্ত্র হয়ে ওঠে। আবাবিল-৩ নামের যে ড্রোন ইরান পরে বানিয়েছে, সেটা এখন আট ঘণ্টা উড়তে করতে পারে।
এখানে একটা জিনিস বলা দরকার। আরব অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক রাষ্ট্রে ইরান কিন্তু এমনি এমনি হয়নি। আরবের সব দেশ যখন ধর্মীয় কুসংস্কারের ধোয়া তুলে বিজ্ঞান বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছে, তখন ইরান সব প্রযুক্তির সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছে। বলা হয়, ইউরোপের অনেক দেশের আগে ইরানে প্রযুক্তির ছোঁয়া লেগেছে। ইউরোপ ও আমেরিকার পর প্রথম যে দেশ টেলিগ্রাফি ব্যবহার করা শুরু করছে, সেটা ইরান। আবার মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো দেশের আগে তারা টেলিভিশন ও রেডিও ব্যবহার করা শুরু করে।
এর পেছনে অবদান আসলে নাসির আল-দিন শাহের। তিনি ১৯৪৮ থেকে ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত ইরান শাসন করেছেন। তিনি ইরানকে আধুনিক করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এরপর মোহাম্মদ রেজা শাহর হাত ধরে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি শুরু হয় ১৯৫৭ সালে।
এই সময় ইরান চাইছিল, তাদের এমন সব অস্ত্রের দিকে এগোতে হবে, যেটা দেশেই বানানো যাবে। এগুলোর একটি ছিল ড্রোন।
এখানে একটি তথ্য জানানো দরকার। ইরান যখন পরমাণু কর্মসূচি হাতে নেয়, তখনো কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিষেধ করেছিল। রেজা শাহ ক্ষমতায় থাকার কারণে ইরান সেই যাত্রায় রক্ষা পেয়েছিল। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু ছিলেন।
ইরান যখন ড্রোন বানানোর উদ্যোগ নিচ্ছে ১৯৮৪ বা ১৯৮৫ সালে, তখনই তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আসতে শুরু করে। প্রথম সামরিক নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে ইরানের অস্ত্র কেনা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ইরাকের সঙ্গে ৮ বছরের যুদ্ধে হিমশিম খেয়েছে ইরান।
ইরাক যুদ্ধ চলাকালে ইরান ঘোষণা দিয়েছিল, তারা পারস্য উপসাগরে তেলের জাহাজ চলতে দেবে না। এ জন্য উপসাগরে মাইন পেতেছিল ইরান। সেই সময় কুয়েতের তেল ট্যাংকার পাহারা দিয়ে নিয়ে যেত যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ। ১৯৮৮ সালে ১৪ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি যুদ্ধজাহাজ ইরানের মাইনে বিস্ফোরিত হয়। ক্ষেপে যায় যুক্তরাষ্ট্র। মাত্র চার দিনের মাথায়; অর্থাৎ ১৮ এপ্রিল ইরানের নৌবাহিনীর ওপর কয়েক ঘণ্টার অভিযান চালায় তারা। ‘অপারেশন প্রেয়িং ম্যান্টিস’ নামের এই অভিযানে এক দিনেই ইরানের প্রায় ধসে যায় নৌবাহিনী।
ইরাক এবং যুক্তরাষ্ট্রের কাছে মার খেয়ে ইরানের সামরিক সক্ষমতা একেবারে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। এর ওপর আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে কারও কাছ থেকে কোনো সামরিক সরঞ্জামও কিনতে পারছিল না ইরান। এই সময় ইরান চাইছিল, তাদের এমন সব অস্ত্রের দিকে এগোতে হবে, যেটা দেশেই বানানো যাবে। এগুলোর একটি ছিল ড্রোন।
