মাছের নাম কেন ‘ভূত মাছ’
একটা মাছ পানির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে না সাঁতার কাটছে। শরীর প্রায় স্থির, লেজ নড়ছে না। তবু মাছটি কখনো সামনে-পেছনে যাচ্ছে, আবার মুহূর্তেই ঘুরে যাচ্ছে। যেন পানির মধ্যে কোনো অদৃশ্য শক্তি একে ঠেলছে। এই অদ্ভুত মাছটির নাম ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশ। বাংলায় বললে, ‘কালো ভূত মাছ’।
এই মাছের বৈজ্ঞানিক নাম Apteronotus albifrons। দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন অববাহিকার নদী ও জলাভূমি, ভেনেজুয়েলা এবং প্যারাগুয়ের বিভিন্ন এলাকায় এদের দেখা যায়। বাংলাদেশের প্রকৃতিতে এই মাছ নেই। তবে অ্যাকুয়ারিয়ামে মাছ পালার শখ যাঁদের আছে, তাঁরা এই মাছের নাম কমবেশি জানেন।
কালো, লম্বাটে শরীর। লেজের কাছে সাদা দুটি দাগ। দেখতে অনেকটা ছুরির মতো বলে ‘নাইফফিশ’ নামটাও বেশ মানিয়ে যায়। এই মাছের আসল রহস্য এর চেহারায় নয়, চলাফেরায়।
সাধারণ মাছ সাঁতার কাটার সময় শরীর ও লেজ এদিক-ওদিক বাঁকিয়ে পানিতে ঢেউ তৈরি করে। ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। এর শরীর প্রায় সোজা থাকে। শরীরের নিচে লম্বা ফিতার মতো একটি পাখনা আছে, যাকে বলে অ্যানাল ফিন। এই পাখনাটি ক্রমাগত ঢেউয়ের মতো নড়তে থাকে। সেই নড়াচড়ার সাহায্যেই মাছটি সামনে, পেছনে, ওপরে কিংবা নিচে যেতে পারে।
অর্থাৎ শরীর না বাঁকিয়েও মাছটি খুব সহজে চলাফেরা করতে পারে। এমনকি একই জায়গায় প্রায় স্থির থেকেও দিক পরিবর্তন করতে পারে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো অদৃশ্য শক্তি যেন তাকে পানির মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
এই মাছ অন্ধকারেও বেশ ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারে। ঘোলা নদীর পানি কিংবা রাতের অন্ধকারে চোখের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করা কঠিন। তখন কাজে লাগে এর আরেকটি অসাধারণ ক্ষমতা।
ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশ নিজের শরীর থেকে খুব দুর্বল একটি বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে। এই ক্ষমতাকে বলা হয় ইলেক্ট্রোলোকেশন। শরীরের চারপাশে তৈরি হওয়া বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের মধ্যে কোনো বস্তু বা প্রাণী ঢুকলে ক্ষেত্রটিতে সামান্য পরিবর্তন ঘটে। মাছটির শরীরে থাকা বিশেষ সংবেদী কোষ সেই পরিবর্তন শনাক্ত করতে পারে।
এভাবেই মাছটি বুঝতে পারে আশপাশে কিছু আছে কি না। কোনো বস্তু কতটা কাছে, সেটিও আন্দাজ করতে পারে। ফলে আলো কম থাকলেও বাধা এড়িয়ে চলা কিংবা খাবার খুঁজে বের করা এর জন্য সহজ।
হাঙরসহ আরও কিছু প্রাণীরও বৈদ্যুতিক সংকেত শনাক্ত করার ক্ষমতা আছে। তবে ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশের মতো কিছু বৈদ্যুতিক মাছ নিজেরাই বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র তৈরি করে সেই ক্ষেত্রের পরিবর্তন থেকে আশপাশের তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
দিনের বেলায় এই মাছ সাধারণত লুকিয়ে থাকতে পছন্দ করে। গাছের শিকড়ের ফাঁক, পাথরের আড়াল কিংবা পানিতে ডুবে থাকা কাঠের ভেতর এরা আশ্রয় নেয়। সন্ধ্যা নামার পর বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। তাই অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা ব্ল্যাক গোস্টকে দিনের বেলায় খুঁজে পাওয়া কঠিন হলেও রাতে একে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়। এই রাতচরা স্বভাবের কারণে এটি নাম পেয়েছে ‘ভূতমাছ’।
এরা বেশ দক্ষ শিকারি। ছোট জলজ পোকা, পোকামাকড়ের লার্ভা, কেঁচোসহ বিভিন্ন ছোট প্রাণী খায়। সুযোগ পেলে ছোট মাছও শিকার করতে পারে। অন্ধকারে শিকার খুঁজতে তখন আবার কাজে লাগে তার বৈদ্যুতিক ইন্দ্রিয়। আশপাশের বৈদ্যুতিক ক্ষেত্রের পরিবর্তন বুঝে খাবারের অবস্থান শনাক্ত করতে পারে।
তবে দেখতে শিকারির মতো হলেও ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশ সাধারণত বেশ লাজুক। দিনের বেশির ভাগ সময় লুকিয়ে থাকে এবং নিজের মতো থাকতে পছন্দ করে। একই প্রজাতির অন্য মাছ খুব কাছে চলে এলে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে এদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগও হতে পারে।
বন্য পরিবেশে ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশ প্রায় ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বড় হতে পারে। অ্যাকুয়ারিয়ামে সাধারণত এর চেয়ে কিছুটা ছোট থাকে। ভালো পরিবেশ ও যত্ন পেলে ১০ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে।
তাহলে মাছটির নাম ‘ব্ল্যাক গোস্ট’ কেন?
এর কালো রং অবশ্যই একটা কারণ। অন্ধকার পানিতে কালো শরীর সহজেই চোখ এড়িয়ে যায়। তার ওপর শরীর প্রায় স্থির রেখে ফিতার মতো পাখনা দুলিয়ে চলাফেরার ধরনটাও অদ্ভুত। দূর থেকে দেখলে সত্যিই মনে হয়, একটা ছায়া যেন পানির মধ্যে ভেসে বেড়াচ্ছে।
তার সঙ্গে যোগ করো বৈদ্যুতিক ইন্দ্রিয়ের ব্যাপারটা। এমন একটা শক্তি, যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু সেই শক্তির পরিবর্তন থেকেই মাছটি চারপাশের পরিবেশ সম্পর্কে তথ্য পেয়ে যায়।
এই সবকিছু মিলিয়ে ব্ল্যাক গোস্ট নাইফফিশকে রহস্যময় মনে হওয়াই স্বাভাবিক। দক্ষিণ আমেরিকার স্থানীয় সংস্কৃতিতে এই মাছকে ঘিরে মৃত মানুষের আত্মা নিয়ে নানা লোকবিশ্বাসের কথাও বলা হয়। সেখান থেকেই ‘গোস্ট’ নামটির সঙ্গে এমন ধারণা জড়িয়ে থাকতে পারে।
তবে বিজ্ঞান বলছে, এই মাছের আচরণের প্রতিটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের পেছনেই রয়েছে বাস্তব কারণ। এর কালো রং, অদ্ভুত সাঁতার, রাতের বেলায় সক্রিয় থাকা কিংবা বৈদ্যুতিক ক্ষেত্র দিয়ে চারপাশের পরিবেশ বোঝা, কোনোটির মধ্যেই অতিপ্রাকৃত কিছু নেই।
তারপরও নামটা বেশ মানিয়ে যায়।
কারণ, পানির অন্ধকারে যখন কালো একটা ছায়া নিঃশব্দে ভেসে যায়, শরীর প্রায় না নড়িয়েই সামনে-পেছনে ঘুরে বেড়ায়, তখন তাকে ‘ভূত মাছ’ ছাড়া আর কী-ই বা মনে হবে!