সেই সময় ইরানের ড্রোন কর্মসূচি ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) নিয়ন্ত্রণে ছিল। কিন্তু দেখা গেল, খুব একটা উন্নতি হচ্ছে না। পরে বাধ্য হয়ে ১৯৯০-এর দশকে ড্রোন তৈরিতে বেসামরিক লোকজনকে যুক্ত করা হলো। যুক্ত করা হলো বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের। এতে রাতারাতি বদলে যায় ড্রোন প্রযুক্তির চিত্র।
এই যে প্রযুক্তির পেছনে লেগে থাকা এবং এর জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানো, এর সুফলই হলো ইরানের দুনিয়া কাঁপানো ড্রোন।
কিন্তু প্রযুক্তি উন্নত করলেই তো আর যন্ত্র বানানো যায় না। লাগে যন্ত্রাংশ। নিষেধাজ্ঞার কারণে কোনো দেশ ইরানের কাছে সামরিক যন্ত্রাংশ বিক্রি করছিল না। বাধ্য হয়ে ইরান তুরস্ক ও আরব আমিরাতের কালোবাজার থেকে যন্ত্রাংশ কেনা শুরু করে। অস্ট্রেলিয়া থেকে তারা বিমানের ইঞ্জিন কিনে সেটা খানিকটা অদল-বদল করে মোহাজিরের ড্রোনে ব্যবহার করে ইরান। ২০০৮ থেকে ২০০৯ সালে তারা জার্মানির কালোবাজার থেকে ইঞ্জিন কেনে। সেই ইঞ্জিন এনে সেটা খুলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নতুন ইঞ্জিন বানায় তারা। ইরানের সবচেয়ে ভয়ংকর শাহেদ ১৩৬ ড্রোনে কিন্তু জার্মানির ইঞ্জিনই ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ছাড়া আবাবিল-৩ ড্রোনেও একই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার হয়েছে। ইরানের কাছে এমন ইঞ্জিন বিক্রি করার কারণে জার্মানির আদালতে ইরানি বংশোদ্ভূত এক জার্মান ও এক ইরানির বিরুদ্ধে অভিযোগও আনা হয়েছে।
এই যে প্রযুক্তির পেছনে লেগে থাকা এবং এর জন্য হন্যে হয়ে ছুটে বেড়ানো, এর সুফলই হলো ইরানের দুনিয়া কাঁপানো ড্রোন। এখন ইরানের হাতে খুব অল্প দূরত্বে যেতে পারে, এমন ড্রোন যেমন আছে, তেমনি দুই-আড়াই হাজার কিলোমিটার যেতে পারে, তেমন ড্রোনও আছে। শত্রুর রাডার ফাঁকি দিয়ে নজরদারির ড্রোন যেমন আছে, তেমনি সুইসাইড ড্রোনও আছে। আবার অল্প গতি, যেমন ঘণ্টায় দেড় শ কিলোমিটার গতির ড্রোন আছে, তেমনি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গতির ড্রোনও আছে।
৪০ বছরের চেষ্টায় ইরান আসলে কত ধরনের ড্রোন বানিয়েছে, তার সঠিক তথ্য কোথাও পাওয়া যায় না। তবে মোহাজির, আবাবিল ছাড়াও ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে আরও অন্তত ১৩ ধরনের ড্রোন বানিয়েছে ইরান। এর মধ্যে ফোতরোস, হামায়েস, কামান, কারার, মেরাজ, সারির, নাজির, রাদ, সিরাফ, মাহি, ইয়সির নামের ড্রোন আছে ইরানের ভান্ডারে।
এসব ড্রোনের প্রতিটার আবার আলাদা আলাদা মডেল আছে। যেমন শাহেদ ড্রোনের কথা বলা যেতে পারে। এর আটটি মডেলের নাম আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেই পাওয়া যায়। যেমন শাহেদ-১০১, শাহেদ-১০৭, শাহেদ-১২১, শাহেদ-১২৯, শাহেদ-১৩৬, শাহেদ-১৩১, শাহেদ-১৯১, শাহেদ-১৭১, শাহেদ-২৩৮। এই প্রতিটি ড্রোন ইরানের সামরিক ক্ষমতা বাড়িয়েছে। প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় ব্যবহার করছে বিভিন্ন ড্রোন, যা বেকায়দায় ফেলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে।